আটপৌরে ৩৮৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 386, by Sudip Biswas
৩৮৬.
নেহাৎ
সস্তায়। ছেড়ে। থাকা।
দেশজ
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে।
আটপৌরে ৩৮৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 386, by Sudip Biswas
৩৮৬.
নেহাৎ
সস্তায়। ছেড়ে। থাকা।
দেশজ
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে।
আটপৌরে- ২|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 2, by Pankaj Kumar Chatterjee
আটপৌরে কবিতা-২
আটপৌরে কবিতা-২
দ্বন্দ্ব
অর্ধনগ্ন। মিডিয়া। নারী।
বিজ্ঞাপন।
জাগরণ, উপার্জন না দাসত্ব?
শব্দব্রাউজ ৬৪১।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-641, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৪১ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ৩০। ১০। ২২। সময় সকাল দশটা ।
শব্দসূত্র: মুগ্ধ চোখের শব্দ
মুগ্ধ স্বপ্ন । মুগ্ধ প্রেম । মুগ্ধ গান । আমার সঙ্গী হতে চায় । প্রেমহীন বাস্তব সময় সে সব ভুলিয়ে রাখে ।
চোখ বুঝিয়ে ছাড়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত । তাকে তুলে রাখি স্মৃতিতে । অবদমন থেকে হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে সে স্মৃতি আনন্দে বিষাদে জড়ায় ।
মুগ্ধ চোখের শব্দ পড়ে নেওয়া স্বতঃসিদ্ধ ।
আটপৌরে ১|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 1, by Pankaj Kumar Chatterjee
আটপৌরে কবিতা-১
লহর
ফাগুন। আবির। পলাশ।
বসন্ত
বাতাসে বইছে মনের আগুন।
শব্দব্রাউজ ৬৪০।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-640, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৪০ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৯।১০। ২২। সকাল সাড়ে সাতটায় ।
শব্দসূত্র: যা দুঃখ , হুশ ....
যা অন্ধকার । যা ছলচাতুরী । যা পতন। জানি জড়িয়ে মড়িয়ে থাকার বাসনা নিয়ে তোরা বসে আছিস । সুখের জন্য বড় তৃষ্ণা হে ....
দুঃখ এলে বাচ্চাদের মতো তাকে ঢিসুম করে দিই ।দিনে যে কতবার ঢিসুম করতে হয়!
হুশ বললেই যদি যেত অন্ধকার ছলচাতুরী পতন , তবে গাইতাম ' আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ' এখন ভারাক্রান্ত হয়ে গাইতে হয় ' কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ' ...
আটপৌরে ৩৮৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 385, by Sudip Biswas
৩৮৫
দেখা
আলাদা। আলো। লাগলো।
চোখে
অদেখাকে দেখার সুযোগ পেলে।
আটপৌরে ৩৮৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 383, by Sudip Biswas
৩৮৪.
গ্রহণ
হ্রাস। বিলুপ্তি। পোষ-মানানো।
রজার
ফেদেরার খাইবার গিরিপথ চেনো?
শব্দব্রাউজ ৬৩৯।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-639, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৯ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৮। ১০। ২২। সময় দুপুর একটা ।
শব্দসূত্র: আয় মিলে যা
তুই আয়
ঘা খাওয়া সময়
ভুলে ।
মিলে যা আশায়
এক আকাশ
সম্ভাবনায় ।
আয় মিলে যা
উল্লাসে ।
আনন্দে। সুরে । তালে ।
কিছু বই কিছু কথা - ৩০৩। নীলাঞ্জন কুমার
শব্দব্রাউজ ৬৩৮।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-638, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৮ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৬। ১০। ২২। সকাল আটটা পন্ঞ্চান্ন মিনিট ।
শব্দসূত্র: সখি জাগো জাগো
সখি তুমি ধন্য
প্রেম প্রহরে
কেবলই ভাবনায় ।
জাগো রমন স্নেহে
জড়াও
বেহিসেবি অভ্যাসে ।
জাগো গানে গানে
স্বাদ মেটাও
শুধু সাধ মেটাও ।
আটপৌরে ৩৮৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 383, by Sudip Biswas
৩৮৩.
জঙ্
কুটিল। রণবীর। শিকার।
সন্ধান
ঋষি অঙ্গিরা শক্রজিৎ চক্কর।
শব্দব্রাউজ ৬৩৭।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-637, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৭ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । সময় সকাল আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ।
শব্দসূত্র: নিশ্চুপ শব্দের সময়ে
নিশ্চুপ সারাদিন
তবু হাজারো শব্দ
মনে
নিজে নিজে ।
শব্দ জড়ায় ভরায়
আলগোছে ।
সময় আমার সময়
বিনা কোলাহলে
কেটে যাচ্ছে ।
আটপৌরে ৩৮২|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 382, by Sudip Biswas
৩৮২.
প্রথমা
ডেকেছি।আজ। মা'কে।
আঁধারহরা
জবারে তোর প্রাণের প্রদীপটাকে।
আটপৌরে ৩৮১|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 381, by Sudip Biswas
৩৮১
দীপালোক
আঁধার। ঘরের।আলোক-মালা।
উৎসব
আজ মা'য়ের পদস্পর্শে হৃদয়-ঢালা।
শব্দব্রাউজ ৬৩৬।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-636, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৬ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৫। ১০। ২২। সকাল সাতটা পন্ঞ্চাশ মিনিট ।
শব্দসূত্র: অভ্যেসে ভাবি নাচি গাই
অভ্যেসে ভাবি । সকালে কবিতা, আরো কত! হাট বাজার নাস্তি করে ঘরে ভাবনায় ভাসি । অভ্যেসে ভাবি ।
নাচি ঢিমে তালে । তাও অভ্যেসে। সকালের এফ এম রেডিও- র চটুলতায় স্নিগ্ধতা হারাই । রমন স্পৃহা ছুটে আসে ।
গাই ভুল সুরে । নিছক । প্রতিদিন অভ্যেস এভাবে বেঁধে রাখে
পাখিদের পাড়া পড়শী-৭
পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,
Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi
দ্বিতীয় অধ্যায়,
(সাত)
সুনন্দের বিদ্যালয়ের বাৎসরিক পরীক্ষা পার হয়ে গেল। সে এখন তার ভাষায় অন্তত কয়েকদিনের জন্য ফ্রি।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলল–' তুমি আমাকে সময় দিতে পার যদি!
সুনন্দের তাৎক্ষণিক মন্তব্য–' না পারার কোনো কথাই নেই দাদা। আপনি শুধু বললেই হল।
উদয়শঙ্করের আগ্রহকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে সুনন্দ সকালবেলাতেই বেরিয়ে এল। তখনও ঘরের চালে টুপটুপ করে শিশির কণা খসে পড়ছিল। সুনন্দ পরে আসা টুপিটা শিশির কণায় ভিজে গিয়েছিল। তাকে দেখলে কোনো শীতার্ত দেশ থেকে আসার মতো মনে হচ্ছে। যেন একজন এস্কিমো। উদয়শঙ্করের ঘরে প্রবেশ করেই সে টুপিটা খুলে ঝেরে নিল।
– এতটুকু আসতেই এভাবে ভিজে গেছ?
সুনন্দ বলল– বরফ পড়ার মতোই শিশির পড়ছে।
– তাহলে যাওয়া যাবে কি?
উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল।
‐- আপনার কথা।
‐ আরে ভাই। আমি যাবার জন্যই তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
‐ তাহলে চলুন।
সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর শিশির এবং কুয়াশাকে উপেক্ষা করে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। উদয়শঙ্কর সঙ্গে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার নিয়ে নিল। সুুনন্দ বলল‐ আপনি আজ আমার সঙ্গে গিয়ে গ্রামের সমগ্র পরিবেশ ভালোভাবে নিরীক্ষন করে নিতে পারবেন।
উদয়শঙ্কর সেভাবেই ভাবছিল‐ যতদূর সম্ভব পরিবেশ তো একবার পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সে গ্রামটা এখনও ঘুরেফিরে দেখেনি, সব জায়গায় যায়নি। কোথাও না গিয়ে সেই জায়গা সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা করা যায় না। সে না জানা না বোঝা অনেক কথাই হয়তো তার মধ্যে থাকতে পারে।
ওরা দুজনে থানা থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠে সেখান থেকে বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এই বাঁধটা একসময় যাতায়াত করার জন্য মূল পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পি ডব্লিউ ডি বিভাগ রাস্তাটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য নতুন করে পাকা রাস্তা তৈরি করার পরে বাঁধটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ল। মাত্র কয়েক ঘর মানুষের‐দুটো পাড়ার মানুষের জন্য রাস্তাটা ব্যবহারযোগ্য হয়ে থাকল। রাস্তাটা যেখানে আরম্ভ হয়েছে সেখানে গঙ্গা পুখুরি হাইস্কুলের খেলার মাঠ অবস্থিত। রাস্তাটা মানে বাঁধের একপাশে খেলার মাঠ অন্যদিকে বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের দিকটায় একটি প্রকাণ্ড শিমূল গাছ। পি ডব্লিউ ডি বিভাগের মানুষ পরিত্যক্ত রাস্তাটার বন জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজ ছেড়ে দেওয়ার পরে রাস্তাটা জার্মান বন এবং বিভিন্ন জংলি গাছে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিদ্যালয়ের সামনাসামনি তিন চার ঘর মাত্র মানুষের বসতি।
বগলচকের দিকের থেকে আসা রাস্তাটা বাঁধের যে অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থাৎ বিদ্যালয়টির ঠিক সামনের ঘরটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে সুনন্দ মৃদু কন্ঠে কাউকে ডাকতে শুনল উদয়শঙ্কর।
‐ জুলিয়েট।
কাচা ঘরের মেঝেতে কাদামাটির লেপ দিতে থাকা একটি মেয়ে সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে এল। তার দুহাতে কাদা মাটির লেতি।
‐ এত সকালবেলা এই ঠান্ডায়?
সুনন্দ অবাক হল।
‐ আমি ভেবেছিলাম আমাদের গ্রামের মেয়েরা কাজই করে না। এত হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় তুমি ঘর- উঠানের কাজ করছ। তবে তোমাকে আজকাল দেখাই যায় না।
একটু লজ্জা লজ্জা ভাবে মেয়েটি বলল‐ বাড়ির কাজেই ব্যস্ত।
মেয়েটির দুহাতে কাদার লেতি। সে কাদামাটি দিয়ে মেঝে মুছছিল।
– এদিকে এসেছিলাম। তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে গেলাম। যাও যাও, তুমি কাঁপছ। এই ঠান্ডায় শরীরকে কেন কষ্ট দিচ্ছ?
জুলিয়েট তার দুটো হাত কাঁধের ভাঁজে ঢুকিয়ে নিল।
দুজনের কথাবার্তা শুনে সকালবেলায় কে বলে জুলিয়েটের মা বেরিয়ে এল।
– সুনন্দ, এই ঠান্ডায় এত সকালবেলা কোথায় যাচ্ছ?
– এই দাদার সঙ্গে একটু এসেছি।
– কেমন আছ? আজকাল তোমার ভালো খবরগুলি জানাও না। চাকরি পেয়েছ, সেটাও জানাওনি।
না না সেরকম কোনো কথা নয়। আপনারা এমন ভাবেন। আমি কিন্তু ভাবি না। আমি তো আপনাদের সঙ্গে দেখা করলাম। নেপোলিয়ান বাড়িতে আছে কি?
– না, নেই। বেরিয়ে গেছে। সে টিউশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে।মরোয়ার উদ্দেশ্যে। তারমধ্যে জানই তো তাকে আজকাল কুইজের জ্বর পেয়ে বসেছে।
নেপোলিয়ন জুলিয়েটের ভাই।
জুলিয়েট এবং মায়ের সঙ্গে কথা বলে সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর এগিয়ে গেল।
সুনন্দ জুলিয়েটদের সঙ্গে উদয়শঙ্করকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। সে কেবল উদয়শঙ্করকে বলল- পরিবারটি সমস্ত কাজে অগ্রণী। আপনি যদি কখনও কোনো সামাজিক কাজের কথা ভাবছেন এদের জড়িত করতে পারেন। পারা যেতে পারে।
দেখা যাক– উদয়শঙ্কর সুনন্দকে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাল।
গঙ্গাপুখুরী হাই স্কুলের প্রকাণ্ড শিমূল গাছটা পার হয়ে বাঁধটা। স্কুলের সোজাসুজি নতুন পাকা রাস্তাটা তৈরি না হতেই বাঁধটার দুপাশে উঁচু উঁচু সজনে গাছ এবং জার্মানি বনের সমাহার ছিল। এখন ও আছে। তবে রাস্তাটারই গতিপথ বদলে গেল। বাঁধ ছেড়ে এখন সোজাসুজি আসা-যাওয়া করার জন্য পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে। বাঁধটা কয়েকটি পাড়ার লোকজন আসা যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। বাঁধের বাঁ পাশে নেমে যাওয়া খাড়াইর ছোটো ছোটো রাস্তাগুলি এক একটি পাড়ায় আসা-যাওয়া করার পথ।বাঁধের ডান পাশে অর্থাৎ নদীর দিকেও কয়েকটি পরিবারের ঘর-বসতি আছে। বসতিগুলি বাঁশ আর ছোটো বড়ো গাছে পরিপূর্ণ। উদয়শঙ্কর প্রথম দিন এসে যে শিমূল গাছের নিচে বসে জলাশয়ের পাখি গুলি দেখেছিল, এই জায়গাটা সেই জলাশয়ের উত্তর দিকের শেষ অংশ। জলাশয়ের মধ্যে থাকা উঁচু-নিচু মাটির ঢিবি গুলিতে মাটির মালিক সাধারণভাবে বেড়া দিয়ে চাষবাসের জন্য ব্যবহার করছে। নদীটির এই মৃত অংশকে বর্ষাকালের নদীর বন্যার জল ছুঁতে পারে না বলে চাষবাস করার পক্ষে নিরাপদ।
কিছু দূর এগিয়ে সুনন্দরা বাঁধ থেকে নেমে যাওয়া একটা রাস্তা দেখতে পেল। রাস্তাটার বিপরীত দিকে কয়েকটি দোকান। দোকানগুলিতে দুই এক পদ সাধারণ সামগ্রী বিক্রি করা হয়। দোকানগুলি পার হয়ে দুজনেই এগিয়ে গেল।
বাঁধের এই জায়গাটিতে জনবসতি নেই। রাস্তাটাও অব্যবহৃত হওয়ার ফলে দুই দিক থেকে বেড়ে চলা আগাছা রাস্তাটিকে ঘিরে ফেলার উপক্রম করছে। বনানীটিতে উদয়শঙ্কর দু একটি শিমূল, ছাতিম আর কদম গাছ দেখতে পেল। গাছগুলি অপরিণত বয়সের। বাঁধটিকে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ছেড়ে দেওয়ার পরে এই গাছগুলি নতুন করে বেচে উঠছে এবং বনানীটিকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।
– আগে এই জায়গাটা একেবারে খোলামেলা ছিল। আমাদের শৈশবে কিছুটা আগে নদীর বাঁধ ভেঙ্গেছিল এবং তখনই জায়গাটা উঁচু করে পুতে ফেলল। চাষবাস করা যায় না বলে জমিটা বন্ধ্যা হয়ে পড়ে রইল। এক বছর পরে উঁচু উঁচু কাশবন জায়গাটা ঘিরে ফেলল। তখন আমরা দেখেছিলাম কাশফুল ফুটে জায়গাটা একেবারে সাদা ধবধবে হয়ে আছে। আমরা এখানে আসতে ভয় করতাম।
সুনন্দ জায়গাটার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করল।
– কয়েক বছর পরে দেখলাম কাশবনের মধ্যে দুই একটা গাছ জন্ম নিয়েছে। ধীরে ধীরে কাশবনের বিস্তৃতি কমে এল এবং জায়গাটিতে পরিচিত অপরিচিত কিছু গাছপালা জন্মাতে লাগল। ত্রিশ বছরের মধ্যে জায়গাটার একটি লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখতে পাওয়া গেল।
– প্রাকৃতিকভাবে এভাবেই অরণ্য গড়ে ওঠে। প্রথমে কাশ বা সেই ধরনের বন জঙ্গল। তারপরে ছোটো ছোটো উদ্ভিদ এবং লতাগুলি। তারপরে শিমূল, ছাতিম ইত্যাদি উঁচু এবং স্থায়ী গাছগুলি। এই জায়গাটা নতুন করে গড়ে ওঠা অরণ্যের চাক্ষুষ উদাহরণ।
উদয়শঙ্কর অরণ্য কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে সুনন্দকে তার আভাস দিতে চেষ্টা করল।
– তারমানে ছোটো করে হলেও জায়গাটা একটি অরণ্যে পরিবর্তিত হল।
–হ্যাঁ।
উদয়শঙ্কর সুনন্দের কথায় সায় দিল।
– এই জায়গাটির প্রত্যেক পরিবারেই উপার্জন কম হলেও এক একজন চাকরি করা ব্যক্তি আছে। অন্য জায়গায় চাষ করার মতো জমি আছে। তাই এই জায়গাটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।
সুনন্দ অব্যবহৃত মাটিটিতে অরণ্য গড়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করল। বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটার কয়েক মিটার ছেঁড়া অংশ আছে। সেখানটায় গিয়ে দুজনেই উপস্থিত হল।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বন্যা এই জায়গাটায় বাঁধ ভেঙে ছিল নাকি?
সুনন্দ বলল না।
- তাহলে?
– সংগঠনের ছেলেরা এখানে এম্বুস পেতে সৈনিকদের একটা ট্রাক উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই এমবুসে আট জন সৈনিকের মৃত্যু হয়েছিল। ওরে জায়গাটা পুতে ফেলায় বাঁধ থেকে জায়গাটা নিচু হয়ে রইল।
জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে উদয়শঙ্কর জায়গাটা এভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগল যেন সে ভারত সরকারের কোনো সংস্থার এমবুস বিশেষজ্ঞ।
– এই ধরনের ঘটনাস্থলী দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার আগে হয়নি।
- সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য?
সুনন্দের প্রশ্নটা শুনে উদয়শঙ্কর কিছুক্ষণ মনে মনে রইল।
– দুর্ভাগ্য।
উদয় শঙ্কর বলল।
– দূর্ভাগ্য।
কেননা এই এমবুস্টার পরে এই বৃহত্তর অঞ্চলে সেনাবাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছিল সকলেই বলছিল– আধুনিক মানের আক্রমণ। কয়েক মাসের জন্য আমরা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকের মতো হয়ে পড়েছিলাম। সেই রাতগুলির কথা এখন এই অঞ্চলের কেউ মনে করতে চায় না। চায়না।
ছিন্ন অংশটুকু থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে ওরা একটি শিবিরের থান পেল। ঘরটা ছোটো অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। শিব মন্দিরটা থেকে রাস্তা সোজাসুজি এগিয়েছে এবং প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে বাক নিয়ে অন্য একটি রাস্তা এগিয়ে চলেছে। এই জায়গাটাও জনপ্রাণীহীন।
বিছানায় শীতের আমেজ উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসা ২-৪ জন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে ওদের দেখা হয়। তারা গাই বাছুরকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিতে এনেছে। উদয়শঙ্কর দুজন মহিলাকে বাইরের উঠোন ঝাড়ু দিতে দেখতে পেয়েছে। শীতের দিনেও গ্রামের মানুষরা বেশ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে। সে মনে মনে ভাবল।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বাঁধের সোজাসুজি গেলে আমরা কী পাব?
সুনন্দ যেন প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল, সে চট করে উত্তর দিল– ভূটান।
না জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন একটা জিজ্ঞেস করার মতো উদয়শঙ্করের মনে হল। কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য সে এবার সুনন্দকে বলল– আমরা বাঁধের ওপরে ওপরে যাব নাকি!
– যাওয়া যেতে পারে। এভাবে যেতে থাকলে মাঝেমধ্যে আমরা নদীর একেবারে কাছে পাব। অর্থাৎ বাঁধটা নদীর প্রায় পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে। তবে আজ আপনি আমি দেখতে পাওয়া পাখিগুলির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেননি। দু'চারটে নতুন নতুন পাখি আমরা দেখতে পাইনি কি?
– পেয়েছি। তুমি তো জিজ্ঞেস করনি। অন্যদিকে আমরাও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছি যে। দাঁড়াও সুনন্দ। ওই যে পাখিটা দেখছ সেই পাখিটা তুমি চিনতে পারছ কি?
সুনন্দ মনে করিয়ে দিলে যখন উদয়শঙ্কর তাৎক্ষণিকভাবে সুনন্দকে পাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এগিয়ে এল।
– হ্যাঁ পারছি তো।ওটা
– ঠিক বলেছ। ওটা রবিন পাখি। ইংরেজিতে ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই রবীন বলে। বৈজ্ঞানিক নাম কপসিসাস সলেরিস।
সুনন্দ জিজ্ঞেস করল – আপনি সমস্ত পাখির বৈজ্ঞানিক নাম কীভাবে মুখস্ত করেন?
- সব পাখির বৈজ্ঞানিক নাম আমার মনে নেই। দু'চারটার নাম মনে আছে। তোমাকে দেওয়া বইটিতে পাখি গুলির ইংরেজি নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম গুলি লেখা আছে। বিছানায় শুয়ে থাকলেও আমি সেগুলি দেখতে থাকি আর মুখস্ত করি। তুমিও সেরকম করতে পার। পাখি একটা দেখলেই সেটাকে বইতে থাকা আলোক ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে এবং দুটো নাম মুখস্ত করে রাখবে।মনে রাখা কঠিন হলেও দুদিন পরে সহজ হয়ে পড়বে। পাখিগুলি পুরুষ মহিলা চিনতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ কথা।
– পাখিদের মধ্যে পুরুষ মহিলা আলাদা নাকি!
সুনন্দ ভাববোধক দৃষ্টিভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ, পাখিদের মধ্যে লিঙ্গ ভেদ স্পষ্ট। রবিন পাখিটাই দেখ। তার মাথা এবং পুচ্ছাংশ কালো। বুক, পেট, ডানা এবং লেজের নিচের অংশ সাদা । ডানায় কালোর ওপরে সাদা সাদা আঁচ আছে। এটা পুরুষ রবিন পাখি।মহিলা রবিন সাদা-কালোর পরিবর্তে ছাইরঙের মতো কালো।
উদয়শঙ্করের কথা একান্ত মনে শুনে সুনন্দ এগিয়ে যাচ্ছে।
– আর ও একটি সুন্দর পাখি দেখছি দাঁড়াও – উদয় শঙ্কর সুনন্দকে পাখিটার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল – ওই পাখিটা দেখছ?
সুনন্দ পাখিটা দেখেনি। সুনন্দকে পাখিটা দেখানোর জন্য উদয়শঙ্করকে কিছুটা কষ্ট করতে হল। পাখিটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর পরেও সুনন্দ দেখছেনা।
– এখন দেখেছ পাখিটা?
– দেখেছি। দেখেছি।
সুনন্দ সম্মতি জানিয়ে বলল।
– প্রথমে তোমার দেখতে অসুবিধা হয়েছিল কেন বলতো?
– গাছের পাতার সঙ্গে একেবারে মিলে আছে যে। বোঝাই যায় না।
– প্রকৃতি তার সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করে রেখেছে বুঝেছ। যেভাবে মানুষের মগজ, হৃদপিণ্ডকে যথেষ্ট সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয়েছে। এখন বলতো পাখিটার নাম কি? পাখিটা পুরুষ না মহিলা?
- এই সুন্দর পাখিটা আমি প্রায়ই দেখি কিন্তু নামটাই জানিনা। সুনন্দ বলল।
– সুন্দর পাখিটার নামটাও সুন্দর– রূপসী পাখি, স্কারলেট মিনি ভেট। এটি মহিলা পাখি। এর ঠোঁটের নিচ থেকে পুচ্ছাংশ দেখেছ কি কেমন হলদে। ডানাও হলদে। শরীরটা ছাই রঙের। পাখিটার হলদে রঙের জায়গায় লাল রং মানে পাকা আমের শাঁসের মতো হলে ভাববে সেটা পুরুষ পাখি। বাকি মাথা, গলা, পিঠ, ডানা এবং পুচ্ছাংশ কালো। এখন বুঝতে পেরেছ কি পাখির পুরুষ মহিলা আমরা কীভাবে সনাক্ত করতে পারি।
- তবে এবার বৈজ্ঞানিক নামটা বললে না যে–
– মনে থাকলে বলবে। ভুলে গেছি মনে নেই। তুমি মনে রাখতে চাও যদি আমি তোমাকে বই দেখে বলতে হবে।
উদয়শংকর হে হে করে হেসে ফেলল। সেভাবেইনি তার হাসি শুনে যে পাখিটা উড়ে যেতে পারে। আর সেটাই হল। ওদের বিপরীত দিকে পাখিটা উড়ে চলে গেল।
উদয়শঙ্কর এবং সুনন্দ এসে এবার একটি ব্রয়লার পামের সামনে উপস্থিত হল।
উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল– এখানে ব্রয়লার ফার্ম আছে!
– দুটো আছে। কয়েকটি ছেলে ফার্ম আরম্ভ করেছিল, লাভ হয় না বলে এখন ছেড়ে দিয়েছে।
–আমাদের ছেলেদের সেটাই সমস্যা। ধৈর্য ধরতে পারে না। উপার্জনের দুুপয়সা হাতে এলেই একই দিনে দামি বাইক এবং মোবাইল নিতে শুরু করে।
উদয়শঙ্কর পামটার সামনে দাঁড়িয়ে পামটা লক্ষ্য করল। চারশো-পাচশো মুরগি রাখার মতো পামটিতে সুবিধা রয়েছে।ব্রয়লার ফার্ম থেকে নির্গত এক বিশেষ ধরনের গন্ধ জায়গাটাতে ছড়িয়ে পড়েছে।
–পামটা বেশ বড়ো।
উদয়শঙ্কর সুনন্দের সামনে মন্তব্য করল। দুজনকে পামের সামনে দেখে ভেতর থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে এল।
– সুনন্দ দা। অসময়ে এদিকে যে। আপনাকে বহুদিন ধরে দেখছি না।
–ওঁর সঙ্গে এদিকেই এক পাক ঘুরতে এসেছিলাম। ভালো আছ? ফার্ম কেমন চলছে?
– আছি মোটামুটি। চালাচ্ছে, চলছে, চলছি।
ব্রয়লার ফার্মের মালিক ছেলেটি বলল।
– ইনি উদয়দা। আমাদের এখানে পাখি পর্যবেক্ষণ করে বেড়াচ্ছে। আজ ওকে অল্প সঙ্গ দিচ্ছি।
-আপনাকে আমি দেখেছি। গতবছরেও এসেছিলেন নয় কি?
- হ্যাঁ গতবারও এসেছিলাম। জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। সেজন্য এবারও আবার এলাম। তোমার নামটা জানতে পারি কি?
উদয়শঙ্কর ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিল– সৌরভজ্যোতি কলিতা।
– তোমার ফার্মটার কত বছর হয়েছে?
– দাদা,দশ বছরের মতো হয়েছে।
– তাহলে তোমার ফার্ম করার বেশ কয়েক বছর হয়েছে। ভালোই, লেগে থাকলে মেগে খায় না।
উদয়শঙ্কর আর সুনন্দ কিছুক্ষণ সৌরভের সঙ্গে এটা ওটা কথা বলে ফার্মের সামনে থেকে ফিরে এল।
– যে পথে এসেছিলাম সে দিকে যাব না এই পথে গিয়ে পুনরায় পাকা রাস্তায় উঠব।
শিবমন্দিরের সামনে উপস্থিত হওয়ায় সুনন্দ উদয়শঙ্করকে সামনের পথটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল।
– আমরা পাকা রাস্তায় উঠব আর রাস্তাটা পার হয়ে নদীর তীর ধরে গিয়ে জলাশয়টা পাব।হবে? তোমার ক্লান্ত বা ক্ষুধা লাগছে নাকি। নাকি দুটিই লেগেছে।
– না না। ক্লান্তিও লাগেনি ক্ষুধা ও লাগেনি। আপনার যদি ক্লান্ত লেগে থাকে পিঠের ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন।
ঠোঁট দুটি বাঁকা করে দেখিয়ে ঈষৎ হেসে উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলে উঠল– ভালো বলেছ। যতটা সম্ভব বহন করে নিয়ে যাই।
শিব মন্দিরের সামনে থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের মতো দূরত্ব হবে। রাস্তাটার দু'পাশে সবুজ মনোরম বসতি। নির্দিষ্ট সময়ে ফোঁটার জন্য অপেক্ষা করে থাকা তিনটি এজার গাছের একটি সারি। আর দুটো শিমূল গাছ। দেখেই বোঝা যায় গাছ দুটির বয়স হয়েছে। রাস্তাটার নিচে মাটির মালিক লাগানো সেগুন এবং তিতা চপার গাছগুলি বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠেছে। সারি সারি করে লাগানো সোজা গাজ গুলির মধ্য দিয়ে তাকালে অনেক দূর পর্যন্ত সুন্দরভাবে দেখা যায়।
– এই গাছ গুলির মধ্য দিয়ে সোজাসুজি নদী পর্যন্ত এক ফার্লঙের মতো দূরত্ব হবে। তখন আমরা সোণ কুরিহার সেতুর নিচ দিয়ে পার হলেই জলাশয়টা পেয়ে যাব।
– আজ এভাবে যাবনা নাকি সুনন্দ। অন্য একদিন যাব। আজ পাকা রাস্তাটার দিকে যাবার এই পথটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিই।
দুজনই পাকা রাস্তায় উঠল। এই জায়গাটা থেকে কিছুটা ভাটিতে গেলেই থানে প্রবেশ করার রাস্তাটা পাওয়া যায়। থান হয়ে জলাশয়ে না গিয়ে দুজনেই নদীর তীর ধরে জলাশয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে সুনন্দের পছন্দ হল না। পাকা রাস্তাটা থেকে নদীর তীর ধরে যাবার জন্য খারাই অতিক্রম করতে হবে। উদয় শঙ্কর একবার মাত্র এই খারাইটা দিয়ে নেমে গিয়ে নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছিল।
–গতবছর আসার সময় আমি এদিকেই নেমে গিয়েছিলাম।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে আশ্বাস দেবার জন্য বলল। কিন্তু সুনন্দের মনে সন্দেহ। ভয় ভীতভাবে সে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাচ্ছে।
– উদয়দা আমি নেমে যেতে পারব কি?
– ইচ্ছা করলে পারবে। একটু সাবধানে নামতে হবে। শিশির পড়ে একদম পিছল হয়ে আছে। প্রথমে আমি নেমে যাই এবং পা রাখার মতো তোমার সুবিধা করে দিই। হবে তো!
সেভাবে উদয়শঙ্কর প্রথমে নেমে গেল এবং নেমে যাবার সময় জুতো দিয়ে খাজ কাটার মতো সাঁচ বসিয়ে দিয়ে গেল। তথাপি সুনন্দ ভয় পেয়ে ইতস্তত করতে লাগল। উদয়শঙ্কর ভাবল এভাবে নামতে হলে সুনন্দ পা পিছলে পড়াটা নিশ্চিত। সুনন্দকে অপেক্ষা করতে বলে সে একটা শক্ত লতার খোঁজে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। একটু খোঁজখবর করে সে একটা শক্ত লতা ছিঁড়ে টেনে আনল। সুনন্দ ভয় না করলে এটা দিয়ে সুন্দর করে নেমে আসতে পারবে। উদয় শঙ্কর লতাটা সুনন্দের দিকে ছুড়ে দিল এবং উদয় শঙ্কর বলা অনুসারে সুনন্দ খাড়াইয়ের কাছের একটা গাছের ডালে লতাটা বেঁধে তার অন্য প্রান্তটা নিচের দিকে নামিয়ে দিল । এখন নিচের দিকে ঝুলে থাকা লতাটা খামচে ধরে উদয়শঙ্কর পা দিয়ে তৈরি করা খাজে খাজে পা রেখে সুনন্দ নেমে এল। মাটির কাছাকাছি পৌঁছে হুড়মুড় করে নেমে পড়ায় শেষ মুহূর্তে সে পিছলে পড়ে গেল যদিও খুব বেশি ব্যথা পেল না।
– ব্যথা পেয়েছ নাকি?
কাপড়ে লেগে থাকা বালি ঝাড়তে ঝাড়তে সুনন্দ বলল– পাইনি উদয়দা। হাতটাতে শুধু –
খসখসে লতাটা সজোরে খামচে ধরে পিছলে পড়ায় বা হাতটা একটু ঘষটে গেছে।
– তোমার প্রশিক্ষণের আজ প্রথম দিন। প্রথম দিনে দুই একটি ছোটোখাটো ঘটনা ঘটলে কোনো ব্যাপার না। তার মধ্যে তোমার হয়তো ক্ষুধা পেয়েছে।
– তাই নাকি? কথাগুলি তাহলে এরকম?
উপহাসের সুরে সুনন্দ উদয়শঙ্করকে প্রতি আক্রমণ করল।
উদয়শংকর প্রথমবার খাড়াই বেয়ে নেমে নদীর তীর ধরে যে পথে গিয়েছিল আজ সেভাবে না গিয়ে সোজাসুজি জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেল। ঢেকিয়া এবং বনে লেগে থাকা শিশির দুজনেরই হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলল।
সুনন্দ আক্ষেপ করে বলল– একেবারে ভিজে গেলাম উদয়দা।
– অরণ্যের ভেতরে এইসব আক্ষেপ আবদারের কোনো কদর নেই। শীতে শিশিরে ভেজা, গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে ভেজা, জোঁক, মশা, ডাসা,জংলি পাতা– সবকিছুকে নিয়ে মানিয়ে চলা শিখতে হবে। শিখতে জানতে হবে।
সুনন্দ মনে মনে উদয়শঙ্করের পেছন পেছন যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করল। না হলে কথায় কথা বাড়ে। দুজনেই যেতে যেতে জলাশয়ের পাড়ের নির্দিষ্ট জায়গাটায় পৌঁছাল।
হেলানো গাছটা দেখে সুনন্দ খুশি হল এবং ছোটৌ একটি ছেলের মতৌ সে দু পা ঝুলিয়ে গাছটায় আয়েশ করে বসে পড়ল।
– উঠ উঠ। বসলে হবে না। ক্লান্ত লাগছে নাকি?
– এভাবে হাঁটার অভ্যাস নাই যে।
– তাহলে বসো বসো। একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও।
উদয়শঙ্কর সাধারণভাবে রান্নাবান্না করার জন্য একটা তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য উনুন তৈরি করে নিয়েছিল। সে সেই উনুনের ওপরে আশেপাশে থাকা শুকনো কিছু ডাল- পাতা চাপিয়ে দিল। তারপর বেগ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ এবং দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরানোর চেষ্টা করল। শিশিি পড়ে ডাল গুলি ডিজে থাকার জন্য আগুন জ্বালাতে তার একটু কষ্ট হল যদিও আগুন জ্বালাতে সমর্থ হল। এবার বেগ থেকে স্টিলের একটা পাত্র বের করে তার মধ্যে বোতল থেকেই জল ঢেলে পাত্রটা তাৎক্ষণিক উনুনের ওপর বসিয়ে দিয়ে জলটা গরম হতে দিল।
সুনন্দ উদরশঙ্করের কারুকার্য গুলি নিবিষ্ট মনে দেখতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল উদয়দা গরম জল দিয়ে কী করবে!
জলটা একটু গরম হতেই উদয়শঙ্কর ব্যাগ থেকে দুটো মেগীর 'কাপ নুডুলস' বের করল। কাপ দুটির ঢাকনি দুটি খুলে সে তার পাতলা ফয়েলের সুরক্ষা কবচ ছাড়িয়ে হাতের তালুতে মুঠি মেরে গোল করে ব্যাগে ভরিয়ে নিল।
– অরণ্যের মধ্যে তুমি ব্যবহার করা কোনো জিনিস ফেলতে পার না। এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কথা। সব সময় মনে রাখবে।
উদয়শঙ্কর কী করছে বলে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা সুনন্দকে উদ্দেশ্য করে বলল।
সুনন্দ সম্মতি সূচকভাবে বলল -হ্যাঁ উদয় দা।
তারপর সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল উদয়শঙ্করের দিকে। উদয়শঙ্কর উনুন থেকে নামানো পাত্রটার জল কাপ নুডলস দুটিতে একটু একটু করে ঢেলে দিল। মেগীর উপরে গরম জল পড়ে মেগীটায় বুদবুদ কাটতে লাগল।
–হো লোয়া।
– এটা কী?
– সুনন্দ কিছুই বুঝতে পারছে না।
– সকালের আহার। মেগী দিয়ে,খাও।ও কীভাবে খাবে চামচ দিইনি।
উদয়শঙ্কর নিজেকে নিজে বলার মতো করে ব্যাগ থেকে দুটি ডিসপোজেবল স্পুন বের করে একটা সে নিল অন্যটি সুনন্দকে দিল। সুনন্দ তখন অবাক হল যে উদয়শঙ্কর এত কম সময়ের মধ্যে তার জন্য খাবার জিনিস তৈরি করে ফেলল। মেগী এরকম প্যাকেটে পাওয়া যায় বলে সে আগে জানত না। সুনন্দ চামচটা মেগীর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা মেগীর মশলা মিশ্রিত গরম ধোঁয়ার ঘ্রাণ লেগে তার পেটের ভেতরে ক্ষুধাটা জেগে উঠল। গন্ধটা সুনন্দের মুখের সন্তুষ্টির ভাব পরিস্ফুট করে তুলল।
উদয়শঙ্করের দিকে না তাকিয়ে সে মেগীর স্বাদ নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
– উদয়দা, জল এনেছ নাকি?
উদয় শঙ্কর বেগ থেকে জলের বোতলটা বের করে সুনন্দের হাতে তুলে দিয়ে বলল– আমাকে তোমার বউ পেয়েছ নাকি?
এক ঢোক ঠান্ডা জল গলায় ঢেলে দিয়ে সুনন্দ বলল– উদয়দা স-রি,স-রি।মেগী গলায় আটকে যাওয়ার জন্যই জল–
– আমি কি সিরিয়াসলি বলেছি নাকি। তুমি যে সরি বললে। তবে আমাদের ইংরেজির ব্যবহার একটু বেশি হয়েছে।
– প্রত্যেকেই এরকম বলে দেখছি।
উদয়শঙ্কর ঝোলা থেকে একটা পেপার ব্যাগ বের করে খালি কাপ নুডুলসের পাত্র দুটো এবং ডিসপোজেবল স্পুন আদি নোংরাগুলি পেপার বেগে ভরিয়ে পুনরায় ঝোলাতে ভরিয়ে রাখল। থানের বাকি নোংরাগুলি সে পরে পুড়িয়ে ফেলবে।
– সুনন্দ ক্ষুধা পালিয়েছে তো?
পেটে একটা হাত রেখে ক্ষুধা পালিয়েছে কিনা পরখ করে দেখার ভাবে সুনন্দ বলল– পালিয়েছে।
– অরণ্যের মধ্যে কোথায় ভূরি ভোজন করার সুবিধা পাবে। আমি সঙ্গে মেগীর প্যাকেট এবং বিভিন্ন শুকনো ফল নিয়ে ঘুরে বেড়াই । ক্ষুধা পেলে তা দিয়েই কাজ সেরে নিই।
– একটা নতুন কথা শিখলাম। তিন বেলা মাটিতে পিঁড়ি পেতে ভাত খাওয়া আমাদের কাছে এই ধরনের কিছু 'ফোল্ডিং' খাদ্য স্বপ্নের ও অগোচর। – ফোল্ডিং নয় 'ফাস্টফুড'।
ফাস্টফুড গুলি ফোল্ডিংই ধরে নিন।
দুজনের কথাবার্তায় একটা কাঠঠোকরা পাখি ঠোঁট দিয়ে কাঠের মধ্যে ঠক ঠক করা শব্দ যতি ফেলল। নির্জন অরণ্যের নির্জনতা ভেঙ্গে শব্দটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
– এটা কি পাখি?
উদয়শঙ্কর পাখি দেখলেই সুনন্দকে একই প্রশ্ন করে।
– কাঠঠোকরা।
– কাঠঠোকরার কয়েকটি প্রজাতি আছে। এই প্রজাতিকে ছোটো সোনা কাঠঠোকরা বলা হয়। ইংরেজিতে বলে ব্লেক- রাম্পড- ফ্লেইমবেক। তুমি জিজ্ঞেস করার আগেই বলে রাখলাম– বৈজ্ঞানিক নামটা কিন্তু আমার মনে নেই। দেখছেন কি পাখিটার মাথার উপরিভাগে কীরকম উজ্জ্বল রং। ঘাড় কালো। ডানা খয়েরি রঙের। কাঠঠোকরা ও তার শক্তিশালী ঠোঁট গাছের পচা অংশে ঠুকরে তাতে পোকামাকড় ভক্ষণ করে ।
সুনন্দ আর উদয়শংকর পাখিটা বিশেষ ভঙ্গিমায় নেচে নেচে পোকামাকড় খেতে থাকা দৃশ্যটা কিছুক্ষণ ধরে দেখতে থাকল।
উদয়শঙ্কররা পাখিদের পাড়াপড়োশিতে উপস্থিত হওয়ার সময় কাঠঠোকরা গুলি খাদ্যের সন্ধানে ওদের বিচরণ স্থলে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছিল।
শব্দব্রাউজ ৬৩৫।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-635, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৪। ১০।২২। সময় সকাল আটটা ।
শব্দসূত্র: মেঘলা ধূসর সাজ
মেঘের ঘরে মেঘলা মেয়ে সাজগোজে ব্যস্ত । সে কখনো ঘুটঘুটে কালো কখনও পেঁজা তুলোর মেখলা পরে সারা আকাশ জমিয়ে রাখে । মেঘের ঘর এত পরিস্কার রাখে যে আকাশ সে ঘরে বিশ্রাম নেয় ।
মেঘলা মেয়ে যত মেঘের সাজ পরুক না কেন শেষমেশ বাতাসের প্রেমে ভেসে লজ্জায় জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে । চাতকের তখন ফটিক জল বলা বন্ধ ।
মুহূর্তে পাল্টায় মেঘলা মেয়ের সাজগোজ । ওতেই তার আনন্দ ।গোধুলি রঙের শাড়ির আঁচলে লাগায় তারাদের । তখন মেঘলা মেয়ে হাসে আর সুন্দর হয় জীবন ।
আটপৌরে ৩৮০|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 380, by Sudip Biswas
৩৮০
মা
শ্যামা। মা'য়ের। আঁচলতলে।
রাঙাজবা
ফুটেছে আমার হৃদয় কুঞ্জবনে।
আটপৌরে ৩৭৯|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 379, by Sudip Biswas
৩৭৯.
আলোকবর্তিকা
জ্বালো।দীপককান্তি। প্রদীপমল্লিকা।
অমানিশা
দূরে যাক নিশাপুর আলোকশিখা।
শব্দব্রাউজ ৬৩৪।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-634, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৪ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২৩। ১০। ২২। সকাল সাতটা পন্ঞ্চাশ মিনিট
শব্দসূত্র: লগ্ন বয়ে যায়
লগ্নের ভেতর সমৃদ্ধি খুঁজি । খুঁজি উল্লাস । শব্দদূষণ কণা তখন বোধে আসে না। অমৃত সময় কোথা? সমৃদ্ধি তাই খোঁজাই সার ।
যায় দিন, হিসেব মতো বয়ে । গুচ্ছের চিন্তার সমাধান হয়ে গেলে ফর্দ যেমন ছিঁড়ে ফেলি, তেমনি জীবনের অনেক মুহূর্ত আস্তাকুড়ে । হা হা ....
পাখিদের পাড়া পড়শি- ৭
পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,
Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi
দ্বিতীয় অধ্যায়,
(সাত)
সুনন্দের বিদ্যালয়ের বাৎসরিক পরীক্ষা পার হয়ে গেল। সে এখন তার ভাষায় অন্তত কয়েকদিনের জন্য ফ্রি।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলল–' তুমি আমাকে সময় দিতে পার যদি!
সুনন্দের তাৎক্ষণিক মন্তব্য–' না পারার কোনো কথাই নেই দাদা। আপনি শুধু বললেই হল।
উদয়শঙ্করের আগ্রহকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে সুনন্দ সকালবেলাতেই বেরিয়ে এল। তখনও ঘরের চালে টুপটুপ করে শিশির কণা খসে পড়ছিল। সুনন্দ পরে আসা টুপিটা শিশির কণায় ভিজে গিয়েছিল। তাকে দেখলে কোনো শীতার্ত দেশ থেকে আসার মতো মনে হচ্ছে। যেন একজন এস্কিমো। উদয়শঙ্করের ঘরে প্রবেশ করেই সে টুপিটা খুলে ঝেরে নিল।
– এতটুকু আসতেই এভাবে ভিজে গেছ?
সুনন্দ বলল– বরফ পড়ার মতোই শিশির পড়ছে।
– তাহলে যাওয়া যাবে কি?
উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল।
‐- আপনার কথা।
‐ আরে ভাই। আমি যাবার জন্যই তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
‐ তাহলে চলুন।
সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর শিশির এবং কুয়াশাকে উপেক্ষা করে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। উদয়শঙ্কর সঙ্গে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার নিয়ে নিল। সুুনন্দ বলল‐ আপনি আজ আমার সঙ্গে গিয়ে গ্রামের সমগ্র পরিবেশ ভালোভাবে নিরীক্ষন করে নিতে পারবেন।
উদয়শঙ্কর সেভাবেই ভাবছিল‐ যতদূর সম্ভব পরিবেশ তো একবার পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সে গ্রামটা এখনও ঘুরেফিরে দেখেনি, সব জায়গায় যায়নি। কোথাও না গিয়ে সেই জায়গা সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা করা যায় না। সে না জানা না বোঝা অনেক কথাই হয়তো তার মধ্যে থাকতে পারে।
ওরা দুজনে থানা থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠে সেখান থেকে বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এই বাঁধটা একসময় যাতায়াত করার জন্য মূল পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পি ডব্লিউ ডি বিভাগ রাস্তাটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য নতুন করে পাকা রাস্তা তৈরি করার পরে বাঁধটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ল। মাত্র কয়েক ঘর মানুষের‐দুটো পাড়ার মানুষের জন্য রাস্তাটা ব্যবহারযোগ্য হয়ে থাকল। রাস্তাটা যেখানে আরম্ভ হয়েছে সেখানে গঙ্গা পুখুরি হাইস্কুলের খেলার মাঠ অবস্থিত। রাস্তাটা মানে বাঁধের একপাশে খেলার মাঠ অন্যদিকে বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের দিকটায় একটি প্রকাণ্ড শিমূল গাছ। পি ডব্লিউ ডি বিভাগের মানুষ পরিত্যক্ত রাস্তাটার বন জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজ ছেড়ে দেওয়ার পরে রাস্তাটা জার্মান বন এবং বিভিন্ন জংলি গাছে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিদ্যালয়ের সামনাসামনি তিন চার ঘর মাত্র মানুষের বসতি।
বগলচকের দিকের থেকে আসা রাস্তাটা বাঁধের যে অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থাৎ বিদ্যালয়টির ঠিক সামনের ঘরটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে সুনন্দ মৃদু কন্ঠে কাউকে ডাকতে শুনল উদয়শঙ্কর।
‐ জুলিয়েট।
কাচা ঘরের মেঝেতে কাদামাটির লেপ দিতে থাকা একটি মেয়ে সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে এল। তার দুহাতে কাদা মাটির লেতি।
‐ এত সকালবেলা এই ঠান্ডায়?
সুনন্দ অবাক হল।
‐ আমি ভেবেছিলাম আমাদের গ্রামের মেয়েরা কাজই করে না। এত হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় তুমি ঘর- উঠানের কাজ করছ। তবে তোমাকে আজকাল দেখাই যায় না।
একটু লজ্জা লজ্জা ভাবে মেয়েটি বলল‐ বাড়ির কাজেই ব্যস্ত।
মেয়েটির দুহাতে কাদার লেতি। সে কাদামাটি দিয়ে মেঝে মুছছিল।
– এদিকে এসেছিলাম। তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে গেলাম। যাও যাও, তুমি কাঁপছ। এই ঠান্ডায় শরীরকে কেন কষ্ট দিচ্ছ?
জুলিয়েট তার দুটো হাত কাঁধের ভাঁজে ঢুকিয়ে নিল।
দুজনের কথাবার্তা শুনে সকালবেলায় কে বলে জুলিয়েটের মা বেরিয়ে এল।
– সুনন্দ, এই ঠান্ডায় এত সকালবেলা কোথায় যাচ্ছ?
– এই দাদার সঙ্গে একটু এসেছি।
– কেমন আছ? আজকাল তোমার ভালো খবরগুলি জানাও না। চাকরি পেয়েছ, সেটাও জানাওনি।
না না সেরকম কোনো কথা নয়। আপনারা এমন ভাবেন। আমি কিন্তু ভাবি না। আমি তো আপনাদের সঙ্গে দেখা করলাম। নেপোলিয়ান বাড়িতে আছে কি?
– না, নেই। বেরিয়ে গেছে। সে টিউশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে।মরোয়ার উদ্দেশ্যে। তারমধ্যে জানই তো তাকে আজকাল কুইজের জ্বর পেয়ে বসেছে।
নেপোলিয়ন জুলিয়েটের ভাই।
জুলিয়েট এবং মায়ের সঙ্গে কথা বলে সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর এগিয়ে গেল।
সুনন্দ জুলিয়েটদের সঙ্গে উদয়শঙ্করকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। সে কেবল উদয়শঙ্করকে বলল- পরিবারটি সমস্ত কাজে অগ্রণী। আপনি যদি কখনও কোনো সামাজিক কাজের কথা ভাবছেন এদের জড়িত করতে পারেন। পারা যেতে পারে।
দেখা যাক– উদয়শঙ্কর সুনন্দকে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাল।
গঙ্গাপুখুরী হাই স্কুলের প্রকাণ্ড শিমূল গাছটা পার হয়ে বাঁধটা। স্কুলের সোজাসুজি নতুন পাকা রাস্তাটা তৈরি না হতেই বাঁধটার দুপাশে উঁচু উঁচু সজনে গাছ এবং জার্মানি বনের সমাহার ছিল। এখন ও আছে। তবে রাস্তাটারই গতিপথ বদলে গেল। বাঁধ ছেড়ে এখন সোজাসুজি আসা-যাওয়া করার জন্য পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে। বাঁধটা কয়েকটি পাড়ার লোকজন আসা যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। বাঁধের বাঁ পাশে নেমে যাওয়া খাড়াইর ছোটো ছোটো রাস্তাগুলি এক একটি পাড়ায় আসা-যাওয়া করার পথ।বাঁধের ডান পাশে অর্থাৎ নদীর দিকেও কয়েকটি পরিবারের ঘর-বসতি আছে। বসতিগুলি বাঁশ আর ছোটো বড়ো গাছে পরিপূর্ণ। উদয়শঙ্কর প্রথম দিন এসে যে শিমূল গাছের নিচে বসে জলাশয়ের পাখি গুলি দেখেছিল, এই জায়গাটা সেই জলাশয়ের উত্তর দিকের শেষ অংশ। জলাশয়ের মধ্যে থাকা উঁচু-নিচু মাটির ঢিবি গুলিতে মাটির মালিক সাধারণভাবে বেড়া দিয়ে চাষবাসের জন্য ব্যবহার করছে। নদীটির এই মৃত অংশকে বর্ষাকালের নদীর বন্যার জল ছুঁতে পারে না বলে চাষবাস করার পক্ষে নিরাপদ।
কিছু দূর এগিয়ে সুনন্দরা বাঁধ থেকে নেমে যাওয়া একটা রাস্তা দেখতে পেল। রাস্তাটার বিপরীত দিকে কয়েকটি দোকান। দোকানগুলিতে দুই এক পদ সাধারণ সামগ্রী বিক্রি করা হয়। দোকানগুলি পার হয়ে দুজনেই এগিয়ে গেল।
বাঁধের এই জায়গাটিতে জনবসতি নেই। রাস্তাটাও অব্যবহৃত হওয়ার ফলে দুই দিক থেকে বেড়ে চলা আগাছা রাস্তাটিকে ঘিরে ফেলার উপক্রম করছে। বনানীটিতে উদয়শঙ্কর দু একটি শিমূল, ছাতিম আর কদম গাছ দেখতে পেল। গাছগুলি অপরিণত বয়সের। বাঁধটিকে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ছেড়ে দেওয়ার পরে এই গাছগুলি নতুন করে বেচে উঠছে এবং বনানীটিকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।
– আগে এই জায়গাটা একেবারে খোলামেলা ছিল। আমাদের শৈশবে কিছুটা আগে নদীর বাঁধ ভেঙ্গেছিল এবং তখনই জায়গাটা উঁচু করে পুতে ফেলল। চাষবাস করা যায় না বলে জমিটা বন্ধ্যা হয়ে পড়ে রইল। এক বছর পরে উঁচু উঁচু কাশবন জায়গাটা ঘিরে ফেলল। তখন আমরা দেখেছিলাম কাশফুল ফুটে জায়গাটা একেবারে সাদা ধবধবে হয়ে আছে। আমরা এখানে আসতে ভয় করতাম।
সুনন্দ জায়গাটার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করল।
– কয়েক বছর পরে দেখলাম কাশবনের মধ্যে দুই একটা গাছ জন্ম নিয়েছে। ধীরে ধীরে কাশবনের বিস্তৃতি কমে এল এবং জায়গাটিতে পরিচিত অপরিচিত কিছু গাছপালা জন্মাতে লাগল। ত্রিশ বছরের মধ্যে জায়গাটার একটি লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখতে পাওয়া গেল।
– প্রাকৃতিকভাবে এভাবেই অরণ্য গড়ে ওঠে। প্রথমে কাশ বা সেই ধরনের বন জঙ্গল। তারপরে ছোটো ছোটো উদ্ভিদ এবং লতাগুলি। তারপরে শিমূল, ছাতিম ইত্যাদি উঁচু এবং স্থায়ী গাছগুলি। এই জায়গাটা নতুন করে গড়ে ওঠা অরণ্যের চাক্ষুষ উদাহরণ।
উদয়শঙ্কর অরণ্য কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে সুনন্দকে তার আভাস দিতে চেষ্টা করল।
– তারমানে ছোটো করে হলেও জায়গাটা একটি অরণ্যে পরিবর্তিত হল।
–হ্যাঁ।
উদয়শঙ্কর সুনন্দের কথায় সায় দিল।
– এই জায়গাটির প্রত্যেক পরিবারেই উপার্জন কম হলেও এক একজন চাকরি করা ব্যক্তি আছে। অন্য জায়গায় চাষ করার মতো জমি আছে। তাই এই জায়গাটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।
সুনন্দ অব্যবহৃত মাটিটিতে অরণ্য গড়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করল। বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটার কয়েক মিটার ছেঁড়া অংশ আছে। সেখানটায় গিয়ে দুজনেই উপস্থিত হল।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বন্যা এই জায়গাটায় বাঁধ ভেঙে ছিল নাকি?
সুনন্দ বলল না।
- তাহলে?
– সংগঠনের ছেলেরা এখানে এম্বুস পেতে সৈনিকদের একটা ট্রাক উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই এমবুসে আট জন সৈনিকের মৃত্যু হয়েছিল। ওরে জায়গাটা পুতে ফেলায় বাঁধ থেকে জায়গাটা নিচু হয়ে রইল।
জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে উদয়শঙ্কর জায়গাটা এভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগল যেন সে ভারত সরকারের কোনো সংস্থার এমবুস বিশেষজ্ঞ।
– এই ধরনের ঘটনাস্থলী দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার আগে হয়নি।
- সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য?
সুনন্দের প্রশ্নটা শুনে উদয়শঙ্কর কিছুক্ষণ মনে মনে রইল।
– দুর্ভাগ্য।
উদয় শঙ্কর বলল।
– দূর্ভাগ্য।
কেননা এই এমবুস্টার পরে এই বৃহত্তর অঞ্চলে সেনাবাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছিল সকলেই বলছিল– আধুনিক মানের আক্রমণ। কয়েক মাসের জন্য আমরা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকের মতো হয়ে পড়েছিলাম। সেই রাতগুলির কথা এখন এই অঞ্চলের কেউ মনে করতে চায় না। চায়না।
ছিন্ন অংশটুকু থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে ওরা একটি শিবিরের থান পেল। ঘরটা ছোটো অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। শিব মন্দিরটা থেকে রাস্তা সোজাসুজি এগিয়েছে এবং প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে বাক নিয়ে অন্য একটি রাস্তা এগিয়ে চলেছে। এই জায়গাটাও জনপ্রাণীহীন।
বিছানায় শীতের আমেজ উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসা ২-৪ জন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে ওদের দেখা হয়। তারা গাই বাছুরকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিতে এনেছে। উদয়শঙ্কর দুজন মহিলাকে বাইরের উঠোন ঝাড়ু দিতে দেখতে পেয়েছে। শীতের দিনেও গ্রামের মানুষরা বেশ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে। সে মনে মনে ভাবল।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বাঁধের সোজাসুজি গেলে আমরা কী পাব?
সুনন্দ যেন প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল, সে চট করে উত্তর দিল– ভূটান।
না জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন একটা জিজ্ঞেস করার মতো উদয়শঙ্করের মনে হল। কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য সে এবার সুনন্দকে বলল– আমরা বাঁধের ওপরে ওপরে যাব নাকি!
– যাওয়া যেতে পারে। এভাবে যেতে থাকলে মাঝেমধ্যে আমরা নদীর একেবারে কাছে পাব। অর্থাৎ বাঁধটা নদীর প্রায় পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে। তবে আজ আপনি আমি দেখতে পাওয়া পাখিগুলির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেননি। দু'চারটে নতুন নতুন পাখি আমরা দেখতে পাইনি কি?
– পেয়েছি। তুমি তো জিজ্ঞেস করনি। অন্যদিকে আমরাও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছি যে। দাঁড়াও সুনন্দ। ওই যে পাখিটা দেখছ সেই পাখিটা তুমি চিনতে পারছ কি?
সুনন্দ মনে করিয়ে দিলে যখন উদয়শঙ্কর তাৎক্ষণিকভাবে সুনন্দকে পাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এগিয়ে এল।
– হ্যাঁ পারছি তো।ওটা
– ঠিক বলেছ। ওটা রবিন পাখি। ইংরেজিতে ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই রবীন বলে। বৈজ্ঞানিক নাম কপসিসাস সলেরিস।
সুনন্দ জিজ্ঞেস করল – আপনি সমস্ত পাখির বৈজ্ঞানিক নাম কীভাবে মুখস্ত করেন?
- সব পাখির বৈজ্ঞানিক নাম আমার মনে নেই। দু'চারটার নাম মনে আছে। তোমাকে দেওয়া বইটিতে পাখি গুলির ইংরেজি নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম গুলি লেখা আছে। বিছানায় শুয়ে থাকলেও আমি সেগুলি দেখতে থাকি আর মুখস্ত করি। তুমিও সেরকম করতে পার। পাখি একটা দেখলেই সেটাকে বইতে থাকা আলোক ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে এবং দুটো নাম মুখস্ত করে রাখবে।মনে রাখা কঠিন হলেও দুদিন পরে সহজ হয়ে পড়বে। পাখিগুলি পুরুষ মহিলা চিনতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ কথা।
– পাখিদের মধ্যে পুরুষ মহিলা আলাদা নাকি!
সুনন্দ ভাববোধক দৃষ্টিভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ, পাখিদের মধ্যে লিঙ্গ ভেদ স্পষ্ট। রবিন পাখিটাই দেখ। তার মাথা এবং পুচ্ছাংশ কালো। বুক, পেট, ডানা এবং লেজের নিচের অংশ সাদা । ডানায় কালোর ওপরে সাদা সাদা আঁচ আছে। এটা পুরুষ রবিন পাখি।মহিলা রবিন সাদা-কালোর পরিবর্তে ছাইরঙের মতো কালো।
উদয়শঙ্করের কথা একান্ত মনে শুনে সুনন্দ এগিয়ে যাচ্ছে।
– আর ও একটি সুন্দর পাখি দেখছি দাঁড়াও – উদয় শঙ্কর সুনন্দকে পাখিটার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল – ওই পাখিটা দেখছ?
সুনন্দ পাখিটা দেখেনি। সুনন্দকে পাখিটা দেখানোর জন্য উদয়শঙ্করকে কিছুটা কষ্ট করতে হল। পাখিটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর পরেও সুনন্দ দেখছেনা।
– এখন দেখেছ পাখিটা?
– দেখেছি। দেখেছি।
সুনন্দ সম্মতি জানিয়ে বলল।
– প্রথমে তোমার দেখতে অসুবিধা হয়েছিল কেন বলতো?
– গাছের পাতার সঙ্গে একেবারে মিলে আছে যে। বোঝাই যায় না।
– প্রকৃতি তার সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করে রেখেছে বুঝেছ। যেভাবে মানুষের মগজ, হৃদপিণ্ডকে যথেষ্ট সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয়েছে। এখন বলতো পাখিটার নাম কি? পাখিটা পুরুষ না মহিলা?
- এই সুন্দর পাখিটা আমি প্রায়ই দেখি কিন্তু নামটাই জানিনা। সুনন্দ বলল।
– সুন্দর পাখিটার নামটাও সুন্দর– রূপসী পাখি, স্কারলেট মিনি ভেট। এটি মহিলা পাখি। এর ঠোঁটের নিচ থেকে পুচ্ছাংশ দেখেছ কি কেমন হলদে। ডানাও হলদে। শরীরটা ছাই রঙের। পাখিটার হলদে রঙের জায়গায় লাল রং মানে পাকা আমের শাঁসের মতো হলে ভাববে সেটা পুরুষ পাখি। বাকি মাথা, গলা, পিঠ, ডানা এবং পুচ্ছাংশ কালো। এখন বুঝতে পেরেছ কি পাখির পুরুষ মহিলা আমরা কীভাবে সনাক্ত করতে পারি।
- তবে এবার বৈজ্ঞানিক নামটা বললে না যে–
– মনে থাকলে বলবে। ভুলে গেছি মনে নেই। তুমি মনে রাখতে চাও যদি আমি তোমাকে বই দেখে বলতে হবে।
উদয়শংকর হে হে করে হেসে ফেলল। সেভাবেইনি তার হাসি শুনে যে পাখিটা উড়ে যেতে পারে। আর সেটাই হল। ওদের বিপরীত দিকে পাখিটা উড়ে চলে গেল।
উদয়শঙ্কর এবং সুনন্দ এসে এবার একটি ব্রয়লার পামের সামনে উপস্থিত হল।
উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল– এখানে ব্রয়লার ফার্ম আছে!
– দুটো আছে। কয়েকটি ছেলে ফার্ম আরম্ভ করেছিল, লাভ হয় না বলে এখন ছেড়ে দিয়েছে।
–আমাদের ছেলেদের সেটাই সমস্যা। ধৈর্য ধরতে পারে না। উপার্জনের দুুপয়সা হাতে এলেই একই দিনে দামি বাইক এবং মোবাইল নিতে শুরু করে।
উদয়শঙ্কর পামটার সামনে দাঁড়িয়ে পামটা লক্ষ্য করল। চারশো-পাচশো মুরগি রাখার মতো পামটিতে সুবিধা রয়েছে।ব্রয়লার ফার্ম থেকে নির্গত এক বিশেষ ধরনের গন্ধ জায়গাটাতে ছড়িয়ে পড়েছে।
–পামটা বেশ বড়ো।
উদয়শঙ্কর সুনন্দের সামনে মন্তব্য করল। দুজনকে পামের সামনে দেখে ভেতর থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে এল।
– সুনন্দ দা। অসময়ে এদিকে যে। আপনাকে বহুদিন ধরে দেখছি না।
–ওঁর সঙ্গে এদিকেই এক পাক ঘুরতে এসেছিলাম। ভালো আছ? ফার্ম কেমন চলছে?
– আছি মোটামুটি। চালাচ্ছে, চলছে, চলছি।
ব্রয়লার ফার্মের মালিক ছেলেটি বলল।
– ইনি উদয়দা। আমাদের এখানে পাখি পর্যবেক্ষণ করে বেড়াচ্ছে। আজ ওকে অল্প সঙ্গ দিচ্ছি।
-আপনাকে আমি দেখেছি। গতবছরেও এসেছিলেন নয় কি?
- হ্যাঁ গতবারও এসেছিলাম। জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। সেজন্য এবারও আবার এলাম। তোমার নামটা জানতে পারি কি?
উদয়শঙ্কর ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিল– সৌরভজ্যোতি কলিতা।
– তোমার ফার্মটার কত বছর হয়েছে?
– দাদা,দশ বছরের মতো হয়েছে।
– তাহলে তোমার ফার্ম করার বেশ কয়েক বছর হয়েছে। ভালোই, লেগে থাকলে মেগে খায় না।
উদয়শঙ্কর আর সুনন্দ কিছুক্ষণ সৌরভের সঙ্গে এটা ওটা কথা বলে ফার্মের সামনে থেকে ফিরে এল।
– যে পথে এসেছিলাম সে দিকে যাব না এই পথে গিয়ে পুনরায় পাকা রাস্তায় উঠব।
শিবমন্দিরের সামনে উপস্থিত হওয়ায় সুনন্দ উদয়শঙ্করকে সামনের পথটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল।
– আমরা পাকা রাস্তায় উঠব আর রাস্তাটা পার হয়ে নদীর তীর ধরে গিয়ে জলাশয়টা পাব।হবে? তোমার ক্লান্ত বা ক্ষুধা লাগছে নাকি। নাকি দুটিই লেগেছে।
– না না। ক্লান্তিও লাগেনি ক্ষুধা ও লাগেনি। আপনার যদি ক্লান্ত লেগে থাকে পিঠের ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন।
ঠোঁট দুটি বাঁকা করে দেখিয়ে ঈষৎ হেসে উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলে উঠল– ভালো বলেছ। যতটা সম্ভব বহন করে নিয়ে যাই।
শিব মন্দিরের সামনে থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের মতো দূরত্ব হবে। রাস্তাটার দু'পাশে সবুজ মনোরম বসতি। নির্দিষ্ট সময়ে ফোঁটার জন্য অপেক্ষা করে থাকা তিনটি এজার গাছের একটি সারি। আর দুটো শিমূল গাছ। দেখেই বোঝা যায় গাছ দুটির বয়স হয়েছে। রাস্তাটার নিচে মাটির মালিক লাগানো সেগুন এবং তিতা চপার গাছগুলি বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠেছে। সারি সারি করে লাগানো সোজা গাজ গুলির মধ্য দিয়ে তাকালে অনেক দূর পর্যন্ত সুন্দরভাবে দেখা যায়।
– এই গাছ গুলির মধ্য দিয়ে সোজাসুজি নদী পর্যন্ত এক ফার্লঙের মতো দূরত্ব হবে। তখন আমরা সোণ কুরিহার সেতুর নিচ দিয়ে পার হলেই জলাশয়টা পেয়ে যাব।
– আজ এভাবে যাবনা নাকি সুনন্দ। অন্য একদিন যাব। আজ পাকা রাস্তাটার দিকে যাবার এই পথটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিই।
দুজনই পাকা রাস্তায় উঠল। এই জায়গাটা থেকে কিছুটা ভাটিতে গেলেই থানে প্রবেশ করার রাস্তাটা পাওয়া যায়। থান হয়ে জলাশয়ে না গিয়ে দুজনেই নদীর তীর ধরে জলাশয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে সুনন্দের পছন্দ হল না। পাকা রাস্তাটা থেকে নদীর তীর ধরে যাবার জন্য খারাই অতিক্রম করতে হবে। উদয় শঙ্কর একবার মাত্র এই খারাইটা দিয়ে নেমে গিয়ে নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছিল।
–গতবছর আসার সময় আমি এদিকেই নেমে গিয়েছিলাম।
উদয়শঙ্কর সুনন্দকে আশ্বাস দেবার জন্য বলল। কিন্তু সুনন্দের মনে সন্দেহ। ভয় ভীতভাবে সে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাচ্ছে।
– উদয়দা আমি নেমে যেতে পারব কি?
– ইচ্ছা করলে পারবে। একটু সাবধানে নামতে হবে। শিশির পড়ে একদম পিছল হয়ে আছে। প্রথমে আমি নেমে যাই এবং পা রাখার মতো তোমার সুবিধা করে দিই। হবে তো!
সেভাবে উদয়শঙ্কর প্রথমে নেমে গেল এবং নেমে যাবার সময় জুতো দিয়ে খাজ কাটার মতো সাঁচ বসিয়ে দিয়ে গেল। তথাপি সুনন্দ ভয় পেয়ে ইতস্তত করতে লাগল। উদয়শঙ্কর ভাবল এভাবে নামতে হলে সুনন্দ পা পিছলে পড়াটা নিশ্চিত। সুনন্দকে অপেক্ষা করতে বলে সে একটা শক্ত লতার খোঁজে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। একটু খোঁজখবর করে সে একটা শক্ত লতা ছিঁড়ে টেনে আনল। সুনন্দ ভয় না করলে এটা দিয়ে সুন্দর করে নেমে আসতে পারবে। উদয় শঙ্কর লতাটা সুনন্দের দিকে ছুড়ে দিল এবং উদয় শঙ্কর বলা অনুসারে সুনন্দ খাড়াইয়ের কাছের একটা গাছের ডালে লতাটা বেঁধে তার অন্য প্রান্তটা নিচের দিকে নামিয়ে দিল । এখন নিচের দিকে ঝুলে থাকা লতাটা খামচে ধরে উদয়শঙ্কর পা দিয়ে তৈরি করা খাজে খাজে পা রেখে সুনন্দ নেমে এল। মাটির কাছাকাছি পৌঁছে হুড়মুড় করে নেমে পড়ায় শেষ মুহূর্তে সে পিছলে পড়ে গেল যদিও খুব বেশি ব্যথা পেল না।
– ব্যথা পেয়েছ নাকি?
কাপড়ে লেগে থাকা বালি ঝাড়তে ঝাড়তে সুনন্দ বলল– পাইনি উদয়দা। হাতটাতে শুধু –
খসখসে লতাটা সজোরে খামচে ধরে পিছলে পড়ায় বা হাতটা একটু ঘষটে গেছে।
– তোমার প্রশিক্ষণের আজ প্রথম দিন। প্রথম দিনে দুই একটি ছোটোখাটো ঘটনা ঘটলে কোনো ব্যাপার না। তার মধ্যে তোমার হয়তো ক্ষুধা পেয়েছে।
– তাই নাকি? কথাগুলি তাহলে এরকম?
উপহাসের সুরে সুনন্দ উদয়শঙ্করকে প্রতি আক্রমণ করল।
উদয়শংকর প্রথমবার খাড়াই বেয়ে নেমে নদীর তীর ধরে যে পথে গিয়েছিল আজ সেভাবে না গিয়ে সোজাসুজি জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেল। ঢেকিয়া এবং বনে লেগে থাকা শিশির দুজনেরই হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলল।
সুনন্দ আক্ষেপ করে বলল– একেবারে ভিজে গেলাম উদয়দা।
– অরণ্যের ভেতরে এইসব আক্ষেপ আবদারের কোনো কদর নেই। শীতে শিশিরে ভেজা, গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে ভেজা, জোঁক, মশা, ডাসা,জংলি পাতা– সবকিছুকে নিয়ে মানিয়ে চলা শিখতে হবে। শিখতে জানতে হবে।
সুনন্দ মনে মনে উদয়শঙ্করের পেছন পেছন যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করল। না হলে কথায় কথা বাড়ে। দুজনেই যেতে যেতে জলাশয়ের পাড়ের নির্দিষ্ট জায়গাটায় পৌঁছাল।
হেলানো গাছটা দেখে সুনন্দ খুশি হল এবং ছোটৌ একটি ছেলের মতৌ সে দু পা ঝুলিয়ে গাছটায় আয়েশ করে বসে পড়ল।
– উঠ উঠ। বসলে হবে না। ক্লান্ত লাগছে নাকি?
– এভাবে হাঁটার অভ্যাস নাই যে।
– তাহলে বসো বসো। একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও।
উদয়শঙ্কর সাধারণভাবে রান্নাবান্না করার জন্য একটা তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য উনুন তৈরি করে নিয়েছিল। সে সেই উনুনের ওপরে আশেপাশে থাকা শুকনো কিছু ডাল- পাতা চাপিয়ে দিল। তারপর বেগ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ এবং দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরানোর চেষ্টা করল। শিশিি পড়ে ডাল গুলি ডিজে থাকার জন্য আগুন জ্বালাতে তার একটু কষ্ট হল যদিও আগুন জ্বালাতে সমর্থ হল। এবার বেগ থেকে স্টিলের একটা পাত্র বের করে তার মধ্যে বোতল থেকেই জল ঢেলে পাত্রটা তাৎক্ষণিক উনুনের ওপর বসিয়ে দিয়ে জলটা গরম হতে দিল।
সুনন্দ উদরশঙ্করের কারুকার্য গুলি নিবিষ্ট মনে দেখতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল উদয়দা গরম জল দিয়ে কী করবে!
জলটা একটু গরম হতেই উদয়শঙ্কর ব্যাগ থেকে দুটো মেগীর 'কাপ নুডুলস' বের করল। কাপ দুটির ঢাকনি দুটি খুলে সে তার পাতলা ফয়েলের সুরক্ষা কবচ ছাড়িয়ে হাতের তালুতে মুঠি মেরে গোল করে ব্যাগে ভরিয়ে নিল।
– অরণ্যের মধ্যে তুমি ব্যবহার করা কোনো জিনিস ফেলতে পার না। এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কথা। সব সময় মনে রাখবে।
উদয়শঙ্কর কী করছে বলে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা সুনন্দকে উদ্দেশ্য করে বলল।
সুনন্দ সম্মতি সূচকভাবে বলল -হ্যাঁ উদয় দা।
তারপর সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল উদয়শঙ্করের দিকে। উদয়শঙ্কর উনুন থেকে নামানো পাত্রটার জল কাপ নুডলস দুটিতে একটু একটু করে ঢেলে দিল। মেগীর উপরে গরম জল পড়ে মেগীটায় বুদবুদ কাটতে লাগল।
–হো লোয়া।
– এটা কী?
– সুনন্দ কিছুই বুঝতে পারছে না।
– সকালের আহার। মেগী দিয়ে,খাও।ও কীভাবে খাবে চামচ দিইনি।
উদয়শঙ্কর নিজেকে নিজে বলার মতো করে ব্যাগ থেকে দুটি ডিসপোজেবল স্পুন বের করে একটা সে নিল অন্যটি সুনন্দকে দিল। সুনন্দ তখন অবাক হল যে উদয়শঙ্কর এত কম সময়ের মধ্যে তার জন্য খাবার জিনিস তৈরি করে ফেলল। মেগী এরকম প্যাকেটে পাওয়া যায় বলে সে আগে জানত না। সুনন্দ চামচটা মেগীর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা মেগীর মশলা মিশ্রিত গরম ধোঁয়ার ঘ্রাণ লেগে তার পেটের ভেতরে ক্ষুধাটা জেগে উঠল। গন্ধটা সুনন্দের মুখের সন্তুষ্টির ভাব পরিস্ফুট করে তুলল।
উদয়শঙ্করের দিকে না তাকিয়ে সে মেগীর স্বাদ নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
– উদয়দা, জল এনেছ নাকি?
উদয় শঙ্কর বেগ থেকে জলের বোতলটা বের করে সুনন্দের হাতে তুলে দিয়ে বলল– আমাকে তোমার বউ পেয়েছ নাকি?
এক ঢোক ঠান্ডা জল গলায় ঢেলে দিয়ে সুনন্দ বলল– উদয়দা স-রি,স-রি।মেগী গলায় আটকে যাওয়ার জন্যই জল–
– আমি কি সিরিয়াসলি বলেছি নাকি। তুমি যে সরি বললে। তবে আমাদের ইংরেজির ব্যবহার একটু বেশি হয়েছে।
– প্রত্যেকেই এরকম বলে দেখছি।
উদয়শঙ্কর ঝোলা থেকে একটা পেপার ব্যাগ বের করে খালি কাপ নুডুলসের পাত্র দুটো এবং ডিসপোজেবল স্পুন আদি নোংরাগুলি পেপার বেগে ভরিয়ে পুনরায় ঝোলাতে ভরিয়ে রাখল। থানের বাকি নোংরাগুলি সে পরে পুড়িয়ে ফেলবে।
– সুনন্দ ক্ষুধা পালিয়েছে তো?
পেটে একটা হাত রেখে ক্ষুধা পালিয়েছে কিনা পরখ করে দেখার ভাবে সুনন্দ বলল– পালিয়েছে।
– অরণ্যের মধ্যে কোথায় ভূরি ভোজন করার সুবিধা পাবে। আমি সঙ্গে মেগীর প্যাকেট এবং বিভিন্ন শুকনো ফল নিয়ে ঘুরে বেড়াই । ক্ষুধা পেলে তা দিয়েই কাজ সেরে নিই।
– একটা নতুন কথা শিখলাম। তিন বেলা মাটিতে পিঁড়ি পেতে ভাত খাওয়া আমাদের কাছে এই ধরনের কিছু 'ফোল্ডিং' খাদ্য স্বপ্নের ও অগোচর। – ফোল্ডিং নয় 'ফাস্টফুড'।
ফাস্টফুড গুলি ফোল্ডিংই ধরে নিন।
দুজনের কথাবার্তায় একটা কাঠঠোকরা পাখি ঠোঁট দিয়ে কাঠের মধ্যে ঠক ঠক করা শব্দ যতি ফেলল। নির্জন অরণ্যের নির্জনতা ভেঙ্গে শব্দটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
– এটা কি পাখি?
উদয়শঙ্কর পাখি দেখলেই সুনন্দকে একই প্রশ্ন করে।
– কাঠঠোকরা।
– কাঠঠোকরার কয়েকটি প্রজাতি আছে। এই প্রজাতিকে ছোটো সোনা কাঠঠোকরা বলা হয়। ইংরেজিতে বলে ব্লেক- রাম্পড- ফ্লেইমবেক। তুমি জিজ্ঞেস করার আগেই বলে রাখলাম– বৈজ্ঞানিক নামটা কিন্তু আমার মনে নেই। দেখছেন কি পাখিটার মাথার উপরিভাগে কীরকম উজ্জ্বল রং। ঘাড় কালো। ডানা খয়েরি রঙের। কাঠঠোকরা ও তার শক্তিশালী ঠোঁট গাছের পচা অংশে ঠুকরে তাতে পোকামাকড় ভক্ষণ করে ।
সুনন্দ আর উদয়শংকর পাখিটা বিশেষ ভঙ্গিমায় নেচে নেচে পোকামাকড় খেতে থাকা দৃশ্যটা কিছুক্ষণ ধরে দেখতে থাকল।
উদয়শঙ্কররা পাখিদের পাড়াপড়োশিতে উপস্থিত হওয়ার সময় কাঠঠোকরা গুলি খাদ্যের সন্ধানে ওদের বিচরণ স্থলে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছিল।
আটপৌরে ৩৭৮|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 378, by Sudip Biswas
৩৭৮.
ধনলক্ষ্মী
চতুর্দশী।শ্যামতন্বী। আলোকবর্তিকা।
জবাকুসুমসঙ্কাশ
এসো লক্ষ্মী এসো শ্যামলিকা।
শব্দব্রাউজ ৬৩৩।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-633, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩৩ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২২। ১০। ২২। সকাল সাতটা পাঁচ মিনিট ।
শব্দসূত্র: নতুন প্রাণ দাও
নাও নিয়ে নতুন
উদ্ভাস ।
ছুঁয়ে থাকো নিখুঁত প্রত্যয়ে ।
প্রাণ ছুঁয়ে থাক প্রাণে ।
দাও আমায় বেহিসেবি তৃষ্ণা
এক সাগর মনন
জিজ্ঞাসা তাড়িয়ে মারুক
শব্দব্রাউজ ৬৩২।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-632, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩২ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ২১। ১০। ২২। সকাল সাতটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ।
শব্দসূত্র: ছড়িয়ে যাচ্ছি খুশিতে
ছড়িয়ে যাওয়ার আনন্দ কোথা থেকে যেন আমায় খুঁজে পায় । আমি তাই ছড়াই রাস্তায়, মেঘের গোলাপি বাড়িতে , স্বপ্নে আর ভ্রমে । ছড়াতে ছড়াতে মহাসাগর পেরিয়ে বদ্বীপ ছুঁতে চাই ।
যাচ্ছি পৃথিবীর গাড়িতে । উদ্ধার হওয়ার জন্যে ।
খুশিতে নিত্যি প্রহসনের আনন্দ । তাই নিয়ে ভাসছি হাসছি । মনেতে বাস্তব উধাও, এটাই তো জীবন কাকা ...
আটপৌরে ৩৭৭|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 377, by Sudip Biswas
৩৭৭.
❀ নির্যাস
গেরস্তের। একরোখা। সীমানায়।
শেফালীগাছ
অভিমান ঝরে ঝরে যায়।
আটপৌরে ৩৭৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 376, by Sudip Biswas
৩৭৬
ধর্ম
দুই। মুঠো। ভাত।
মানুষের
ভরাপেট চাই আকাশ ইনসাফ।
শব্দব্রাউজ ৬৩১।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-631, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩১ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা ।২০। ১০। ২০২২। সময় সকাল সাতটা কুড়ি মিনিট ।
শব্দসূত্র: অচেনা খেলা খেলি
অচেনা চেনা হলে
তাকে জুড়ে থাকে
অবাক মন।
আমার সঙ্গে খেলে সে ।
আমিও খেলি তার সঙ্গে ।
শব্দব্রাউজ ৬৩০।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-630, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬৩০ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৯। ১০। ২০২২। সময় সকাল সাতটা পনেরো মিনিট ।
শব্দসূত্র: ঘরে ঘরে সুখ
ঘরে ঘরে হাজার সুখ
উঠে আসে
উজ্জ্বল রোদের সঙ্গে ।
ঘরে ঘরে হাজার উচ্ছ্বাস
উঠে আসে
একে অপরে মাখামাখি হলে ।
ঘরে ঘরে সুখ আমাকে
উজ্জীবিত করে,
ভরে উঠি । জ্বলে উঠি ।
আটপৌরে ৩৭৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 375, by Sudip Biswas
৩৭৫.
অয়নান্ত
করিডোর। সাঁতার।মনোমুগ্ধকর।
সন্ততিহীন
চড়ুইদের আগমনে কিঞ্চিত মেঘমল্লার।
আটপৌরে ৩৭৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 374, by Sudip Biswas
৩৭৪.
নির্ভর
আতর্কিত। আতরদান। আদনান।
ফিস্-জল
রবীন্দ্রনাথ বসন্তের গান সজল।
শব্দব্রাউজ ৬২৯।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-629, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬২৯ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৮। ১০। ২০২২। সকাল সাতটা দশ মিনিট ।
শব্দসূত্র: হয়তো তোমার জন্য
হয়তো প্রেম
তোমায় দেখে
বলছে হেঁকে
আমিই আছি
আমিই আছি
আর কাকে চাই ।
তোমার মধ্যে
প্রেমের জ্বালা
আমার চোখে
যাচ্ছে এঁকে ।
শুধু তোমার জন্য
আমি এখন বন্য ।
আটপৌরে ৩৭৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 373, by Sudip Biswas
৩৭৩.
একা
মধ্যবর্তী। হন্যমান। অর্যমা।
নুপুরের
পেপারে মোড়ানো চারপাশ মুখরিত।
শব্দব্রাউজ ৬২৮।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-628, Nilanjan Kumar
শব্দব্রাউজ- ৬২৮ ।। নীলাঞ্জন কুমার
বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৭। ১০। ২২। সময় সকাল সাতটা ত্রিশ মিনিট ।
শব্দসূত্র- যাবতীয় হুল্লোড় গুলি
কি করে আসে
যাবতীয় আনন্দ!
কে দেয়?
হুল্লোড় এলে হতাশা
উধাও ।
জুড়ে থাকে বেহিসেবি
দিকদিশা ।
বাঁচার তাগিদ তখন
হাজার বছর ।
হে আমার স্বদেশ- ২৩
সন্তোষ কুমার কর্মকার
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস
লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।
আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
(২৩)
একত্রিশ জন ভক্তের উপস্থিতিতে নাম-প্রসঙ্গ সমাপ্ত হওয়ার পরে অদ্ভুত এক প্রসন্নতায় লক্ষ্মীনাথের মনটা ভরে উঠল।ভক্তদের চারজনের বাইরে প্রত্যেকেই অসম থেকে কলকাতায় পড়তে আসা ছাত্র। ছাত্ররাই উৎসাহ এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আগের দিন ভিজিয়ে রাখা বুট-মুগ ধুয়ে, নারকেল-কলা কেটে, আঁখের খোসা ছাড়িয়ে আপেল-শসা কেটে, আদা-নুন মেখে প্রসাদ তৈরি করল। সুন্দর গামছা দিয়ে ঢাকা ভাগবতটা রাখা আসনের সামনে প্রসাদের থালা নিবেদন করল। নাম-প্রসঙ্গের পরে সুরভিকে কোলে নিয়ে বসা প্রজ্ঞা এবং লক্ষ্মীনাথ নাম গান করা ভক্তদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিল। তারপরে ছাত্র ভক্তরা কলাপাতায় ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করল। কিছুক্ষণ পরে চিড়া দই এবং মিষ্টি সহযোগে জলখাবার খেয়ে সন্তোষিত মনে প্রত্যেকেই বিদায় নিল।
সবাইকে বিদায় দিয়ে লক্ষ্মীনাথ বিছানায় এল। আর বিছানায় পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল।তাঁর মুখে ফুটে উঠা ক্লান্তি লক্ষ্য করে প্রজ্ঞা ডাকল না। একনাগরে পাঁচ ঘন্টা ঘুমোনোর পরে লক্ষ্মীনাথের ঘুম হালকা হয়ে এল এবং সে স্বপ্ন দেখতে লাগল।
স্বপ্নের মধ্যে লক্ষ্মীনাথ লক্ষ্মীমপুরে অতিবাহিত করা শৈশবের দিনগুলিতে ফিরে গেল ।
দীননাথ বেজবরুয়া তখন ইংরেজ সরকারের মুন্সেফ।তাঁর আহ্বানে কমলাবারী সত্রের ভক্তরা বাড়িতে এসে জরাসন্ধ বধ অভিনয় করল। সেই অভিনয় দেখে আট বছরের লক্ষ্মীনাথের কী যে আনন্দ হয়েছিল। অভিনয়ের পরের দিন থেকে অভিনেতার সংলাপ গুলি সময়ে অসময়ে নানা স্থানে আউরে বেড়াত। লক্ষীনাথ এবং তাঁর দাদা শ্রীনাথ কলা পাতার মধ্যসিরা দিয়ে তৈরি গদা দিয়ে বাড়ির উঠোনে বীরত্বব্যঞ্জক সংলাপ উচ্চারণ করে পরম বিক্রমের যুদ্ধ করত। এই গদা দিয়ে ধুপ ধুপ করে পিটিয়ে গদা দুটি জরাজীর্ণ করে ফেলত। এখন লক্ষ্মীনাথ স্বপ্নে সেই দৃশ্যই দেখছে। স্বপ্নে শ্রীনাথ জরাসন্ধ, লক্ষ্মীনাথ ভীম।যুদ্ধে ভীমের আঘাতে জরাসন্ধের মৃত্যু হওয়ার কথা, অথচ অনেকক্ষণ যুদ্ধ করার পরেও শ্রীনাথ মৃত্যুবরণ করার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। কারণ, মৃত্যুবরণ করা মানেই গদাযুদ্ধের সমাপ্তি। শ্রীনাথের আরও কিছুক্ষণ এভাবে খেলার ইচ্ছা। গদা যুদ্ধ করে করে বালক লক্ষ্মীনাথ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। শেষে উপায় না পেয়ে হাতের গদাটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লক্ষ্মীনাথ চিৎকার করে উঠল, 'দাদা তুমি এখন মরার কথা। তুমি মরছ না কেন?'
তখনই লক্ষ্মীনাথ জেগে উঠল। চোখ মেলে হাসতে লাগল। এদিকে সুরভি জেগে যাবার ফলে তার কাছে গিয়ে প্রজ্ঞা তাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে।
'কী হল?' কপাল কুঁচকে প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, ঘুম থেকে উঠে এভাবে হাসছ! স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?'
' হ্যাঁ, পরি। বড়ো মজার স্বপ্ন।'
'কী স্বপ্ন, শুনি?'
' বেঙ্গলে যেমন যাত্রাপালা হয়, আমাদের অসমে তেমনই ভাওনা হয়। ভাওনা দেখার পরদিন থেকে প্রায় এক-দেড় মাস শ্রীনাথ দাদার সঙ্গে আমি সেই যাত্রার পাত্রদের সংলাপ আউরে দুই ভাই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম । সেটাই আজ স্বপ্ন দেখলাম। শৈশবের ওইসব ঘটনা সত্যিই বড় মজার, বুঝেছ।'
' যাই বল বাপু, কাল নামকীর্তনের সময় তোমাকে কিন্তু আমি অন্যরকম দেখলাম।'
' অন্যরকম দেখলে! কী অন্যরকম দেখলে?'
'ঐ যে নাম- কীর্তন চলছিল, হঠাৎ রোগা চেহারার ছাত্রটির কাছ থেকে খোলটি নিয়ে তুমি নিজেই জোরে জোরে বাজাতে শুরু করলে। তার সঙ্গে সবাইকে ছাপিয়ে উদাত্ত সুরে পদ গাইতে শুরু করলে, তখন তোমার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক আবেগ, কেমন একটা দীপ্তি দেখতে পেলাম। তখনই তোমাকে অন্যরকম লাগল, কেমন যেন অচেনা হয়ে গেলে।'
লক্ষ্মীনাথ স্থির ভাবে পত্নীর উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরে বিছানা থেকে নেমে চিন্তিত ভাবে এগিয়ে এল। প্রজ্ঞার গায়ে গা লাগিয়ে বসে বলল,' দেখ পরি, আমাদের নাম-কীর্তনের পদগুলি বৈষ্ণব রসে শ্রীকৃষ্ণের লীলা কথার বর্ণনা। খুব সম্ভব সেই ভাবের রসটাই আমাকে তখন কিছুটা আবিষ্ট করে ফেলেছিল। তাই বলে আমি অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলাম, এটা ঠিক নয়।তারপর তুমি বললে, আমি অচেনা হয়ে গেলাম, তোমার চোখে আমি অচেনা! না না– প্লিজ অমন করে বলবে না, ডার্লিং। তুমি যে আমার মনে, আমার প্রাণে, আমার সত্তায়।'
কাঠ জোগানের ঠিকাদারী কাজটা এরকম যে এক জায়গায় থেকে করা যায় না। কোন রাজ্যের কোন অঞ্চলে কী কী কাঠের জঙ্গল আছে, তার যেমন খবর রাখতে হয়, সেভাবে কখন কোন কোম্পানি অথবা রেল বিভাগ কোন জায়গায় নতুন করে রেললাইন পাতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রেললাইন কর্মের সঙ্গে রেলের কোন কোন অফিসার অথবা ইঞ্জিনিয়ার জড়িত হয়ে রয়েছে– সেই সমস্ত খবর নিতে হয়। খবর নিয়ে তৎকালে সেই কোম্পানির কর্মকর্তা অথবা বিভাগীয় ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলতে হয় এবং কী ধরনের উপঢৌকন দিয়ে তাদের বশ করতে হয়, তারও পরিকল্পনা করতে হয়।
অবশ্য বি ব্রাদার্স কোম্পানির জন্য সুখের কথা এটাই যে অভিজ্ঞ ভোলানাথ সেই সব তৎপরতার সঙ্গে সম্পাদন করে। তার জন্য খবর পাওয়া মাত্র তিনি আসানসোল, সমস্তিপুর, সম্বলপুর, বিলাসপুর, চক্রধরপুর, গাংপুর, নাগপুর, ঝাড়চোগড়া ইত্যাদি জায়গায় যান। আলাদা আলাদা জায়গায় আলাদা পরিস্থিতিতে থাকা- খাওয়াটা প্রায়ই অসুবিধাজনক। তাছাড়া কী শীত কী গ্ৰীষ্মে গভীর রাতে রেল অথবা রোদ-বৃষ্টিতে বাসে ভ্রমণ করাটা কষ্টদায়ক। কিন্তু ভোলানাথের ক্লান্তি নেই। লক্ষ্যে স্থির থেকে সে উদ্দেশ্যে সফল হবেই। তার জন্যই ব্যবসায়িক কথায় লক্ষ্মীনাথের কোনো শিথিলতা বা ভুল করা দেখলে তিনি সতর্ক করে দেন।
কাঠের ব্যবসায় কলকাতায় ভোলানাথ অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট হবে বলে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে। তা বলে ব্যক্তি হিসেবে ভোলানাথ একেবারে নীরস-নিরীহ নয়। ব্যবসার জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে তিনি দেশ ভ্রমণের আনন্দ ও উপভোগ করেন।গত কয়েক মাস ব্যবসায়ের কাজে খুবই ব্যস্ত থাকলেন। তার মধ্যে ভেতরে ভেতরে কিছু পরিমাণে ক্লান্ত ভোলানাথ নিজেই লক্ষ্মীনাথকে দার্জিলিং ভ্রমণের কথা বলল। এমনিতেই মে মাসে কলকাতায় উৎকট গরম। গায়ে জ্বালাধরা এই গরমে কিছুদিন দার্জিলিঙে থাকতে পারলে সত্যিই ভালো লাগবে। তবে এখন ব্যবসার যে ধরনের বিস্তৃতি, যাব বললেই যাওয়া যায় না। পাওনাদারদের টাকা দেওয়া, সাব-কন্টাকটারদের কাজের ধরন বুঝিয়ে দেওয়ার সঙ্গে অগ্রিম ধন দেওয়া, সুরভি এবং প্রজ্ঞাকে জোড়াসাঁকোয় রেখে আসা ইত্যাদি করতে দুদিন পার হয়ে গেল। তারপরে দারোয়ান এবং চাকর-বাকরদের ওপরে বাড়ি দেখাশোনা করার দায়িত্ব সমঝে দিয়ে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ দার্জিলিঙের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল।
১৮৯৭ সনের মে মাসের ১৭ তারিখ। দার্জিলিঙে আসার সময় ব্রিটিশরা ভারতের শৈল শহর গড়ে তোলার কথাটা ভেবে লক্ষ্মীনাথ অবাক হয়ে গেল। শীত প্রধান ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের শাসনভার নিয়ে কেবল কলকাতা মাদ্রাজ মুম্বাই মহানগর গড়ে তোলেনি, দেশের কত কত প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদের ভান্ডার আছে সেই সব খুঁজে বের করেছে। এইসব আনা-নেওয়ার জন্য রেললাইন নির্মাণ করে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি করেছে। ভারতবাসীকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। শাসন কার্যের সঙ্গে এই দেশের স্বাস্থ্যকর এবং অপেক্ষাকৃত শীত প্রধান স্থান খুঁজে বের করে দার্জিলিং ,শিলং, শিমলার মতো শৈল শহর গড়ে তুলেছে। লক্ষ্মীনাথ এটাও ভাবল যে ব্রিটিশ শাসনভার না নিলে এই দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-দর্শনের দরজা উন্মোচিত হত না। দার্জিলিঙের মতো শৈল শহরও গড়ে উঠত না। কোনো কোনো অঞ্চলের বিকাশের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করার জন্য(অসমে একটি কলেজ স্থাপন করা নিয়ে এখনও টালবাহনা করছে।) ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তারও ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তবু সে মনে মনে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের পোশকতা করে। তার জন্যই লক্ষ্মীনাথ সাম্প্রতিককালে জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ শাসনকে 'বিদেশীর শাসন' এবং বঙ্গ- পঞ্জাব- মহারাষ্ট্র আদি রাজ্যে উগ্রপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করার জন্য চালানো কার্যকলাপ সমর্থন করে না।
বিশাল হিমালয়ের একটি অংশে গড়ে উঠা শৈলশহর দার্জিলিঙের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু… চারপাশে অপূর্ব শ্যামলিমা মাথার উপর দিয়ে বেশি বেড়ানো হালকা মেঘ, কিছুক্ষণ পরে পরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পাতলা হালকা এক ঝাঁক বৃষ্টির পরেই পুনরায় ঝলমলে রোদ… দর্জিলিং এসে লক্ষ্মীনাথের সত্যিই ভালো লাগল। পরে প্রজ্ঞার অনুপস্থিতিটা অনুভব করল। প্রিয়তমা প্রজ্ঞা সঙ্গে থাকলে বিশ্বপ্রকৃতির অনুপম এই দৃশ্য গুলি তার কাছে আরও বেশি উপভোগ্য হত।
ভোলানাথ বহু জায়গা ঘুরে বেড়ানো অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি লক্ষ্মীনাথকে দার্জিলিঙের বিখ্যাত লুই জুবিলী সেনেটারিয়ামে নিয়ে এল। দুপাশে অনুচ্চ সবুজ পাহাড়ের মধ্যে অভিজাত হোটেল।তাঁরা প্রতিদিন ছয়টাকা ভাড়ায় হোটেলের প্রথম শ্রেণির আবাসী হল। হোটেলের ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ভোলানাথ বেরিয়ে গেল। সামনের বেলকনি দিয়ে ঘুরে পুনরায় রুমে এসে বলল,'শোন বেজ, প্রফেসর বোস এসেছেন।'
' প্রফেসর বোস!'
'সায়েন্টিস্ট জগদীশচন্দ্র বোস। দুদিন আগে থেকেই তিনি এই হোটেলে আছেন।'
অবশ্য আগে থেকে বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের যোগাযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর বসু নিরহংকারী, সদালাপী এবং অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা হল চেতনা বোধের জগতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিক উন্মোচন । কথা বলতে শুরু করলে কীভাবে যে সময় পার হয়ে যায়, বলতেই পারিনা। এবারও তার সঙ্গে কথাবার্তা হবে বলে ভেবে লক্ষ্মীনাথের ভালো লাগল।
অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের যোগাযোগ হয়েছিল বিশেষ একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে।
১৮৯৪ সনে রায় বাহাদুর গুনাভিরাম বরুয়ার মৃত্যুর পরে শ্রীবরুয়ার বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে,তা নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। দ্বিতীয়া পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া কমলাভিরাম, করুণাভিরাম, স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরাম (কমলা-করুণা তখন প্রয়াত)।বিয়ে হয়েছিল যদিও স্বর্ণলতার স্বামী ডঃ নন্দকুমার রায়ের অকাল মৃত্যু হয়েছিল।তাই স্বর্ণলতা-জ্ঞানদাভিরামের কোনো অভিভাবক ছিল না। এদিকে গুনাভিরাম কোনো উইল করে যাননি। রায় বাহাদুরের বংশের একজন গণ্য-মান্য মানুষ ( রাধাকান্ত বরুয়া) আদালতে মামলা করে প্রমাণ করতে চেষ্টা করলেন যে প্রথমা পত্নীর মৃত্যুর পরে শ্রীবরুয়া বিধবা বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করাটা আইনসিদ্ধ নয় । কলকাতা হাইকোর্টের উকিল বাবু দুর্গামোহন দাস ছিলেন গুণাভিরামের পারিবারিক বন্ধু। বিপদের কথা শুনে তিনি এগিয়ে এলেন। দুর্গামোহন বাবু আশ্বাস দিয়ে বললেন যে তিনি স্বর্ণালতাদের এস্টেটের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করে দেবেন। তার জন্য দুজন সাক্ষীর আবশ্যক। তখন তিনি নিজে একজন সাক্ষী হয়েছিলেন এবং অন্য একজন সাক্ষী ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। দুর্গামোহন বাবু মৃত্যু পর্যন্ত গুনাভিরাম বরুয়ার বিষয় সম্পত্তি সুন্দরভাবে দেখাশুনা করলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে ইউরোপ থেকে রাধাকান্ত বরুয়া এসে পুনরায় গুনাভিরামের বিষয় সম্পত্তি হস্তগত করার চেষ্টা চালালেন। এদিকে জ্ঞানদাভিরাম তখন বিলেত গিয়েছিলেন এবং বিলেতে পড়াশোনার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু কেমব্রিজ অথবা অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য বন্দোবস্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কথায় সেটা কার্যত হয়ে ওঠেনি। তারপরে স্বদেশে ফিরে এসে স্বর্ণলতার কাছ থেকে লক্ষ্মীনাথের বিষয়ে শুনে জগদীশচন্দ্র তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন। তখনই জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের পরিচয় এবং আলোচনা। আলোচনার পরে জগদীশচন্দ্র স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরামের অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য লক্ষ্মীনাথকে অনুরোধ জানালেন।
তারপরেও জগদীশ চন্দ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। বয়সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে প্রায় সাত বছরের বড়ো জগদীশচন্দ্র কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে তাঁর মৌলিক গবেষণা পত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে।'দ্য ইলেকট্রিশিয়ান' পত্রিকায় তাঁর গবেষণা পত্র প্রকাশ পেয়েছে। গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্য লন্ডনের রয়েল সোসাইটি তাকে অর্থসাহায্য দিয়েছেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি (বিজ্ঞানাচার্য) উপাধিতে ভূষিত করেছেন । ১৮৯৬ সনে ভারত সরকারের অর্থ সাহায্যে ইউরোপের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিজ্ঞান বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্য তিনি সস্ত্রীক বিলেতে গিয়েছিলেন।
এত প্রতিভা, প্রতিভার গুনে এত খ্যাতি, দেশ-বিদেশের বিদ্বৎ মহলে তাঁর এত সম্মান ! কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমবয়সী এই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র কথাবার্তায় সাধারণ, তেমনই আন্তরিক।
লুই জুবিলী স্যানেটোরিয়াম হোটেলের সামনের বিশাল ব্যালকনিতে বসে অধ্যাপক বসু বিজ্ঞানের একটি পত্রিকা পড়ছেন। নিজের রুম থেকে লক্ষ্মীনাথ তার সামনে গিয়ে সবিনয়ে নমস্কার জানাল। পত্রিকা থেকে মাথা তুলে দেখে চিনতে পেরে অধ্যাপক বসু সহাস্যে বললেন,' হ্যালো মিস্টার বেজবরুয়া , হাউ লাকি আই এম দ্যাট আই মিট ইউ হেয়ার। হাউ ইউ ডু ?'
' ফাইন স্যার, আপনি?'
' এই চলছে আর কি।হিয়ার, এনি বিজনেস অর ট্যুর?'
' কলকাতার উৎকট গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কয়েকদিনের জন্য এই পাহাড়ে ছুটে এলাম।'
' হ্যাঁ, এই সময়ে কলকাতার অনেকেই এভাবে এই দার্জিলিঙে এসে থাকে। প্লিজ বী সিটেড।'
লক্ষ্মীনাথ জগদীশচন্দ্রের বাঁ পাশে একটা আরাম চেয়ারে বসল। সামনের দিকে কিছুটা মুক্ত জায়গা। তারপরেই পাহাড় । অনুচ্চ পাহাড়ের ওপাশে নীল আকাশ। সবুজ পাহাড়ের গায়ে ছোটো ছোটো কাঠের ঘর- দরজা। এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। ঘর- দুয়ার গাছ-পালার ওপরে সকালের সূর্যের কোমল কিরণ।
স্বাভাবিকভাবেই দুজনে স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরামের কথা বলতে শুরু করলেন। শোক-দুঃখ প্রকাশ করে জগদীশচন্দ্র বললেন যে বিধাতার কীরকম অভিশাপ যে একই পরিবারের প্রথমে স্বর্ণলতার স্বামী নন্দকুমার রায়, গুনাভিরামের পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া, গুণাভিরাম নিজে এবং শেষে কমলাভিরামকে অকালে এই সংসার ছেড়ে যেতে হল। অথচ এই পরিবারটি সব দিক দিয়ে পরিপূর্ণ এবং শিক্ষা দীক্ষায় কলকাতার অভিজাতদের অন্যতম হয়ে উঠেছিল। গুনাভিরাম অসমিয়া হয়েও তাঁর উদার মানবীয় চেতনায় কলকাতার অভিজাত বাঙালি সমাজে শ্রদ্ধা-সমীহের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।
লক্ষ্মীনাথ জানাল যে অসীম ধৈর্য এবং সহনশীলা হওয়ার জন্যই বৈধব্যের যন্ত্রণা নিয়েও স্বর্ণলতা এই চরম দুর্যোগের সময়ে সুস্থির থাকতে পেরেছে। স্বর্ণলতার পুনর্বিবাহের জন্য চেষ্টা চালানো হয়েছে । জগদীশচন্দ্র আশা ব্যক্ত করলেন যে বিধবা হলেও সুন্দরী, শিক্ষিতা, নারীর সমস্ত গুণে গুণবতী স্বর্ণলতার পুনর্বিবাহ হবে এবং মেধাবী জ্ঞানদাভিরামও সাফল্যের সঙ্গে ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিলাত থেকে ফিরে আসবে।
'মিস্টার বেজবরুয়া আপনি তো ঠাকুরবাড়ির স্নেহের জামাই।' মুচকি হেসে জগদীশচন্দ্র বললেন,' এদিকে শুনলাম আপনিও সাহিত্য চর্চা করেন। রবিবাবুর সঙ্গে আপনার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়?'
'হয়। তবে খুব কম।'
'ওঁর লেখা পদ্য পড়েন?'
' সম্পর্কে তিনি আমার কাকা শ্বশুর। না পড়ে কি উপায় আছে বলুন? গিন্নি যেমন রবি কাকার ভক্ত, তিনি কখন কী লিখলেন– সেই নিয়ে আলোচনা আরম্ভ হলে আমি যদি কিছু না বলি তাহলে জামাই হিসেবে আমার যে মান- মর্যাদা থাকে না।'
লক্ষ্মীনাথ যেভাবে রস লাগিয়ে বলল, জগদীশচন্দ্র হেসে ফেললেন।
' এমনিতেও পড়ি। ভালো লাগে। রবি কাকার পদ্য মানেই তো চিন্তা-চেতনার জগতের এক একটি দুয়ার উন্মোচন।'
' ঠিক বলেছেন। উপনিষদের রসে আপ্লুত পদ্য,গান–ওঁর পদ্য-গানগুলি আমাদের আত্মার কথা বলে।'
' স্যার, আপনার 'ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে' লেখাটা পড়ার আমার সৌভাগ্য হয়েছে।' লক্ষ্মীনাথ বলল,' আপনার ভাষাও খুব সুন্দর। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের এমন সুন্দর মিশ্রণ আমি আগে কখনও পড়িনি।'
' ওই ভাগিরথী নদীর কথা ভাবতে ভাবতে মনের মধ্যে ভাব এল, লিখলাম আর কি। আর ও লিখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সময়ের বড়ো অভাব।'
' স্যার ইউ হেভ জাস্ট রিটার্নড ফ্রম ইংল্যান্ড শোয়িং ইউর ডিসকভারি ইন দ্য ব্রিটিশ সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, লিভারপুল।'
লক্ষ্মীনাথ বলল,' উইল ইউ প্লিজ শেয়ার উইথ মি সামথিং এবাউট ইওর ভেলুয়েবল এক্সপেরিয়েন্স?'
' আন কম্পায়েয়ারয়েবল এক্সপেরিয়েন্স। সত্যিই কোনো তুলনা হয় না মিঃ বেজবরুয়া। এণ্ড একচুয়েলি ,স্টেয়িং হিয়ার অর বিয়িং এ প্রফেসর অফ প্রেসিডেন্সি কলেজ অফ ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি– ইউ উইল নট বী এবল টু ইমাজিন হাউ মাচ ডেভেলপ এন্ড এনরিচড ইজ দ্যা সাইন্টিফিক এনভাইরনমেন্ট হোয়াট দ্য প্রফেসরস দেয়ার ডুয়িং এন্ড হাউ দে আর থিংকিং!'
' অবশ্য কলকাতায় আপনার সঙ্গে প্রায় সমান্তরালভাবে পিসি রায় স্যারও রসায়নে ভালো কাজ করছেন।'
' হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। মারকিউরিয়াস অক্সাইড আবিষ্কার করার পর প্রফুল্ল চন্দ্র রায়তো এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রসায়নবিদ। এখন বিদেশে ওঁকে 'মাস্টার অফ নাইট্রেটস' বলে।তাছাড়া প্রফুল্লচন্দ্রের লেখা ' হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস' একটি মূল্যবান গ্রন্থ।'
তাছাড়া রায় স্যার' বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল' স্থাপন করেছেন।'
' এটা সত্যিই একটা বড়ো ব্যাপার। কলেজ- ইউনিভার্সিটির ক্লাস ল্যাবরেটরীতে শুধু থিওরি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে প্র্যাকটিকেল ফিল্ডে রসায়নের এপ্লিকেশনের জন্য যে ওরকম একটা শিল্প সংস্থা গড়ে তুলেছেন, এতে দেশের আরও বেশি উপকার হবে। তাছাড়া প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কেমন জাতীয়তাবাদী পুরুষ সেটাও নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন। নিজের সমস্ত উপার্জন উদারভাবে দেশ-জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। এদেশে এমন আত্মত্যাগী ব্যক্তি বিরল।'
তারপরে অধ্যাপক জগদীশ বসুর কণ্ঠস্বরটা বেদনা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল। সম্মানীয় বিজ্ঞানাচার্য সেরকম বেদনাভরা কণ্ঠেই ভারতীয় বিজ্ঞানের দৈন্য দশা, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে ভারতবাসীর সচেতনহীনতার কথা বললেন। বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার জন্যই যে ভারতের সমাজ থেকে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি অন্ধসংস্কার- কুসংস্কার এবং অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদের মতো কলঙ্ক থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না এসব কথাও বললেন।
অনেকক্ষণ শুনে লক্ষ্মীনাথ বলল,' স্যার এসব ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কার মূলক কাজ করেছেন।'
' সেসব এখনও অনেকটাই সরকারি আইন-কানুন হয়ে আছে,মিঃ বেজবরুয়া। গ্রাসরুটে বিশেষ কিছু হচ্ছে না।'
' তার জন্য কী করা যায়, বলুন তো?'
' এডুকেশন, এডুকেশন ইন অল লেভেলস। সর্বস্তরে শিক্ষা বিস্তার না হলে আমাদের জাতির মুক্তি নেই।'
তারপরেই জগদীশচন্দ্র কিছু সময় নীরব হয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে নিজেই নীরবতা ভেঙ্গে ধীরে ধীরে বললেন,' কিন্তু সেটাই বা কেমন করে সম্ভব? দেশটা যে বিদেশি ব্রিটিশের অধীন।'
' কিন্তু স্যার, এডুকেশনের জন্য সাহেবরা আমাদের দেশে স্কুল- কলেজ- ইউনিভার্সিটি স্থাপন করে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছে।'
' খুব সামান্য, প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।' তারপরে পুনরায় নীরব। জগদীশচন্দ্রের চিন্তিত মুখটাতে পুনরায় বিষন্নতার ছায়া,' আর ইংরেজ সরকার এতটা করবেই বা কেন, বলুন? ভারতবর্ষ তো আর ওদের জন্মভূমি নয়। তার মধ্যেও দু-চার জন যারা আমাদের এই ভারতের উন্নতি চান তারা দেশের বাস্তব চেহারাটা দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন দেড় হাজার বছরের কুপমুণ্ডকতাতো আছেই- তারপর দরিদ্র, অপুষ্টি, বেকারত্ব ইত্যাদি অর্থনৈতিক দৈন্যদশা–ইস, কী যে ভয়াবহ অবস্থা!মিঃবেজবরুয়া , ইউরোপে গিয়ে ওখানকার জনজীবন দেখে বুঝতে পারলাম আমরা কতটা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের এই দেশটার যে কী হবে? কেমন করে উন্নতি হবে?কে দেশের উন্নতি করার দায়িত্ব নেবে?'
লক্ষ্মীনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক এদিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল,স্যার, জাতীয় কংগ্রেস দেশবাসীর মনে যেভাবে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলছে- ওরা তো দেশের উন্নতি চায়।'
' উন্নতি চাইলেই তো আর উন্নতি হবে না। কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শাসন ক্ষমতা লাগবে। শাসন ক্ষমতা না পেলে কিছুই করতে পারবে না।'
' ওদের লক্ষ্য তো স্বরাজ।'
' সে বহু দূরের কথা।'
' এদিকে বেঙ্গল, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাবের মেধাবী কিছু ছেলে বোমা বন্দুক দিয়ে সাহেবদের মেরে তাড়াবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে।'
' ওসবের কোনো মানে নেই। ১৮৫৭ সনে ভারতবর্ষের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তি সেই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেছিল। তারপরে তো ব্রিটিশ এদেশে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এদিকে ইউরোপের বাইরে ভারত, চিন আমেরিকা আফ্রিকায় ওদের শাসন কায়েম হয়েছে। উগ্রবাদী যুবক কয়েকটি বন্দুক আর কিছু বোমা নিয়ে ব্রিটিশদের কিছু করতে পারবে না।'
লক্ষ্মীনাথ জগদীশচন্দ্রের এই কথায় খুব খুশি হল। কারণ ছাত্র জীবন থেকেই সে এই ধরনের উগ্রবাদী রাজনীতির সমর্থন করে না। তার মধ্যে আজকের আধুনিক মনন বীক্ষায় উন্নত বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সেই বিষয়ে যেভাবে স্পষ্ট ভাষায় নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন, তাতে লক্ষ্মীনাথের সেই বিশ্বাসটা আরও দৃঢ়মূল হল।
' স্যার, আপনার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলে সত্যিই অনেক কিছু জানতে পারলাম। আপনি যদি আমার একটি ছোট্ট অনুরোধ রক্ষা করেন‐।'
'বলুন।'
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' ইফ ইউ বি কাইন্ড এনাফ টু প্লিজ ডাইন উইথ আস টুডে এট নুন‐।'
' দ্যাট ইজ আই এম টু টেক লাঞ্চ!'
' প্লিজ স্যার ,ইট ইজ জাস্ট এ অনার টু ইউ।'
' ওয়েল। কিন্তু আমার সঙ্গে মিসেস এসেছেন।'
' তিনিও থাকবেন।' মুচকি হেসে লক্ষ্মীনাথ বলল,' এমনিতেও আপনি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন যে ম্যাডাম লেডি অবলা বসু ছাড়া আপনি কমপ্লিট নন।'
জগদীশচন্দ্র হাসতে লাগলেন। দিলখোলা দরাজ হাসি। হাসতে হাসতেই বললেন,' রিয়েলি ইউ হ্যাভ এ গুড সেন্স অফ হিউমার!
দার্জিলিঙের নাগরিক সমাজ সেনেটারিয়াম হলে বিজ্ঞানাচার্যকে সংবর্ধনা জানাল। ইতিমধ্যে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ ঘোড়ায় উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘায় গিয়ে সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করল। ঘুম স্টেশনে যাওয়ার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু বৃষ্টি পড়ে থাকার জন্য ঘুমে যাওয়া বাদ দিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক শিবনাথ শাস্ত্রী সেনেটারিয়াম হলে' 'ভারতবর্ষের অতীত-বর্তমান' শীর্ষক বিষয়টির উপরে এক মনোজ্ঞ বক্তব্য তুলে ধরলেন।তাঁর বক্তৃতায় ভারতীয় শাসকদের বীরগাথা, ধর্মীয় উদারতা, ভারতের আধ্যাত্মিকতাবাদী দর্শন এবং ভারতের গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন সাহিত্য- সংস্কৃতির কথা প্রকাশ পেল। পরবর্তীকালের রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় অনাচার, সামাজিক কুসংস্কারের নানা অনাচার, নৈতিক পতন হতে হতে ভারতবাসীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেল, ভারতীয়রা ভারতমাতাকে রক্ষা করতে পারল না, ভারত বিদেশির পদানত হল। বিদেশি ব্রিটিশ আসার পরে ভারতীয়রা পশ্চিমের শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারতবর্ষের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থাটা বুঝতে পারল। তবে এই বোধ-বিবেচনাটা কেবল একদল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে । দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে এখনও এই সচেতনতার সৃষ্টি হয়নি। শেষে অধ্যাপক শিবনাথ শাস্ত্রী স্বামী বিবেকানন্দের কথা উল্লেখ করে বললেন যে যতদিন পর্যন্ত দেশের সর্বসাধারণ লোক এবং যুবসমাজ সচেতন না হবে, ততদিন পর্যন্ত দেশের উন্নতির পথ প্রশস্ত হবে না।
বক্তৃতা শুনে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথের মনটা বেদনাক্রান্ত হয়ে পড়ল। স্যানেটারিয়াম হল থেকে বেরিয়ে সে আর বাইরে বেরোলো না । ভোলানাথের সঙ্গে হোটেলের রুমে চলে এল।
' প্রফেসর শাস্ত্রী এনলাইটেনড লেকচার দিয়েছেন-।' ভোলানাথ বলল, অথচ তোমার মন খারাপ!'
'দাদা–।' ভোলানাথের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' সেদিন প্রফেসর বসুর সঙ্গেও অনেক কথা বললাম। আর কথাগুলি পশ্চিমে বিকশিত বিজ্ঞান প্রযুক্তির জ্ঞানে মননে সমৃদ্ধ। তাঁর সঙ্গে কথা বলার পরে আমার মেন্টাল ডাইমেনশন অনেকটা খুলে গেল। আজ যে প্রফেসর শাস্ত্রী লেকচার দিলেন, এসব কম বেশি জানি। কিন্তু প্রফেসর শাস্ত্রীর যুক্তিপূর্ণ কথাগুলিতে মাতৃভূমির প্রতি তার যে প্রবল অনুরাগ, দেশবাসীর প্রতি যে গভীর ভালোবাসা… এটা আমাকে অসমের কথা মনে করিয়ে দিল। কলকাতা, কলকাতার বাইরে এই দার্জিলিং অথবা অন্যত্র এইসব চলছে। পরাধীনতার নাগপাশ নিয়েও বেঙ্গলি একদল কয়েক শতকের অন্ধ সংস্কার- কুসংস্কারের গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা দেশবাসীকে জাগানোর চেষ্টা করছে। এদিকে আমাদের অসমের অসমিয়া– ওরা আরও বেশি অশিক্ষিত, দেশ বিদেশের খবরাখবর না রেখে অচেতন হয়ে আছে। ওরা অলস, আফিম খেয়ে খেয়ে কর্ম বিমুখ নিষ্কর্মা হয়ে পড়েছে। ওরা কবে জেগে উঠবে?আমাদের অসমিয়াদের জাগাবার জন্য আমরা কী করেছি?'