শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী ৩ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস দুই

 বিদেহ নন্দিনী

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



তিন

সময় আমাকে একজন সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষে রূপান্তরিত করল। আমি একই মানুষ একটা সময় নিজেকে ধন্য ভেবেছিলাম অযোধ্যা কুমারকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আর আজ সেই একই মানুষ তার নাম শুনলে শিউরে উঠি।যেদিন আমি নতুন বউ হয়ে অযোধ্যা মহানগরীতে পা রেখেছিলাম সেদিন আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। একজন যুবতি মেয়ে এতটা ভাগ্যবতী হতে পারে বলে কল্পনাই করতে পারিনি। রূপে গুণে একজন রাজপুত্রকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার পরেও একটি শস্যশালিনী রাজ্যের বধু হতে  পেরে মনে মনে আমি ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র কে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। কারণ তিনি আমাকে বিশেষ ভাবে না জেনেই রামচন্দ্রের মতো একজন রাজকুমারকে আমার পাণিপ্রার্থী হিসেবে পিতার কাছে নিয়ে এসেছিলেন।আমার পিতা মিথিলার রাজা জনক, আমি তার পালিতা কন্যা। একবার রাজা জনক যজ্ঞ সম্পাদন করার জন্য নিজেই একটি উঁচু-নিচু অঞ্চল হাল বেয়ে সমান করে যজ্ঞভূমিতে রূপান্তরিত করেছিলেন।যজ্ঞভূমি পরিষ্কার করে থাকার সময় তিনি নাকি জঙ্গলের মধ্যে আমাকে উদ্ধার করেন। আমি নাকি স্বর্গীয় জ্যোতি সম্পন্না শিশু ছিলাম।যখন আমার জন্মের ইতিহাস  বিষয়ে জানতে পেরেছিলাম আমি বড় দুঃখিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আমি পূর্ব জন্মে এমন কি দোষ করেছিলাম যার জন্য মা্কে জন্ম দিয়েই আমাকে নির্বাসন দিতে হল। বোধহয় এই জন্যই আমি শৈশব থেকে স্বভাবত অত্যন্ত লাজুক স্বল্পভাষী এবং বিনয়ী ছিলাম। অবশ্য রাজা রানি পিতা-মাতা আমাকে বড় আদর এবং যত্নে লালন পালন করেছিলেন। কোনো ধরনের স্ত্রী-শিক্ষা থেকে আমাকে বঞ্চিত করেননি। আমি যখন বিয়ের উপযুক্ত হয়েছিলাম,তখন পিতা রাজা জনক তার পরম গুরু যাজ্ঞবল্ক ঋষি এবং ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে আমার পাণিপ্রার্থী বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।আলোচনার শুরুতেই ঋষি দুইজন বলেছিলেন আমি নাকি মনুষ্যরূপে পৃথিবীতে অবতার গ্রহণ করা বিষ্ণুর স্ত্রী। তখন থেকে পিতা জনক রাজা আমার পাণিপ্রার্থী কেমন হওয়া উচিত সেই কথা চিন্তা করে কোনো সমাধান করতে পারছিলেন না। মায়ের তো প্রতিদিনই পিতার সঙ্গে আমার বিষয়ে আলোচনা করাটা একটা কর্তব্যের মতো হয়ে পড়েছিল। আশেপাশে অনেক রাজ্যের রাজকুমারদের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছিল। তবে পিতার কোনোটাতেই আগ্রহ ছিলনা। তাই পুনরায় এক দিন রাজা জনক ঋষি যাজ্ঞবল্ক,আমাদের কুল পুরোহিত শতনন্দ এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে রাজকুমার আমাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি হরধনুতে গুণ পরাতে পারবে তার সঙ্গেই আমার বিয়ে দেবে। সেই ধেনু নাকি  বিশ্বকর্মার তৈরি করা।বিশ্বকর্মা নাকি এই ধরনের ধেনু দুটি তৈরি করেছিলেন। একটি দিয়েছিলেন মহাদেব শিবকে এবং অন্যটি বিষ্ণুকে। মহাদেব শিব তার ধেনুটা আমাদের পূর্বপুরুষকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই পুরুষানুক্রমে রুদ্র প্রদত্ত ধেনুটার পুজো হয়ে আসছে।

 আমাদের পুজোর ঘরের একটি বৃহৎ লোহার বাক্সের ভেতরে ধেনুটাকে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমার ঘটনাটা জানার পর থেকেই মা-বাবাকে সেই ধেনুটাকে পুজো করে আসতে দেখেছিলাম।

 একদিন ভালো দিন দেখে বাবা রাজা জনক ঘোষণা করলেন-‘যে রাজকুমার রুদ্র প্রদত্ত  ধনুতে গুণ পরাতে পারবে সেই আমার সর্বগুণসম্পন্না রুপসী কন্যা সীতাকে পত্নী হিসেবে লাভ করবে। নিমেষের মধ্যে ঘোষণাটা চারপাশে প্রচারিত হল। দলে দলে অনেক রাজ্য থেকে রাজকুমাররা এলেন।রাজকুমারদের আগমন হলেই আটটা চাকায় নির্মিত গাড়ির মতো একটি বাহনে বের করে আনা হয় আমার পাণিপ্রার্থী হিসেবে আসা কুমারদের যোগ্যতা পরীক্ষা করার জন্য। রাজপ্রাসাদের ভেতরে আমিও মানসিকভাবে তৈরি হতে থাকি আমার জীবনসঙ্গীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। তবে রাজকুমাররা ধনুতে  গুণ লাগানো তো দূরের কথা এমনকি তারা ধনুকটাকে নাড়াতেই পারল না। বোধহয় সেই জন্যই পিতা্কে মাঝেমধ্যে চিন্তান্বিত দেখা গিয়েছিল। মাও ভয় পেয়েছিলেন যে আমাকে হয়তো আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে। আমিও কোনোদিন এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দিইনি।আমার বোন উর্মিলা  সখীরা এবং সঙ্গীরা কোন রাজকুমার ধনু তুলতে গিয়ে কোমরে চোট পেল,তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে গেল,কে  ভয়ে হরধনুর কাছেই এল না ইত্যাদি কথাগুলি রং চড়িয়ে আমাকে হাসাতো।এভাবে বিভিন্ন রাজকুমাদের আগমন ঘটে থাকার সময় পিতা এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করলেন।তাতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু রাজা মহারাজা রাজকুমার ঋষি মুনিকে নিমন্ত্রণ করা হল। যজ্ঞ আরম্ভ হওয়ার আগে নিয়ম অনুসারে আমার স্বয়ম্বর অনুষ্ঠিত করার জন্য দিন এবং সময় ঠিক করলেন।পিতা জনক স্বয়ম্বর,যজ্ঞ,অভ্যর্থনা,ভোজন,থাকা খাওয়ার সুবিধা এই সমস্ত কিছুর তদারকি করার জন্য একটি দল গঠন করে একজন দলপতিকে নিযুক্ত করলেন। মা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।আমি স্বয়ম্বর সভায় কী পোশাক পরব, কী ধরনের অলংকার আমাকে,আমার শরীরকে তুলে ধরবে ইত্যাদি আলোচনা করে নানান রকমের অলংকার তৈরি করতে দিলেন। সাজ পোশাক তৈরি করালেন।

 কয়েকদিন আগে থেকেই রাজ্যের মিথিলা নগরী অতিথি অভ্যাগতদের আগমনে গিজগিজ করতে লাগল। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুনি-ঋষি- এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের উপস্থিতি সমগ্র মিথিলা  নগরীকে এক পবিত্র যজ্ঞ ভূমিতে রূপান্তরিত করল।

 ভেতরের ঘরে মা, বোন উর্মিলা,বন্ধু-বান্ধবীরা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাথায় তেল দেওয়া,স্নান করানো ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করার জন্য তারা আলোচনা করতে না করতেই পিতা জনক ভেতরে খবর পাঠালেন যে ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। সংবাদ পেয়েই সবাই প্রণাম করার জন্য তাড়াহুড়ো লাগাল।আমাকে আঁচলে ধরে নিয়ে ঘরে নিয়ে যাবার আগে ঋষির আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য মা আমাকে বের করে আনল।

 পিতা ঋষি বিশ্বামিত্র কে বললেন-‘ঋষিরাজ,আপনি যজ্ঞে এসে আমাকে ধন্য করেছেন। আপনার সঙ্গে এই দেবতুল্য যুবক দুজন কে?দুজনের চেহারাও প্রায় একই।যদিও এরা ব্রাহ্মণের মতো পোশাক পরেছেন, কিন্তু দেখতে ক্ষত্রিয় রাজকুমারের মতো। যে ধরনের অস্ত্র বহন করছেন তাতে এদেরকে দক্ষ যোদ্ধা বলে মনে হচ্ছে।’

 আমি মায়ের আড়াল থেকে রাজকুমার দুজনকে দেখলাম- অপূর্ব সুন্দর। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ জন।তার দেহ থেকে জ্যোতি নির্গত হয়ে সম্পূর্ণ জায়গাটা আলোকিত করে তুলেছিল।আমি তাদের দিকে আবার একবার তাকিয়েছিলাম।এবার চোখে চোখ পড়েছিল।

নিমেষের মধ্যে আমার দেহে তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হওয়া যেন অনুভব করেছিলাম। আমি ভেতরে ভেতরে কিছুটা চঞ্চল হয়ে উঠেছিলাম।যুবকদের পরিচয় জানার জন্য আমিও ব্যগ্র হয়ে পড়েছিলাম।ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র বড় গৌরবের সঙ্গে যুবক দুজনের পরিচয় দিলেন-‘এরা দুজনেই অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র।’তারপর জ্যেষ্ঠ পুত্রের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন-‘এর নাম রাম এবং অন্যজন ভাই লক্ষ্ণণ দু'জনকেই আমি রাজা দশরথের কাছ থেকে আমার যজ্ঞ রক্ষা করার জন্য এনেছিলাম। না হলে অসুরদের হাত থেকে বাঁচিয়ে যজ্ঞ সম্পাদন করাটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’ তারপরে ঋষি দশরথ নন্দন রাম লক্ষ্ণণের সাহায্যে সুবাহু এবং তাড়কা রাক্ষসীকে কীভাবে বধ করেছেন সেই বিষয়ে বর্ণনা করলেন।ঋষির মুখে কোমলমতি রাজকুমার দুজনের কথা শুনে সবাই অবাক হয়েছিল। তারপর ঋষি পিতার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন-‘আপনার অনুমতি সাপেক্ষে রুদ্র প্রদত্ত হরধনু টা একবার এরা দেখতে চায়।আপনার রাজ্যে আসার এটাও একটি মূল উদ্দেশ্য।’ 

পিতা রাজা জনক ঋষি বিশ্বমিত্রের কথার অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন।আমারও মনটা এক অজানা আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠেছিল।

 আমাকে স্নান করিয়ে,সাজিয়ে গুছিয়ে  বান্ধবীরা সভাঘরের প্রাঙ্গণে বের করে এনেছিল। সভাঘর সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল। মাঝখানে এক বৃহৎ খালি জায়গা ছেড়ে গোলাকার ভাবে সারি সারি সুসজ্জিত আসন পাতা হয়েছিল।কেন্দ্রস্থলে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা ছিল সেই বৃহৎ ধনু।যে ধনুকে আট চাকায় নির্মিত গাড়ি আকৃতির দীর্ঘ লোহার বাক্সে সংরক্ষিত করে রাখা হয়। সেই বাক্স প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জরি দিয়ে টেনে পেছন থেকে ঠেলে কোনোমতে নাড়াতে পারছিল।

প্রত্যেকেই নিজের নিজের স্থানে বসেছি। সভাঘরের এক পাশে ছিল মহিলাদের বসার জায়গা। আমার বান্ধবীরা আমাকে মাঝখানে নিয়ে কিছুটা আড়ালে বসেছিল। সেই জায়গা থেকে ঋষি বিশ্বামিত্র কে ভালো করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল।তার দুপাশে বসেছিল অযোধ্যানন্দন রাম এবং লক্ষ্ণণ।আমি আড়চোখে ঘন ঘন রামের দিকে চেয়ে থাকার কথাটা বোধহয় উর্মিলা বুঝতে পেরেছিল। তাই সে মজা করে বলে উঠল-‘লাভ নেই বুঝেছিস,মন গেলেও লাভ নেই।ধনু ভাঙতে পারবে বলে ভেবেছিস?’

উর্মিলার কাছে ধরা পড়ে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলাম। আমার অন্য একজন বান্ধবী বলে উঠেছিল –শ্রীমান ধনু ভাঙতে পারবে কিনা বলতে পারছিনা। কিন্তু আমাদের সীতামায়ের মন  ঋষি বিশ্বামিত্র আসার পর থেকেই চঞ্চল হয়ে উঠেছে।’ 

সুবিধা পেয়ে উর্মিলা পুনরায় বলেছিল-‘আমরা একটা কাজ করব বলে ভাবছি। রামচন্দ্র ধনুর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে গিয়ে ধনুটা অর্ধেক কেটে রেখে আসব।’ তারপরে উর্মিলা আমার থুতনিতে ধরে বলেছিল-‘ নয় কি সীতাদি, বাবা কীসব ধনুক ভাঙার পণ করল।ভালো একজন বীরকে  বরণ করে নিতে বললেই তো হত। তখন আমি তোমাকে একেবারে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার মতো করে রামের গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে দিতাম।’ 

আমরা হাসি ঠাট্টা করার সময় ধনু ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। ঘোষক এক এক করে রাজকুমারদের পরিচয় দিয়ে প্রতিযোগিতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।প্রত্যেকেই গেল আর এল। ধনুতে গুণ লাগানো তো দূরের কথা এমনকি কেউ ধনু তুলতেই পারল না।প্রতিযোগী প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। দুই একজন ছোট ছোট রাজ্যের রাজকুমার ছিল যদিও ভয় পেয়ে তারা  এগিয়ে এল না। ঠিক তখনই ঋষি বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে কিছু একটা কানে কানে বলতে দেখেছিলাম।লক্ষ্ণণও সায় দিয়ে  মাথা নাড়িয়ে ছিল। তারপরে ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সকলকে সম্বোধন করে স্পষ্ট কন্ঠে বলেছিলেন-‘আমার ডান দিকে বসে থাকা এই শিষ্যটি  হলেন অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র। তিনি স্বয়ম্বরের  জন্য নিমন্ত্রিত রাজকুমার নন। কিন্তু আমার আদেশ মতে তিনি প্রতিযোগিতায় নামবেন। তবে পত্নী লাভের চেয়ে হরধনুতে গুণ লাগিয়ে নিজেকে বীর বলে পরিচয় দেওয়াটাই তার মুখ্য লক্ষ্য।’

 সমস্ত দর্শকরা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানাল। আমার অন্তরে ভয় জাগল। কে জানে ধনুতে গুণ  লাগাতে পারবে কিনা!উর্মিলা আমার অন্তরের কথা বুঝতে পেরেছিল।সে আমার হাত ডান হাতটা মুঠো করে ধরে কানে কানে বলল-‘আমি তোমার মনের কথা বুঝতে পেরেছি। চিন্তা কর না। ভগবান নিশ্চয় তোমার প্রতি সদয় হবেন।’ আমিও মনে মনে ভগবানকে স্মরণ করেছিলাম।

 ইতিমধ্যে রাম উঠে দাঁড়িয়েছিল। ঋষি বিশ্বামিত্রকে প্রণাম জানিয়ে ধীর পদক্ষেপে ধনুর দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।ধনুটার কাছে কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে বোধহয় মহাদেবকে স্মরণ করেছিল। তারপর অনায়াসে একটি সাধারণ ধনু  তোলার মতো হরধেনুটা তুলে ধরেছিল। সভা ঘরে প্রত্যেকেই বিস্মিত দৃষ্টিতে রামের দিকে তাকিয়ে ছিল। রামচন্দ্র ধনুকের একটা প্রান্ত মাটিতে দাঁড় করিয়ে গুণ লাগালেন। গুণটা তিনি এভাবে পেছন দিকে টানলেন যে  মেঘের মতো গর্জন করে ধনুটা ভেঙ্গে পড়ে রইল। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছিল।ঢাক-ঢোল, শঙ্খ হাততালিতে সমস্ত সভাঘর আলোড়িত হয়েছিল। মহিলারা ঘন ঘন উলুধ্বনি দিয়েছিল। উর্মিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল। বান্ধবীরা আমাকে দাঁড় করিয়ে কাপড়-চোপড় এবং অলংকার ঠিক করে প্রস্তুত করে রেখেছিল। উর্মিলা আমার হাতে একটা মালা ধরিয়ে দিয়ে পিতার ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছিল।

 পিতা রাজা জনকের চোখ থেকে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সবার মাঝখানে এসে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করে গুরু গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন-‘হে সমবেত জনগণ আমি দশরথ নন্দন রামের পরাক্রম নিজ চোখে দেখতে পেলাম। আমার অতি আদরের কন্যা সীতার অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ হবে। এখন নিয়ম অনুসরণ করে সীতা রামকে বরণ করবে।’

 আমারও দুঃখ এবং আনন্দে চোখের জল বেরিয়ে এসেছিল।

 পিতার ঘোষণাটা  শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় মঙ্গলধ্বনি উলুধ্বনি এবং শঙ্খনাদের শব্দে  সভাঘর মুখরিত হয়ে উঠেছিল। উর্মিলা এবং অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবীরা আমাকে সভা ঘরের ভেতরে এগিয়ে নিয়ে গেল। পিতা জনকও  আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে এলেন। আমি রামের গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে জীবনস্বামী বরণ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে মহিলারা উলুধ্বনি দিলেন।

 আমরা দুজনেই বিশ্বামিত্রের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম।তিনি আমাদের আশীর্বাদ করলেন। তার পরে তিনি পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন-‘রাজা জনক,এদের দুজনকে আমি আশ্রম থেকে বাইরে বাইরে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। পিতা রাজা দশরথের অনুমতি নিইনি। আপনি অতি দ্রুত কাউকে অযোধ্যায় পাঠিয়ে রাজা দশরথকে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করুন এবং এখানে নিমন্ত্রণ করুন।’

 মুহুর্তের মধ্যে পিতা অনেক বহুমূল্য উপহার এবং উপঢৌকন দিয়ে অযোধ্যায় দ্রুতগামী দূত পাঠালেন।

 আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন এলে বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। তাই এই কয়েকদিন আমরা অত্যন্ত নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে ছিলাম। অবশ্য দিনে দুই একবার রামচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু কথাবার্তা বলার সুযোগ ছিল না। উর্মিলা অবশ্য কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে আমার বান্ধবীরা লক্ষ্ণণের সঙ্গে উর্মিলাকে নিয়ে এতটাই খেপাতে লাগলো যে উর্মিলা লজ্জায় রাম লক্ষ্ণণের সামনে বের হতে লজ্জা বোধ করল। এই কয়েকদিনের মধ্যে  আমি দেবর লক্ষ্ণণের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলেছিলাম। তার মুখ থেকে আমি দাদা রামচন্দ্রের বিষয়ে একটা আভাস পেয়ে ছিলাম। লক্ষ্ণণ বলেছিল-‘আপনি মালা পরিয়ে দাদার পাশে  দাঁড়াতে আমার মনে হয়েছিল যেন দাদা স্বয়ং বিষ্ণু এবং আপনি সাক্ষাৎ লক্ষ্ণীদেবী।’

 এদিকে বিয়ের জন্য সমগ্র রাজ্য আনন্দে মেতে উঠেছিল। পিতা ইতিমধ্যে মাতৃদেবীর সঙ্গে আলোচনা করে উর্মিলাকে লক্ষ্ণণের হাতে অর্পণ করবেন বলে স্থির করলেন। তখনও প্রকাশ্যে তিনি মনের কথা কাউকে বলেননি। রাজা দশরথের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবুও দুজনকে একই বিবাহসভায় বিয়ে দেবেন বলে তিনি প্রস্তুত হয়েছিলেন। আমাদের সুন্দর রাজ্য আরও সুন্দরভাবে সাজানোর জন্য পিতা আদেশ দিলেন। দুজনের জন্য নানা ধরনের অলংকার এবং কাপড় দিয়ে বাক্স ভর্তি করলেন। নির্দিষ্ট দিনে শ্বশুর রাজা দশরথ অন্য দুই পুত্র, কুল গুরু এবং বন্ধুদের নিয়ে রাজ্যে  উপস্থিত হলেন। যদিও পিতা রাজা জনক এবং অযোধ্যার নৃপতি দশরথের মধ্যে আগে থেকেই সদ্ভাব,মেলামেশা ছিল, তবে এবারের কথা আলাদা। বরের বাবা। তাই ছেলের বাড়ির লোকদের যাতে কোনোরকম থাকা খাওয়ার, চলাফেরার অসুবিধা না হয় তার জন্য সমগ্র মিথিলাবাসী সতর্ক হয়ে রইল।

 সমস্ত নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে আমার পিতা ছেলের বাড়ির লোকদের বরণ করে নিলেন। পিতা রাজা জনক আমার হবু শ্বশুর দশরথ কে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানিয়ে বললেন-‘হে শ্রেষ্ঠ রাজা। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আপনি এসে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব থেকে আত্মীয়তায় উত্তরণ ঘটল। আমি বল-বিক্রম সমস্ত কিছুতে শ্রেষ্ঠ রঘুবংশে কন্যা দান করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে বিবেচনা করছি। হে রাজন আগামীকাল আমার যজ্ঞ সমাপ্ত হওয়ার পরে বিয়ে হয়ে গেলে আমার মনে হয় সমস্ত দিক থেকেই ভালো হবে। তাই হে শ্রেষ্ঠ নৃপতি, এই বিয়েতে আপনার অনুমতি প্রদান করে আমাদের ধন্য করুন।’

 রাজা দশরথ মধুর কণ্ঠে বললেন-‘হে ধর্মজ্ঞ  রাজর্ষি জনক,যে দান গ্রহণ করে তিনিও সদায় দাতার অধীন। আপনি কন্যার পিতা। আপনার ইচ্ছা এবং সুবিধা অনুসারে সমস্ত আয়োজন করুন।’

 তারপরে আমার মাতৃদেবী রাজা দশরথের আশীর্বাদ নেবার জন্য মাথায় ওড়না দিয়ে আমাকে বের করে আনলেন। আমি আমার হবু শ্বশুর, অযোধ্যার প্রজারঞ্জক রাজা দশরথের সামনে হাটুগেড়ে অন্তর থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে চরণ স্পর্শ করলাম। 

পরের দিন যজ্ঞের সমাপ্তি পরে পিতা রাজা জনক, রাজা দশরথ, তাঁর চার পুত্র রাম, লক্ষণ, ভরত শত্রুঘ্ন, ঋষি বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র,‌দুই  পক্ষের মন্ত্রীরা, কুলগুরুরা,আত্মীয়-স্বজন- সবাই অত্যাধুনিক করে সাজিয়ে তোলা মণ্ডপে আহ্বান জানালেন। সবাই নিজের নিজের স্থান অধিকার করার পরে পিতা অত্যন্ত নম্রভাবে বললেন-‘হে শ্রেষ্ঠ সুধীবৃন্দ, আমি অতুলনীয় গৌরবের অধিকারী, অতিশয় প্রভাবশালী বিখ্যাত ইক্ষাকু বংশে কন্যা দান করতে চাইছি। নিয়ম অনুযায়ী কন্যাদানের আগে নিজের বংশ পরিচয় জানাতে হয়। তাই আমি পূর্বপুরুষদের পরিচয় আপনাদের সামনে দিতে চাইছি। অনুগ্রহ করে শুনুন- এই বলে পিতা আমাদের বংশ পরিচয়, আমার জন্ম বৃত্তান্ত সমস্ত কিছু খোলাখুলি ব্যক্ত করলেন।

 ছেলের বংশ পরিচয় দেওয়ার জন্য রাজা দশরথ তাদের কুল গুরু ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠকে অনুরোধ করলেন।

 বংশ পরিচয় হয়ে যাবার পরে পিতা রাজা দশরথ কে হাতজোড় করে বললেন-‘হে রঘু বংশের শ্রেষ্ঠ নরপতি, আমার আরও একটি নিবেদন আছে। আমার দ্বিতীয় কন্যা উর্মিলাকে আপনার গুণী পুত্র লক্ষ্ণণের হাতে দিতে চাই। আপনার অন্য দুজন গুণীপুত্র  ভরত এবং শত্রুঘ্নকে  আমার ভাইঝি মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তিকে দিতে চাইছি।

 পিতার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরে ঋষি বিশ্বামিত্র এবং বশিষ্ঠ তাঁর প্রস্তাবটা আলোচনা করলেন। তারপরে বিশ্বামিত্র তার মন্তব্য দিলেন-‘ইক্ষাকু এবং বিদেহ এই দুই রাজবংশের সঙ্গে কোনো রাজবংশের তুলনা হতে পারে না। এই দুই কুলের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হওয়াটা অত‍্যন্ত আনন্দের কথা। বর- কনের  জোড়ের দিক থেকেও রামের সঙ্গে সীতা,লক্ষ্ণণের সঙ্গে উর্মিলা  রূপে-গুণে মিলেছে। এটা সত্যিই রাজযোটক। ধর্মাত্মা রাজা জনকের দ্বিতীয় প্রস্তাবটির মন্তব্যে বলছি যে তাঁর ভাই মহারাজ কুশধ্বজের  মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি নামে দুই কন্যা রয়েছে, তাঁরা প্রকৃতই গুণী এবং সুন্দরী। ইতিমধ্যে আমি এবং ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ অযোধ্যা নন্দন ভরত এবং শত্রুঘ্নের জন্য এই প্রস্তাব দেওয়ার কথা আলোচনা করছিলাম। তাই আমাদের দিক থেকেও সেই প্রস্তাব বিবেচনার জন্য রাখছি।

 তারপরে ঋষি বিশ্বামিত্র সবাইকে নিরীক্ষণ করে পুনরায় বললেন-‘রাজা দশরথের চারপুত্র  রুপবান, গুণবান, মহাবীর এবং দেবতুল্য। তাই হে বিদেহ রাজ, আপনার ভাইয়ের দুই কন্যাকে ভরত এবং  শত্রুঘ্নের হাতে সমর্পণ করে সমগ্র ইক্ষাকু বংশের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কে বেঁধে ফেলুন। কোনো পক্ষকেই এই মিলনে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।’

 সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাততালি দিয়ে প্রস্তাবকে সমর্থন জানাল। নিমেষের মধ্যে অন্য তিনটি বিয়ে ঠিক হল। আমার অন্তর, আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। আমার তিনজন দেবরের জন্য আমার তিনবোনকে নেওয়া হবে। তার চেয়ে আনন্দের কথা আর কিছুই হতে পারে না। ওরা আমার দুদিক থেকেই আত্মীয় হয়ে উঠবে।

 বিয়ের শুভক্ষণের ওপরে কিছুক্ষণ আলোচনা চলার পরে পিতা রাজা জনক ঘোষনা করলেন –‘সম্পন্ন ব্যক্তিরা, আগামীকাল এবং পরশু ফাল্গুনী নক্ষত্রের দিন। আগামীকাল পূর্বফাল্গুনী এবং পরশু উত্তর ফাল্গুনী নক্ষত্র মিলিত হবে। তাই উত্তরা ফাল্গুনীতে বিবাহের কাজ সম্পন্ন হলে মঙ্গলজনক বলে সেই দিনটিতে বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছে।’

 পিতার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হর্ষধ্বনি দিয়ে একে অপরকে অভিনন্দন জানাল। পরেরদিন বর-কনে দুজনের বাড়িতেই সকাল  থেকে মাঙ্গলিক কাজগুলি অনুষ্ঠিত হল। বরের ঘরের মানুষের থাকা-খাওয়া আমাদের রাজপ্রাসাদ থেকে কিছু দূরে করা হয়েছিল। বিয়ের দিন দুই ঋষি বশিষ্ঠ এবং বিশ্বামিত্র,আমাদের কুলপুরোহিত শতনন্দের উপদেশ এবং পরামর্শ মতে পিতা বিবাহ মন্ডপের মাঝখানে হোমের বেদী নির্মাণ করালেন। বিভিন্ন সুগন্ধি ফুলে সমগ্র মন্ডপ ঝলমল করে উঠল। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, মঙ্গলধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রে, কেউ কারও  কথা শুনতে পারার অবস্থায় রইল না। বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যে শেষে সেই মুহূর্ত  এসে পড়ল। পিতা প্রথমে আমাকে রামের হাতে সম্প্রদান করে বাক রুদ্ধ কন্ঠে বললেন-‘হে দশরথ নন্দন রাম,তোমার মঙ্গল কামনা করলাম। আজ এই শুভক্ষণে আমার অতি আদরের কন্যা সীতাকে তোমার হাতে সমর্পন করলাম।হে রাম সীতার পাণি গ্রহণ কর। তাকে পত্নী হিসেবে স্বীকার কর। এখন থেকে ধর্ম পথে সীতা তোমার চির সঙ্গী হবে। পতিব্রতা হয়ে সীতা সবসময় তোমাকে অনুসরণ করবে।’ তখনই দেব-দুন্দুভির ধ্বনি শোনা গেল। স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। তারপর পিতা একে একে আমাদের তিন বোনকে তিনজনের হাতে সম্প্রদান করলেন। বিয়ে শেষ হওয়ার পরে আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের স্বামীর সঙ্গে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা বাসগৃহে গমন করলাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu   আটপৌরে ২২/৬ আটপৌরে২২/৬ ১. পৃথিবী ...