ধারাবাহিক উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

পূরবী~ ৫৯ || অভিজিৎ চৌধুরী || Purabi~ 59

 

পূরবী~ ৫৯
অভিজিৎ চৌধুরী


শেষ লেখা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ একদিন লিখলেন, 
মিথ্যে  বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছো নিপুণ হাতে।
তীর্থও জানে,একদওন সব শূন্য করে চলে যাওয়া।পিছনে পড়ে থাকবে এক রমণীয় পথ।সেখানে রোদ কুয়াশার খেলা।কতো নতুন ভাব অভাবের নিয়ত দিনলিপি।ছলনা জাল তাঁরও মনে হয়েছে শেষমেশ।এই ছলনায় বারবার আবিষ্ট হওয়া।নিজেকে নতুন করে দেখা।
আর আছে অর্থহীন কাজ।সেখানে ছলনা নেই।সেখানে কোন বিচিত্র পথ নেই ৷ আছে শুধু সর্দারের চাবুক।তবুও  দেখা হয় নন্দিনীর সঙ্গে।সে ভালোবাসে আরেকজনকে।কতোখানি অধিকারবোধ তার।তার যে একটুতে অভিমান হয়,রাগ হয়।সব শোনে তীর্থ যেমন করে মেহের আলি বলে,সব ঝুট হ্যায়।শাশ্বত নয় তার আর রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব।বৃথা হাওয়া রোদ্দুর বলে,সে কি আমায় নেবে চিনে! 
নব ফাল্গুনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বেলা বয়ে যায় রাজবাড়িতে বাজে ঘন্টা।ঢং ঢং ঢং।
মায়াদর্পণ কাঁপে।দেখা যায় তিনি আসছেন।সৌম্য,শান্ত।বলবেন,জল দাও।
তৃষিত, তাপিত মানব যতোটুকু ছলনার জালে মোহিত হতে পারে তাতেই তার বাঁচার আনন্দ। 
মিথ্যে বিশ্বাসের ফাঁদ প্রবলতর হয়।সে বলে,এই তো একবার প্রিয়া, খুলে দাও বাহুডোর।

রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

পূরবী~ ৫৭ || অভিজিৎ চৌধুরী || Purabi- 57

 পূরবী~ ৫৭ || অভিজিৎ চৌধুরী




তীর্থ ভাবছিল, কোনটা অপরূপ! এই এখন বেঁচে থাকাটা নাকি মৃত্যুর পর অসীমলোকে হারিয়ে যাওয়া! তার আগে মরতে হবেই।কেমন হবে মৃত্যু!ফোটন- কণা হয়ে যাওয়া যেত যদি তাঁদের কাছে! মৃত্যুর স্বাদ যাঁরা পেয়েছেন।হয়  কিচ্ছুটি নেই,না হয় লয় হয়ে গেছে সব কিছু।দেহের কোনটা আগে স্তব্ধ হবে! নানা মুনির নানান মত।চোখে রোদচশমা।শান্তিনিকেতন ছাড়ছেন রবীন্দ্রনাথ। চোখের জল আড়াল করছেন।হিয়ার মাঝে লুকিয়ে রইল পৃথিবীর আলপথ।বিপুল তরঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি পার করলেন বাইশে শ্রাবণ।

 তীর্থের মৃত্যু হবে অনাড়ম্বর। আই সোসাইটি এক মিনিটের নীরবতা পালন করবে।

 আকাশ পার করে অন্য আকাশ! মা থাকবে! ডাকবে কি, মনু এলি! 
মনে হবে বা-রে।এতো নতুন করে শুরু।দেওঘরে বাজার করতে যাওয়া।রায় লজ।ছোট্র ঘর।কি মমতায় মা অপরূপা করে তুলেছে ছোট্ট ঘরটি।বিকেলে টমটমে চেপে অদূরের পাহাড়।বাবা কাশছে।খানিকটা রক্ত পড়েছে পাথরের গায়ে।মা বলছে,ফিরে যাই চল।

 সেই ফিরে যাওয়া কতো সুন্দর। ঘোড়াগুলির গলায় ঘন্টিবাঁধা।বাজছে।
হেমন্ত আসছে।কুয়াশার ঢেউ উচ্চাবচ পথ জুড়ে।

 গাছগুলি বৃষ্টির তোড়ে নুইয়ে পড়ছে।রবীন্দ্রনাথ চলেছেন একা।

রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১

পূরবী~ ৫৬ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস, Purabi

পূরবী~ ৫৬

অভিজিৎ চৌধুরী 



সাজাদপুরের কোঠাবাড়ি ও জমিটি বোধহয় মাত্র ১৩ টাকায় রাণী ভবানির এস্টেট থেকে কেনেন প্রিন্স দ্বারকা নাথ ঠাকুর।দেবেন ঠাকুরের অংশে সাজাদপুর না পড়লেও অনুজ ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে তাঁকেই দেখাশোনা করতে হয়।

সাজাদপুরে আসেন রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার কাজে।কুঠিবাড়িটি ছিল তাঁর অসম্ভব  প্রিয়।বড় বড় ঘর আর প্রকাণ্ড ছাদ ছিল তারাদের সঙ্গে সখ্যের বিচিত্র পটভূমি।এখানে তিনি বিসর্জন নাটক লেখেন।এক যুবক পোস্টমাস্টারের সঙ্গে আলাপের সূত্রে পোস্টমাস্টার গল্প।এখানকার স্নানঘরে রবীন্দ্রনাথ অনেক স্মরণীয় গানও লেখেন।ছিন্নপত্রের আটচল্লিশটি চিঠি যা তিনি ভাইঝি ইন্দিরাকে লিখেছেন,সাজাদপুর থেকেই লেখা।

তীর্থেরও প্রিয় খোলা ছাদ।ছেলেবেলায় তারা নক্ষত্রগুলো তাকে যেন ডাকত।গঙ্গার তীরে খোলা ছাদে রাত কেটেছে বকুলতলার বাড়িতে।সেই সময় খুব ফিচার লিখতে ইচ্ছে করত।লিখেছেও তীর্থ।সবুজ বয়া শুশুক আর গোপন সুড়ুঙ্গ দিয়ে নদীর কাছে রাতে যাওয়া সে ছিল এক খেলা।

খেলার পুতুল প্রলয় ঝড়েতে ভাঙলেও আবার ফিরে আসে ভালোবাসা।এবারের হাউজিং এর ছাদটা প্রকাণ্ড। এই যে ওরা জোর করে রেখে দিলে তীর্থকে সেও তো ভালোবাসার টানেই।

ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে.. এই গানটিও লিখেছিলেন সাজাদপুরে।প্রিয় ভাইপো অবনকে শুনিয়েছিলেন সবার আগে।আর হয়তো ইন্দিরার বিবাহবাসরে গেয়েও থাকতে পারেন।

সাজাদপুরের জমিদারির উত্তরাধিকার ছিল শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।প্রাণের চেয়েও ভালোবাসতেন ভাইপো,ভাইঝিদের।তাঁদের কাছেও রবিকাকা ছিল স্বর্গের দেবতা।হিন্দু কলেজে গান গাইতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে পরমাসুন্দরী ভাইঝি ইন্দিরা।সেই প্রথম দেখায় প্রমথ চৌধুরী প্রেমে পড়েন ইন্দিরার।

রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১

পূরবী-৫৫ || অভিজিৎ চৌধুরী || Purabi-55

পূরবী-৫৫

অভিজিৎ চৌধুরী



সদর স্ট্রীট থেকে কারোয়ার সমুদ্রতীরে গেছিলেন সদলবলে রবীন্দ্রনাথ। বোম্বাই প্রেসিডেন্সির দক্ষিণ অংশে কর্ণাটের প্রধান নগর।এলালতা আর চন্দনতরুর জন্মভূমি সেই মলয়াচলের দেশ।কলকাতার কোলাহল থেকে অনেক দূরে নিস্তরঙ্গ সমুদ্র ঝাউবন দিনে তপ্ত বালুকারাশি – নগরের এমন নিস্তব্ধতা তিনি সেই প্রথম অনুভব করেন।ওকাম্পোর সঙ্গে গল্পের ছলে এসেছিল কারোয়ার কথা।তখন বোধহয় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানকার জেলাজজ হয়ে এসেছিলেন।

বাড়িতে যখন ফিরেছিলেন মনে হয়েছিল যেন কোন গভীরতম ঘুমের প্রদেশ থেকে উঠে এসেছেন।

সেই ঘুমের দেশ ছিল তীর্থের বালকবেলায়।প্যারা টাইফয়েডে সমস্ত চেতনা যেন প্রগাঢ় ঘুমের দেশে রওনা দিত।

চাঁদের পাহাড়ে শংকরের মা বলেছিল,বাবা শংকর, তোর বাবার শরীর ভালো নেই। তোকে নৈহাটির পাটকলে চাকরি করতে হবে।তারপরেই এলো প্রসাদদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সই ডাক সুদূর মোম্বাসা। তীর্থও কি কখনও ভেবেছিল সে চাকরি করবে! মা বলতো,তোর বাবার শরীর ভালো নেই,কখন আর চাকরি করবি! চাকরির পড়ার চাইতে তীর্থের মন পড়ে থাকত এক জাহাজের ডেকে।ডেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে নতুন ক্যাপ্টেন,হাতে দূরবীন। সাহেব জেঠুর মতোন তারও চোখদুটো বন্দরে বন্দরে ঘুরতে পিঙ্গলবর্ণ হয়ে গেছে।গায়ের রং কালো আর তামাটের মিশ্রণ ।তাতে কি,পথের বন্ধু হয়েছে কিছু সিগ্যাল।রাতে লাইট হাউস তাকে পথ দেখায়, কখনওবা ধ্রুবতারা সঙ্গী হয় তীর্থের।


রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

পূরবী~ ৫১ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

 পূরবী~ ৫১

অভিজিৎ চৌধুরী




এখানকার প্রকৃতি খুব অনুদার।বের হলেই শুধু হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলে।

  মনে পড়ে বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য। সেই সকাল দুপুর সন্ধে আর লেখা আর লেখা।দুপুরে বৃষ্টি হলো আর বিকেল হলেই কে যেন আবির রং হেলায় ছড়িয়ে দিতো চরাচরে।রাতে শেয়াল আর বিষাক্ত সাপেদের আনাগোনায় ভয় করত কিন্তু এখন মনে হয় সেই চিত্রল সরীসৃপদের রূপও তো কম ছিল না।এমনও তো হতে পারে কোন সর্পিণী ছিল তার গতজন্মের সাথী।সে ভুলে গেছে কিন্তু সখী মনে রেখেছে তাকে।

  শিলাইদহ থেকে ফেরার পর জোড়াসাঁকোর বাড়ি তেমন ভালো লাগত না রবীন্দ্রনাথের। শান্তিনিকেতনে পাঠশালা খুললেন।ধীরে ধীরে পরিবারের গণ্ডি কাটিয়ে তার ব্যাপ্তি বাড়ল।

   সাজাদপুর পদ্মা তাঁর লেখক সত্তায়, গীতিকার সত্তায় এক অনন্য সংযোজন।পতিসরের কথা তিনি কখনও ভুলতে পারেননি।
  
  তীর্থও পলাশিপাড়ায় থাকার সময় ভোরে দুপুরে রাতে লিখত নিয়মিত বিশেষ করে ছুটির দিনে।গগন হরকরার সুর আর জ্যোতিদাদার কিশোরবেলায় পিয়ানোর ইউরোপীয় সংগীত ধারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত।
কে লেখায়! অবসর না প্রকৃতির মমতার প্রলেপ! 
আজ মনে হয় অপরূপা বাংলার ভূপ্রকৃতি আসল সৃজক।মৌলিক কখনও কিছু হয় না কারণ সব কিছুই মুক্তি পেয়েছে বসন্ত হেমন্ত আর বর্ষার অবিরাম জলধারায়।
  
   পাতা ঝরছে শুকনো পাতা কখনও কখনও মনে হতো পাখির পালকের মতোনই উঠে চলেছে দিগন্তের শেষ সীমান্তে।

রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

পূরবী~৫০, অভিজিৎ চৌধুরী,ধারাবাহিক উপন্যাস,

পূরবী~ ৫০

অভিজিৎ চৌধুরী




   The time has come when badges of honour make our shame..... ১৯১৯ জালিয়ানাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ নাইটহুড ত্যাগ করলেন এবং লিখলেন এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ পত্র।গান্ধীজীও সেই সময় বলেছিলেন,I don' t want to embarrass Government. 

      প্রতিবাদী রবীন্দ্রনাথের সেই ছবি দেখে চমকে উঠেছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। অ্যান্ড্রুজও কবিকে বলেছিলেন চিঠির ভাষা খানিকটা নমনীয় করতে।
    
    তীর্থ ভাবছিল,মহাকালের সেই ডাক ভারতবর্ষের পটভূমিতে এক অচেনা ছবি।
    
    আজ এই প্রতিবাদ কোথায়! নিজেদের মেরুদণ্ড আছে কিনা খুব কম টের পাওয়া যায়।অনেক সময় মনে হয় মানুষ থেকে সে বুঝি সরীসৃপ হয়ে গেছে।করোনার আগেই সে হারিয়েছে শ্রবণ ঘ্রাণ যাবতীয় সূক্ষ্মতা।
      
     বেঁচে আছে,এটুকু বলা যায়।এই যে অর্থহীন কর্মপ্রবাহ তা কি কোনভাবে বেঁচে থাকাকে মহিমময় করে! সুপ্রভাত  হয় আরেকটা নতুন গ্লানিকে সম্ভাষিত করবে বলেই।
     অতিমারী স্পষ্ট করেছে আমাদের চেয়ে না মানুষের দল এই পৃথিবীর যোগ্য বাসিন্দা।
    
       তীর্থরা এক সময় ভাবত সাম্যবাদ আসবে।তারপরে ভেবেছে সংসদীয় গণতন্ত্র আনতেই পারে প্রজাপালক সরকার।ভুলের পরিমাণ বেড়েছে।আর সুনাগরিক ভেবেছেন,আই ডোন্ট ওয়ান্ট ট্যু এমবারাস গর্ভমেন্ট। তীর্থ মনে মনে ভাবলো ৷

রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

পূরবী -৪৯ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

 পূরবী -৪৯ 

অভিজিৎ চৌধুরী


   ইন্দোনেশিয়া জাভা সুমাত্রা ভ্রমণের পর রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যে নৃত্যের ব্যবহার সমধিক হয়।তাসের দেশ তার পরের কিনা তীর্থের জানা নেই।সাল তারিখ ঘাঁটতে ভালো লাগে নারেফারেন্স বইয়ের পাণ্ডিত্যের অভিমানকেও ভয় কর।আপন মাধুরী মিশিয়ে ওঁর এই শেষ বেলার পূরবী।ক্রিমেটেরিয়ামেও মৃতের জায়গা হচ্ছে না।অগত্যা ব্যুরিয়াল গ্রাউন্ড।মুহূর্তের তাণ্ডবে সবকিছু তছনচ হয়ে যেতে পারে।বাবার যাবতীয় স্নেহ আগলে ধরে রাখতে চায় সন্তানকে।

   তাসের দেশ উৎসর্গ করেছিলেন সুভাষ বসুকে।স্বাধীনতার প্রয়োজনে হিংসা রক্তপাত তবে নেতা হতে কল্যাণকামী কিন্তু কোন অচলায়তনে আবদ্ধ নন।কোথাও যেন ইংগিত রইল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রতি।বা অতিরিক্ত শৃংখলে আবদ্ধ মাতৃভূমির প্রতিও।

   শান্তিনিকেতনে বিদেশী  ছাত্র ছাত্রীদের মধ্য উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল জাপান ও চীন থেকে আসা তরুণ তরুণীরা।সেই সময়ের এশিয়া ভূখণ্ডও কবির মধ্যে প্রাচ্যের সংস্কৃতির ও দর্শনের বা শুধু তা কেন কবিতারও জয়গান দেখতে পেয়েছিল।

   জাপানে এক তরুণী রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুরাগিণী হয়ে উঠেছিলেন।একলা যে গানের তরী বাইবেন বলে বের হয়েছিলেন নতুন বউঠানের সাহিত্য সঙ্গী হিসেবে,সেই একলা পথিক তাসের দেশের যাবতীয় নিয়ম ভেঙে দূরকে করলেন আপন।একদিন দেখা গেলো ভূগোল বলবে তিনি ভারতবর্ষের মানুষ কিন্ত ভালোবাসার প্রবহমানতায় তিনি বিশ্ব নাগরিক।

   খুব কম জনই হয়তো রইলেন তিনি রবির আলোয় দীপ্ত হননি।

   এই অতিমারীতে আশ্বাস বিশ্বাস জীবনের অমেয় বেঁচে থাকায় তীর্থের কাছে সেই পুরোনো রবীন্দ্রনাথই এলেন।

রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

পূরবী~ ৪৮ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী ৪৮

অভিজিৎ চৌধুরী



   শহর, গ্রামে,মফসসলে খুব কম বাড়ি রয়েছে যেখানে কোভিড আক্রান্ত মানুষ নেই। যাঁরা মনে করছেন তাঁদের হয় নি,আসলে তাঁরা লুকিয়ে রেখেছিলেন অদ্ভূত এই রোগে স্বাদ গন্ধ চলে যায়। শহরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতাল সেফ হোম তুলনায় অপ্রতুল।
   তীর্থ সরকারি আধিকারিক। তার মৃত্যুভয় কম।কিছুক্ষণ আগে সে একটা সুরত হাল করল।বোঝা যাচ্ছে এটি কোন আত্মহত্যা নয়।স্টেটম্যান নিল তীর্থ।একটানা অবসরহীন তিনমাস কাজ করার পর একটা রোববারে শহর কলকাতায় শ্বশুর বাড়িতে এসেছে।ঠিক উল্টোদিকের বাড়ির আবাসিকদের জীবনযাপন বড্ডো অদ্ভুত।অসংখ্য রাস্তার কুকুর দুই ছেলে আআর তার মা বসবাস করে। বাড়িটিতে একজনের কোভিড হয়েছে।এমনিতে পাড়ার কারুর সঙ্গে কথাবার্তা নেই,এখন তো আরো।
   পঁচিশে বৈশাখের বিকেল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি নামল।বাইশে শ্রাবণযেন।ওই অদ্ভুত বাড়িটা থেকে রবিবাবুর গান ভেসে আসছে। আর কোথাও রবীন্দ্রনাথের চিহ্ণ নেই শহরে।টিকার জন্য লাইন ও হাহাকার। যে জীবনে মানুষ অভ্যস্ত ছিল,বদলে গেছে হঠাৎই। 
   সেবার প্লেগও মানেনি রাজা প্রজা। জোড়াসাঁকোতে মৃত্যু হল অবন ঠাকুরের মেয়ের। নিবেদিতা অক্লান্তভাবে সেবা করে চলেছেন বস্তি বস্তিতে। কবিকে খুব অসহায় দেখাচ্ছে।

রবিবার, ৯ মে, ২০২১

পূরবী~ ৪৭ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

 পূরবী~ ৪৭

অভিজিৎ চৌধুরী 





প্যারিসে বিখ্যাত চিত্রশালায় প্রদর্শনী হলো।আড়ালে প্লাতা নদীর সেই বিজয়া।
কখনও ফেরেননি আর তাঁর প্রিয় নারীদের কাছে।তার মানে ভালোবাসাকে শাশ্বত রাখা।এটুকু সেই বিজয়াও মেনেছিলেন হৃদয় দিয়ে।
এদিকে অন্য পটভূমিতে বিশ্ব ইতিহাসকে বিকৃত করছেন হিটলার।নিজের বায়োপি দেখালেন এক সময় দিন মজুর ছিলেন।যাবতীয় জ্ঞান ভাণ্ডারে আগুন ধরালেন।লজিক ও স্বাধীন চিন্তার অবসান ঘটালেন।বার্লিন ছাড়তেই হল আইনস্টাইনকে।এলেন ডেনমার্ক। হিটলারের চরেরা পিছু নিলো।অবশেষে ইংল্যান্ডের এক গ্রামে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আত্মগোপন করলেন।ছোটদের পড়াচ্ছেন।
ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে রমা রলাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে কাছে পেতে।উপলব্ধির স্তরে না গেলে সহমত হতেন না।বিশ্বমানবতায় যাত্রাও এক উপলব্ধি। 
তীর্থের মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি মানুষের বিবর্তনে প্রগতির এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
প্রায়ই পর্বতপ্রমাণ ভুল করেছেন।আবার নিজেই খুঁজে নিয়েছেন সংশোধনের পথ।বারবার নিজের সংস্কার করেই চলেছেন।
আর অটোক্র্যাটিক লিডাররা ঠিক বিপ্রতীপ।তাঁরা নিজে ভুল করে তার সংক্রমণ করান।সভ্যতা বারবার ধ্বংসের মুখে পড়ে।
ভয়ংকর অতিমারীতে এই জীবাণু থেকে মুক্তির উপায় কোন অজানা ভয়ের কাছে সমর্পণ নয়,বরংসৃজনে উদ্বুদ্ধ থাকা।
আজ পঁচিশে বৈশাখ।তীর্থের কাছে প্রতিটি দিনই পঁচিশে বৈশাখ।তবে আবার সাদা পাতায় কালো অক্ষরে তাঁর সঙ্গে সখ্য ভাবনার নতুন সূত্রপাত।
পূরবীর আলোয় চিরকালীন নতুন অভ্যুদয়কে ভালোবাসার আলোয় দেখা।আজ নির্বাণের কথা নয়,কোন তিরোধানের শ্রাবণধারা নয়।একান্তে বিবমিষা উত্তীর্ণ চিরচেনা চিরসখা।

বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ || নিরুপমা বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~বাসুদেব দাস

 

একজন বুড়ো মানুষ

নিরুপমা বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~বাসুদেব দাস



(৫)

ভূতে ইলার যত ভয়,ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিও ছিল ঠিক ততটাই। রান্নাঘরের এক কোণে কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে একটা কাঠের বাক্সে ফুলতোলা নতুন গামছা পেতে দিয়ে কৃষ্ণের মুর্তি বসিয়ে প্রতিদিন বিকেলে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ ধুনো দিয়ে ইলাকে ভক্তিভরে পুজো করতে দেখা যেত। এই দৃশ্য বিজয়ের মনকে এক ধরনের পুলক আর আবেগ পরিপূর্ণ করে তুলেছিল। তার বিবর্ণ শ্রীহীন ঘরটা এক নারীর কল্যাণ স্পর্শে কী পবিত্র ,কী সুন্দর শান্ত হয়ে পড়েছে। জীবনটা যে এত সুন্দর,বেঁচে থাকার মধ্যে যে এত সুখ,এর আগে বিজয় কখনো অনুভব করে নি।

ইলার এই ঈশ্বর ভক্তি দেখে কিন্তু বিজয় ভূতের কথা নিয়ে ঠাট্টা করতে ভুলে যায় নি।‘ইলা তোমার যদি ঈশ্বরে এতই বিশ্বাস তাহলে ভূতে ভয় কর কেন?’

‘ঈশ্বরে আমি যতটা বিশ্বাস করি ভূতেও ঠিক ততটাই বিশ্বাস করি।‘

‘তোমার ঈশ্বর কি তোমাকে ভূতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না?’

‘এই সমস্ত ছোটখাট ব্যাপারে মাথা ঘামানোর মতো ঈশ্বরের কাছে সময় নেই।'বিজয় হেসে ফেলল--তাই নাকি? আমি আরও ভেবেছিলাম ঈশ্বরের সময় অনস্ত। আচ্ছা,ঈশ্বর যদি ছোটখাট ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে বড় বড় ব্যাপারে থাকেন,তাহলে সেই বড় ব্যাপারের দুই একটি উদাহরণ দাও দেখি ইলা।'

বিন্দুমাত্র না হেসে সেদিন কিছুক্ষণের জন্য ইলা গন্তীর হয়ে পড়েছিল। তারপর গভীর কণ্ঠে বলেছিল –‘আমাদের বিয়ে।'

বিজয় আবার হাসল-‘আমাদের বিয়েতে ঈশ্বর উপস্থিত ছিলেন নাকি ইলা?’

“ছিলেন তো। নিশ্চয় ছিলেন।‘

পুনরায় হালকা কিছু বলতে গিয়ে এবার থমকে গেল বিজয়। ইলার মুখের দিকে তাকিয়ে সে দেখল জগতের সমস্ত বিশ্বাস এবং ঐকান্তিকতা যেন সেই সরল মুখটিতে এসে জমা হয়েছে | বিজয় কিছুক্ষণ কিছুই বলতে পারল নাতারপর বলল--ইলা,তোমার বাবা ভয় পেয়েছিল যে আমাদের পরিবারের আশীর্বাদ না হলে আমাদের বিবাহিত জীবন মঙ্গলময় না ও হতে রে। কিন্তু ঈশ্বর স্বয়ং যে বিয়েতে উপস্থিত থেকে আশীর্বাদ করে ,সেই বিয়ে কখনও অশুভ হতে পারে না,নয় কি ইলা? 

উত্তরে ইলা কেবল মাথা নাড়িয়েছিল,আর বিজয় দেখল কী এক অপূর্ব জ্যোতিতে ইলার মুখটা যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছ।

কিন্তু আজ মনে পড়ে যাওয়ায় এই ভেবে নিজেকে একজন পাষণ্ড বলে ভাবতে ইচ্ছা করে যে এত কিছুর পরেও ইলাকে পরীক্ষা করার জন্য তার মনে এক কুৎসিত কৌতুক জেগেছিল।

সেদিন কিছুক্ষণ ইলার মুখের দিকে মুগ্ধভাবে তাকিয়ে থেকে বিজয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল –‘আচ্ছা,ইলা তুমিতো আমাকে বিশ্বাস করে খুব নিশ্চিন্ত ছিলে ? যদি আমি শেষ পর্যন্ত তোমাকে বিয়ে না করতাম ,যদি তোমাকে ঠকাতাম ? বিজয়ের মাথায় সেদিন কী যে ভূত চেপেছিল,ইলা তার কথার কী জবাব দেয় তা জানার জন্য দুষ্টুমিভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইলার গহীন মুখটা করুণ হয়ে গেল,তারপরেই বিজয় দেখতে পেল ইলার চোখদুটো জলে ভরে এসেছে। কিন্তু সে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে দিল না। নিজেকে সংযত করে ধীরকণ্ঠে বলল --বাবা বলেন,সংসারে আসলে কেউ কাউকে ঠকাতে পারে না,অন্যকে ঠকাতে গিয়ে নিজেই ঠক খেয়ে যায়। যাকে ঠকানো হয় তার যতটুকু লোকসান হয়,যে ঠকায় তার লোকসান আরও বেশি হয়। বাবা বলেন যে, যে ঠকায় সে তার নিজের বিবেককে বিসর্জন দেয়। সেটা কি মানুষের জীবনে সামান্য ক্ষতি?

এতটুকু বলতেই ইলার মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে ছিল। -‘আপনি কেন আমার সঙ্গে এই ধরনের বাজে ঠাট্টা করছেন? আমার মনে হয় না আপনার মতো মহৎ মানুষ জীবনে খুব বড় শক্রকেও ঠকাতে পারে?

ইলাকে প্রশ্নটা করেই ইলার করুণ মুখ এবং সজল চোখ দেখে বিজয় সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিল । মনটা আত্মধিক্কারে ভরে গিয়েছিল। এখন ইলার কথাগুলো যেন তাকে চাবুক কষাল। সে কেবল বলল –‘তোমাকে না ঠকানোর মধ্যে আমার কোনো মহত্ত্ব নেই ইলা । আসল কথা হল -তোমাকে ঠকানোর জন্য খুব বড় ধরনের পাষণ্ডের প্রয়োজন। আর আমি পাষণ্ড হলেও খুব বড় ধরনের পাষণ্ড নই বোধহয়’।

বিয়ের পনেরো দিন যাবার পরে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বিজয় একটা দৃশ্য দেখতে পেলঃ ওদের বসবাস করা বাড়ির পেছন দিকটার জমিতে বাদল মাটি কুপিয়ে চলেছে,আর ইলা সামনে দীড়িয়ে তাকে কীসব নির্দেশ দিয়ে চলেছে।

দাঁত ব্রাশ করতে করতে বিজয় বাইরে চলে এসেছিল। সে এই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য ব্রাশ করতে ভূলে গেল।

‘বাদল মাটি কুপিয়ে চলেছে কেন ইলা?’

‘কী যে বলেন,কেন আবার ,খেত করার জন্য ৷’

জানা কথা,খেত করার জন্যই জমি কুপিয়ে চাষের উপযোগী করা হয়। কিন্তু এত সহজ,সবার জানা কথাটিও যেন বিজয়ের জানা ছিল না। সে যেদিন শহরে বসবাস করতে গেছে সেদিন থেকে এইসবের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

গ্রামে থাকার সময়েও যে খুব একটা যোগাযোগ ছিল সে কথাও খুব জোর দিয়ে বলতে পারছে না। শৈশব থেকেই তার স্বভাবটা অন্য ধরনের । বাইরের কাজকর্মে তার কোনোরকম আগ্রহ নেই,কেবল পড়াশোনা করতেই ভালোবাসে । বাড়িতে অনেক লোকজন,তাই গ্রামের বাড়ি হলেও তাকে সেই সমস্ত কাজকর্মে যোগ দেবার জন্য কেউ বলত না। সে পড়াশোনা করছে,পড়াশোনা ভালোবাসে,তা নিয়েই থাকুক--বাড়ির সবার এটাই ছিল সাধারণ মত। শুধুমাত্র মা কখনও কাউকে হাতের কাছে না পেলে তাকে দাটা দিয়ে বলত ,যা তো বাবা  গাছ থেকে বড় লাউটা কেটে নিয়ে আয় গিয়ে। আমি মাছটা কেটে নিচ্ছি। এভাবেই হয়তো কোনোদিন লাউ কেটে এনেছে বা কপি খেত থেকে কপি নিয়ে এসেছে। ব্যস তার বেশি কিছু নয়। এরপরে তো হোস্টেলেই চলে গিয়েছিল। তারপর এক বছর কেটেছে চাকরি করে। এই বাড়িটা নেবার আগে সে যে বাড়িতে ছিল ,সেই বাড়িটা ছোট এবং ভাঙা ছিল যদিও কম্পাউগুটা ছিল বিশাল। সেখানে ভবিষ্যতে নাকি মালিকের বড় বড় ঘর তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তাই তিনি বর্তমানের ঘরটা ভালোভাবে মেরামতও করছিলেন না। খুবই কম টাকায় ভাড়া দিয়ে রেখেছিলেন। সেই ঘরের সামনে জমি,পেছনেও জমি--সেই জমি মরুভূমিতুল্য হয়ে পড়েছিল। সে বসবাস করার সময় সেই জমিতে সামনের দিকে যেমন একটা ফুলের গাছও জন্মায় নি ,পেছনেও তেমনি লাউ গাছের চারা বা কিছুই জন্মায় নি। সেই সবই তার কাছে একেবারে অকল্পনীয় ছিল। আজ তাই এই সাধারণ কথাতেও বিজয় একেবারে অবাক হয়ে গেল। এই বাড়িতে তো আগের তুলনায় জমি প্রায় নেই বললেই চলে।

‘কোদালটা কোথায় পেলে?’ বিজয় দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল।

‘কোথায় পাব আর। বাজার থেকে কিনে এনেছি। আপনি যে অন্য কথা জিজ্ঞেস না করে প্রথমে কোদালের কথা জিজ্ঞেস করলেন -কোদালটা দেখে আপনার ভয় হচ্ছে নাকি আপনার- কোদাল মারতে হবে বলে? ভয় করলেও কিন্তু উপায় নেই,আপনাকেও কোদাল চালাতে হবে। বাদল একা পারবে না। তাছাড়া চাষের দিনও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে--অন্যের বাড়ির লাইশাক,পালংশাক খেয়ে বিরক্তি ধরে গেল,আমরা এখন চাষ শুরু করেছি,তাই জোর কদমে কোদাল না চালালে হবে না।'

বিজয় দাঁত ব্রাশ করতে ভূলে গেল--হাতের ব্রাশ হাতেই থেকে গেল--তুমি পাগল হয়েছ ইলা? আমার জীবনের অর্ধেক দিন গেল এই সমস্ত কাজ না করে,এখন তুমি আমাকে দিয়ে নতুন করে কোদাল ধরাবে? এখন এসব ছেড়ে আমাকে চা দাও’--অনেকটা বিরক্তির সঙ্গেই যেন এবার জোরে জোরে বিজয় দাঁতে ব্রাশ ঘষতে লাগল বিজয়।

ইলা আর তখন কিছুই বলল না-নীরবে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুক্ল।কিন্তু সেদিনই বিকেলে অফিস থেকে এসে বিজয় একটা দৃশ্য দেখতে পেল।ইলাকে ঘরের ভেতরে কোথাও  দেখতে না পেয়ে রান্নাঘরে খোঁজ করতে গিয়ে বিজয় বারান্দার সামনে থমকে দাঁড়াল। 

‘তুমি পাগল হয়েছ ইলা?’ বিজয় চিৎকার করে উঠল। সে চিৎকার না করে পারল না। কারণ সে দেখল কোদালটা হাতে নিয়ে কিছুটা ঝুঁকে ইলা সকালে বাদল কুপিয়ে রাখা মাটিতে পুনরায় কুপিয়ে চলেছে। ইলা যেন খুব লজ্জা পেয়েছে । কোদালটা সেখানেই রেখে দিয়ে ইলা প্রায় দৌড়ে চলে এল।

‘বাদল বাজারে গেল,তাড়াতাড়ি না পাঠালে চলে না,শীতের ছোট রাত,একটু পরেই বিকেল হয়ে যাবে। এদিকে চাষের দিনও প্রায় অতিক্রান্ত,দ্রুত না কোবালে কীভাবে হবে। আর এই মুহূর্তে আমার হাতে তো সেরকম কোনো কাজও ছিল না।একেবারে বসে থাকার চেয়ে কিছুটা শারীরিক পরিশ্রমও করা গেল। প্রামের মেয়েরা তো নিজেরাই চাষবাস করে ।’ স্বামীর কাছে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ইলা যেন কৈফিয়তের বন্যা বইয়ে দিল।

‘তুমি সত্যিই পাগল হয়েছ ইলা । বাজারে শাক-সব্জির এত আকাল হয় নি,যে তোমাকে সব্জি ফলানোর জন্য কোদাল চালাতে হবে-’

বিজয় আরও অনেক কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু ইলা মাঝপথে বাধা দিয়ে বলে উঠল –‘কেবল খাবার জন্যই মানুষ শাক-সব্জির চাষ করে নাকি-?’

‘তাহলে কিসের জন্য ?’ বিজয় কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।

‘দেখার জন্যও --, ইলা হেসে ফেলেছিল-‘বাড়ির সামনে আর পেছনে জঙ্গল হয়ে থাকলে ভালো দেখায় কি? গৃহস্থ বাড়ির বাগানে দুই একটা শাক সব্জি না থাকলে ভালো দেখায় না। সকালে ঘুম থেকে ওঠে বাইরে বেরিয়ে এসেই বাগানটা ঘাস জঙ্গলে ভরা দেখলে আমার মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যায়।'

এরপরে বিজয় আর কোনো উচ্চ-বাচ্য করল না। অফিস থেকে এসে কিছু মুখে না দিয়ে এই সব কথা নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ইচ্ছেও তার ছিল না। তাই দ্রুততার সঙ্গে পোশাক ছেড়ে এসে ইলার রাখা গরম চা-জলখাবারে মুখ দিল।

খাবার পরে বিজয় এমন একটা কাজে হাত দিল যার কথা ভেবে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। জীবনে প্রায় প্রথমবারের জন্য সে কোদালে হাত লাগাল। কেন তার এদিকে হঠাৎ মন গেল সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।

সেই যে শুরু । এর পরে বিজয়ের নিত্য-নৈমত্তিক কাজই হল সকাল বিকেল বাগানের গাছপালার যত্ন নেওয়া । একমাস পরে তাদের বাড়ির সামনে এবং পেছনে কারও যত্নের স্পর্শে সবুজ চারাগাছগুলো যেন হাসতে লাগল।

সেদিকে তাকিয়ে ইলা একদিন বিজয়কে জিজ্ঞেস করল-‘নিজের হাতে লাগান বাগানের এই চারাগাছগুলো দেখে আপনার এখন কেমন লাগছে?’

‘কেমন লাগবে আবার। ভালো লাগছে। বিজয় সেদিন ইলাকে সাধারণভাবে উত্তর দিয়েছিল। কিন্তু ইলার ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল একটু অন্যরকম। বিজয়ের মতো তা ঠিক আরোপিত ছিল না। গাছ-পালা লাগিয়ে,বীজ ছড়িয়ে অস্কুরের জন্ম দিয়ে ইলা যেন সৃষ্টির অপূর্ব আনন্দ লাভ করছিল। ইলার হাতে কোদাল দেখে একদিন উত্তেজনার বশে বিজয় হাতে কোদাল তুলে নিল,চাষ করল,এবং এই চাষ করা একদিন তার নেশায় পরিণত হল। পড়ার নেশার সঙ্গে দ্বিতীয় নেশা যোগ হল চাষ করা। কিন্তু ইলার ক্ষেত্রে বিষয়টা কেবল নেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নেশার চেয়েও গভীর কিছু ছিল। বাগানটাকে যেন ইলা রক্তমাংসের সন্তানের মতোই ভালোবাসত। যখনই শাকসব্জি বা ফুলের মধ্যে যায় ইলা,একবার না একবার সে গাছের পাতা বা ফুলের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করবেই।

কতদিনই বা তারা এই বাড়িতে ছিল,মাত্র একবছর । কিন্তু সেই এক বছরেই ওরা দুজন বাড়িটার সামনে এবং পেছনে দুটো চিরস্থায়ী বাগান করে রেখে গেল। সামনের বাগানে গোলাপ এবং জবাফুলের গাছগুলো হয়তো এখনও রয়েছে। পেছনের বাগানে কুল,জলপাই,আমলকি,আম,কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের গাছগুলোর ফল বোধহয় আজও সেই বাড়ির বংশধরেরা ভোগ করছে। বিজয় ভরালী কল্পনার চোখে একটা সমৃদ্ধ বাগানের রূপ দেখার চেষ্টা করল --যেখানে ফুলের গাছগুলি সুগন্ধি দেশি ফুলে,আর ফলের গাছগুলি নানা সুমিষ্ট ফলের ভারে  ঝুঁকে রয়েছে।কিন্তু সেই কল্পনা সঙ্গে সঙ্গে বিজয় ভরালীর থেমে গেল। গুয়াহাটি শহরে এখনও কি কেউ আর এতটা জমি ফুল আর ফলের গাছের জন্য অপচয় করতে পারে? একটা ফলের বাগানের বদলে একটা ঘর বানিয়ে ভাড়া দিলে মাসে কত টাকা আয় হবে-কমলা বোধহয় খুব ভালো বলতে পারবে। হঠাৎ কমলার কথা মনে পড়ে গেল কথাটা ভেবে ঠিক শেষ করার সঙ্গে,যেন অন্য কেউ বলা কথার সঙ্গে বিজয় ভরালী কমলার কথাটা যোগ করে দিল।তাঁর ঠোঁটে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল।হ্যাঁ,কমলা বোধ হয় হিসেবটা ভালো করেই জানবে।কিন্তু ইলা বোধহয় জানত না।কেবল সেই যুগের মেয়ে বলেই নয়,আজকের যুগেও ইলা এই হিসেব জানত না।লাভের হিসেবে কাজ করতে তো ইলা কোনোদিন শিখল না।যে বাড়িতে এক বছরের বেশিদিন থাকে নি,সেই বাড়িতে এত ফুলের গাছ,ফলের গাছ লাগানোর কী প্রয়োজন ছিল ইলার। কত জায়গা থেকে যে চারা আর বীজ সংগ্রহ করেছিল ইলা। বাপের বাড়িতে থাকা গোলাপ,জবা ইত্যাদি ফুলের গাছের ডাল এনে লাগানো ছাড়াও বন্ধু বান্ধব যার বাড়িতে যত ধরনের গাছ দেখেছিল,সম্ভব হলে সেই সবের ডাল,চারা,বীজ না এনে ছাড়ত না ইলা। ইলার বিয়ের পরেই মামাতো বোনের বিয়েও হয়েছিল,গুয়াহাটি থেকে অনেক দূরে বিয়ে বলে ইলা যাবার আশা করায় বিজয় ইলার মা-বাবার সঙ্গে ইলাকেও যাবার অনুমতি দিয়েছিল। নিজে যেতে না পারল না। ছুটি নেই। নিজের বিয়েতে অফিস থেকে প্রাপ্য ছুটি গুলি খরচ হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে বাড়ি থেকে চার পাঁচ দিনের মধ্যে ইলারা ফিরে এসেছিল,বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিজয়ের সঙ্গে একটা দুটো কথাবার্তা বলে ইলা বাদলকে নির্দেশ দিয়েছিল –‘বাদল ব্যাগ থেকে জিনিসগুলি বের করার সময় কাগজের পুঁটলাটা সাবধানে বের করবি,কয়েকটা গাছের চারা আছে।'তারপর বিজয়ের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তিভরা হাসিতে ইলা বলেছিল—‘আমার মামার ফুল বাগানের প্রতি এত সখ,এমন কোনো ফুলগাছ নেই যা তার বাগানে নেই।| আমিও মামার অনুমতি নিয়ে কয়েকটি ফুল গাছের চারা নিয়ে এসেছি।'

এতদিন ইলার বাগানের কোনো কাজে বিজয় কথা বলে নি,কত জনের কত রকমের ‘হবি’ থাকে,বোঝা গেল ইলার ‘হবি'বাগানে,তাতে বিজয়ের বলার কী আছে। কিন্তু সেদিন বিজয় আর চুপ করে থাকতে পারল না। সব কিছুরই একটা সীমা থাকে-এত দূরের একটা শহরে বোনের বিয়ে উপলক্ষে গিয়ে একগাদা গাছপালা বহন করে নিয়ে আসা দৃশ্যে সেখানে যে সমস্ত আত্মীয় রয়েছে তারা ইলার সম্পর্কে কী ভাবছে?

‘আচ্ছা ইলা,তুমি যে এই বাড়ির চারপাশে এত গাছপালা লাগিয়েছ,বাগান করেছ,কার জন্য? জানই তো,আমার বদলির চাকরি,দুদিন পরেই এই বাড়ি ছেড়ে আমাদের অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে,তখন এই ফুলের শোভা কে দেখবে,এই গাছের ফলই বা কে খাবে?’

‘কী যে বলেন আপনি?’--ইলা যেন বিজয়ের কথায় খুব অবাক হয়ে গেছে -মানুষ কোনো কাজ করার সময় কেবল নিজের কথা ভেবেই করে কি?আমার বাবা সব সময় বলেন –‘সুবিধা পেলেই আমাদের পরোপকার করা উচিত।'আপনারা স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে একজন বুড়োর বীজ বপন করার গল্প পড়েছিলেন না? বুড়ো বীজ বপন করেছিল--নিজে না খেতে পেলেও একদিন নাতি নাতনিরা খেতে পাবে । আমরা এখান থেকে চলে গেলেও সেই একইভাবে আমাদের পরে আসা মানুষেরা আমাদের বপন করা গাছপালা গুলির ফল ভোগ করতে পারবে ।

ইলার এই কথার পরে বিজয় আর কোনো কিছু বলেনি। এখন সেই স্মৃতিগুলি রোমন্থন করতে করতে বিজয় ভরালী ভাবল-ইলাতো বেশি পড়াশোনা করে নি।কিন্ত কথা-বার্তার মাঝখানে যখনই সুবিধা পায় তখনই সে পড়ার বইয়ের থেকে উদাহরণ তুলে দিত। যে অল্পকিছু পড়াশোনা করেছিল,তাকেই বোধহয় ইলা তার সমগ্র সত্ত্বা  দিয়ে আপন করে নিয়েছিল। আজ জীবনের প্রায় শেষ সীমায় উপনীত হয়ে বিজয় ভরালীর মনে প্রশ্ন জাগে-শিক্ষার প্রকৃত অর্থ কিঃ জীবনের সঙ্গে নয়—কেবল জীবিকার সঙ্গে সম্বন্ধ যে শিক্ষার, সেই শিক্ষা মানুষের জীবনকে কতটুকু দিতে পারে? ইলার চেয়ে কমলা কত বেশি শিক্ষিতা—কিন্তু ইলা নিজের সামান্য শিক্ষায় জীবনটাকে যেভাবে গড়ে তুলেছিল,তারচেয়ে হাজার গুণে বেশি শিক্ষা পেয়েও কমলা কেন জীবনের কোনো একটি কথায় সেই শিক্ষার আদর্শ না দেখিয়ে কেবল জীবিকার সংকীর্ণ গণ্ডিতে শিক্ষার মহত্ত্বকে বন্দি করে রাখলকিন্তু কমলা কি কখনও সেকথা বুঝতে পারবে?কমলার দৃঢ় ধারণা যে চাকরি না করলে এত লেখাপড়া সব বিফলে যাবে,অথচ অবাক হওয়ার কথা এই যে এত পড়াশোনা করা কমলাকে তিনি কোনোদিন ভালো কোনো বই পড়তে বা পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার চর্চাকে অব্যাহত রাখতে দেখেননি ।




শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পূরবী-৩৬ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী(৩৬) 

অভিজিৎ চৌধুরী।



হুগলির গঙ্গা আর মা যে"ন মিলেমিশে রয়েছে তীর্থের স্মৃতির খাতায়।এখন খুব বিতর্ক হচ্ছে কোন ভাষা ক্লাসিকাল তা নিয়ে।বাংলা ভাষার বয়স অল্প। এছাড়াও সে ভাষার পিতা আছে।গোদা বাংলায় তার নাম সংস্কৃত।

 আসলে তীর্থের নিজের মতোন করে মনে হয় যে ভাষা একটা কূপমন্ডুকতার আবহে নিজেকে গড়ে তোলে তার মৃত্যু অনিবার্য।

জোড়াসাঁকোর বাড়িটা দেখলে তীর্থের বেশ ভয় করে।মনে হয় ওখানে বাইরে আলো গহনে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে একদিন বিলীন হয়েছিলেন নতুন বউঠান।

তীর্থ সংস্কৃত ক্লাস এইট অবধি পড়েছে।ভাষাটা কখনও ভাল লেগেছে কখনও লাগেনি।তার চেয়ে বিজাতীয় ইংরেজি মাতৃভাষার পরেই বড্ডো আপন হয়েছে।

ইংরেজি অনার্সের সময় ভাষাটার প্রতি প্রেম জাগেনি।প্রেম এসেছিল বিশ্ব সাহিত্যের প্রতি যখন সে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ পড়া শুরু করল।

রবীন্দ্রনাথ নানা ভাবে বলেছেন অভিধানকে সঙ্গে করে বিদেশী সাহিত্য বোঝা যায় না।তিনি বরাবরই কল্পনার দ্বারস্থ।

রবীন্দ্রনাথের সুর ও গান নিয়ে তামাশা এই যুগের নয়।সেই যুগেও হয়েছে।তখনও তিনি বিখ্যাত হচ্ছেন।কারা করেছেন তাঁদের নাম করলে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী।ভুল বলল কি তীর্থ!  সব সময় গীতবিতান দেখতে ভাল লাগে না।নিজের অন্তরে একটা ঝংকার তো হয়ই।সে এক নতুন গীতবিতান।

তাই এই সময়ের রোদ্দুর রায় অনুল্লেখযোগ্য।

এই প্রশ্নটা তীর্থকে ভাবিয়েছে, সংস্কৃত সাহিত্য না পড়ে তার কি কোন ক্ষতি হচ্ছে!

কিন্তু সামান্য একজন ডাইরি লেখকের এসবের কি প্রয়োজন!

 অবশ্যই হচ্ছে।সে কালিদাসের অনুবাদ পড়েছে। আর মহাভারত পড়ার চেষ্টা করেছে।

আসলে জীবনের সমগ্রতা আর নিজেকে জানার চেষ্টাও।

 তাই বা কি!

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পূরবী- ৩২ || অভিজিৎ চৌধুরী || একটি অন্যধারার উপন্যাস

পূরবী- ৩২
অভিজিৎ চৌধুরী

জীবনভর আমি বহু তিরস্কৃত হয়েছি।আর আমার ছেলে বলেই রথী সেই তিরস্কারের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেে।সে যখন শক্ত হাতে বিশ্বভারতীর প্রশাসনকে সমর্থ করে তুলতে চাইছে,চারিদিকে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে সকলে।
  যাঁরা আমার সাহায্য নিয়েছেন,তাঁরা কখনই আমার প্রয়োজনে আসেননি।হয়তো আড়ালে আমাকে বিদ্রূপ করেছেন নানাভাবে।
 রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী প্রসঙ্গে এরকমটাই বলেছেন।
 তীর্থ সাধারণ মানুষ হয়ে দেখতে পায় জীবনের মর্ম- কথা ভিন্ন কিছু নয়।
 ওপারের জীবনটাও কি এরকমই!
উত্তর নেই কোন।
 বিশ্বভারতী ঘিরে নানা বিতর্ক।কোন দিক নির্দেশ জানে না।চাকরির শেষটা সে বীরভূম দেখতে চাইবে।স্বপ্নের প্রয়াণ হবে কিনা জানা নেই।
 আর ইচ্ছে-পূরণও হবে না, সে নিশ্চিত জানে।ক্লান্তি বড় গ্রাস করে।রাতে ঘুম হয় না।তখন পূরবী।রাত ভোর হয়।জৈবিক নিয়মে ঘুম যখন আসে ছুটি নেই কোথাও।
 তাই বলে তপস্যা ভঙ্গ হবে কেন!
অবিশ্বাস থাকবে,নৈরাজ্যও থাকবে,তিরস্কার থাকবে।তবুও যাত্রীকে অমৃতপথের অনন্তে ডিঙি বাইতেই হবে।সে এমন তরণী বাওয়া যাতে থাকবে শুধু বিশ্বাস আর ভালোবাসা।
 রথীন্দ্রনাথকে ছাড়তে হয়েছিল বিশ্বভারতী।চলে গেছিলেন উপান্তে।হয়তো সেই যে একলা পথের পথিকের মতোন দুঃসহ যন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করে চলা কোন সাধারণ কর্ম নয়।
 তীর্থও ক্রমশ জীবনকে খেলাঘর হিসেবে দেখেও মনোবেদনার গাঢ়তায় লীন হয়ে যায়নি। নতুন বিশ্বাসে স্থিত হয়েছে।
 ব্যথার কথা ভেসে গিয়ে নয়ন আবার নতুন দুরাশার জন্য উন্মুখ থেকেছে।

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০

পূরবী~ ৩০ || অভিজিৎ চৌধুরী || এক অন্যধারার উপন্যাস

পূরবী~ ৩০
অভিজিৎ চৌধুরী


কাকদ্বীপে তীর্থের ধরা পড়ল প্রস্টেটের সমস্যা।কোলেস্টেরল। ফ্যাটি লিভার।আর সব অনেক কিছু।
 কারুর কথা না শুনে এলেন কালিম্পং। ভাবলেন শরৎকালটা কাটাবেন কারণ নির্জনতা।বড় প্রিয় তাঁর। সেই ছেলেবেলা থেকে।
 বার্ধক্যে এসে জীবন আর অন্তর্মুখী হয়েছে।বহিরঙ্গ আর বিচলিত করে না।শান্তিনিকেতনের কাজ থেকেও মুখ ফিরিয়ে থাকার দিব্যি আনন্দ রয়েছে।পা দুটো বেশ ফুলে উঠেছে।
 প্রতিমা আর নীলমণি রয়েছে।রাতে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।সংজ্ঞা নেই।রথীকে খবর পাঠাতে হবে।পাহাড়ে ঝড় বৃষ্টি ভয়ংকর।সেই রাত যেন কাটে না।
 পাহাড়ের ঠাণ্ডায় সেই ভোরে ওঠা।স্নানও কাকভোরে তবে গরম জলে।নাওয়ার ঘরে এক সময় পুরো গান লিখে গেয়েছেনও।যেমন খুশী অঙ্গভঙ্গী করা যায়,দেখার তো কেউ নেই।  কাকদ্বীপের সেই ডাক্তারবাবু গান গাইতেন।ইউরিম্যাক্স দিয়েছিলেন।খেতে ইউরিনের গন্ধ গেল কিন্তু ভয়ংকর মাথার যন্ত্রণা শুরু হল।
 ভোরে ইউরোপিয়ান ডাক্তার এলেন।এতো অনুপম দেহ সৌষ্ঠব দেখে অবাক হয়ে গেলেন।তারপর বললেন,ওঁকে এখনই নিয়ে যেতে হবে।
 তীর্থের মজা লাগল তাও।রবীন্দ্রনাথ আর সে দুজনেরই প্রস্টেট সমস্যা।অবশেষে একটা মিল পাওয়া গেল।
 দার্জিলিং থেকে ট্রেনে চেপে অচৈতন্য রইলেন।কলকাতায় এসে জ্ঞান এলো কিন্তু বিরক্ত হলেন খুব।তবে রথী এসে দেখালেন আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয়ায় তাঁর ল্যাবরেটারি গল্পটা ছাপা হয়েছে।মন প্রসন্ন হয়ে গেল।তার পাঠালেন অমিয় চক্রবর্তীকে গল্পটা পড়েছো!
 অমিয় চক্রবর্তী লিখলেন,এরকম গল্প লেখা যায়! আপনি যে পাষাণে অমৃত নিয়ে এসেছেন।
 কাকদ্বীপে প্রবল বৃষ্টি হলে বি ডি ও অফিস লাগোয়া মাঠে জল জমে যেত।
 তীর্থের মনে হয়েছিল কিছু কবিগান লিখলে মন্দ হয় না।তবে লেখা হয়নি।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

পূরবী~২৯ || অভিজিৎ চৌধুরী || একটি অন্যধারার উপন্যাস

পূরবী~২৯
অভিজিৎ চৌধুরী


তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনা জালে / হে ছলনাময়ী।
তারপর বললেন,জ্যোতি ডাক্তার আমায় কিছু বললে না।রানী,আমার অপরাশেন কবে! তারপর যেন ভুলে গিয়ে শেষ করলেন হয়তো শেষ কবিতা।
এটুকু বলে থামলেন রবীন্দ্রনাথ। রানী চন্দকে লিখতে বলেছেন।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।জানলা দিয়ে তাকালেন বাইরে।৬ নম্বর জোড়াসাঁকো। অবন কি করছে! রিদয়।ভেবে একটু হাসলেন।
সে পায় তোমার হাতে/ শান্তির অক্ষয় অধিকার।
ললিতবাবু কাছে এসে বললেন,ছোট্ট কাজ, আজই তবে সেরে ফেলি।
চমকে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ।
ছুটি,শমীদের কাছে যাওয়ার পালা এলো।
প্লুতস্বরে ডাকলেন,নতুন বউঠান।আমি রবি।
ইস্ এবারও কিছু হল না।
রবি হতাশ কণ্ঠে বললেন,জানতুম।বিহারীলালের জন্য আমার এই দশা।
খিলখিল করে কেউ যেন হেসে উঠল।
কে!
রানী খাতাটা হাতে বাড়িয়ে দিতে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে সই করলেন।
ললিতবাবু বললেন,মনকে শক্ত করুন।একদম সহজ অস্ত্রোপচার। সুস্থ হয়ে উঠবেন।
রথীন্দ্রনাথকে দেখে বললেন,মণি কেমন আছে!
রথী বললেন,জ্বর কমছে।
মুখে বলতে পারলেন না,সে আসবে কবে!
একা একা ছাদে ঘুরছেন আর গন্ধ পাচ্ছেন নতুন বউঠানের।তুমি কোথায়!
রথীন্দ্রনাথ বললেন,বাবামশাই,সবাই আসবেন।
ললিতবাবু বললেন,কবি খুব সাইকোলজিক্যালি উইক।
বলতে পারলেন না,তবু মনে হল- ছুটি নেই তো তাই তিনি একা।
রথীন্দ্রনাথ বললেন,তিনি বলতেন- আমি প্রকৃতির সন্তান।ঝরা পাতার মতোন ঝরে পড়তে দাও।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২০

পূরবী- ২৬ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী-২৬ 
অভিজিৎ চৌধুরী



ফেলুদার ছিল সিধু জ্যাঠা।আর তীর্থের কান্তিদা।অন্তত তীর্থের মতোন ছাপোষা মানুষ যাঁরা ইহজীবনে রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ দেখেনি,কান্তিদা অবলম্বন।

আবার বানান বিভ্রাটে পড়ল হুগলির সমীরদা। সরকারি চাকরি করে  মোটামুটি মাইনে পেয়ে হঠাৎ মধ্যবয়সে দিনলিপি কেন!

চাকরির সত্তাটা ভেসে বেড়াতে জানে।সে ডুব দেয় না।সে নিরপেক্ষও বটে।সে ডানেও নেই বামেও নেই।পুরস্কার তিরস্কারে সমান নিস্পৃহ।

কখনও খুব ভোরে উঠলে মনে হয় দিনলিপির তীর্থ আর আমি দুজন আলাদা।সেই কারণে পূরবীর শুরুর আমি বদলে যায় তীর্থের নতুন পেশাকে।রোদের তাপ তীব্র হলে তীর্থ পালিয়ে যায়,তখন শুধুই আমি।

বানানের বরাবরের শিক্ষক প্রভাত চৌধুরী মহোদয় ভুল ধরেন বা আশা ছেড়ে দিয়েছেন এই ভেবে ঘোড়াকে জলের পাত্র অবধি নিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু খাওয়ানা তো যায় না।বানানের ভয়ে কবিতা লেখা হল না তীর্থের।

দিনলিপি তার অন্বেষণ, রবীন্দ্রনাথ উপলক্ষ মাত্র।একে তীর্থ নতুন নাম দিল ইদানিং নভেলা।অন লাইনে পড়ার জন্য একটা কৌশল।তুমি সিরিয়াল দেখো,ফাঁকে দু দণ্ড আমাকেও দেখো।

বার্লিনে রবীন্দ্রনাথ গেছিলেন আইনস্টাইনের কাছে।নীল জোব্বায় বেশ লাগছিল।আর আইনস্টাইন কোঁচকানো কোট। এলোমেলো চুল।এলিসা কফি আর কেক খাওয়ান।রিয়েলিটি অ্যান্ড ট্রুথ।দুজনেই একজন আরেকজনের কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন, না হলে ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ বারবার খুঁজছিলেন সত্য ও বাস্তবের ঐকতানকে।অরণ্যের নিবিড়তায় তিনি বুঝতে চেষ্টা করছিলেন বিজ্ঞান কোন সত্যের কথা বলছে।

তীর্থের মনে হল হঠাৎ মেয়েলি চুল যে কবির যৌবনে ছিল,কেন! নারী সত্তা বোঝার জন্য!

আরেকদিনও এলেন তিনি।সেদিন আলোচনায় ছিল সংগীত।

ঘুম পাচ্ছে কিন্তু ঘুম হবে না।তীর্থ বড্ডো জ্বালাচ্ছে।সে সারা রাত জাগবে বলেই এখন বিদায় নিতে চাইছি।

অনেকবার রবীন্দ্রনাথের সকণ্ঠের গান শুনেছে তীর্থ। কেমন যেন মেয়েলি।

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২০

পূরবী~ ১৮ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী~ ১৮
অভিজিৎ চৌধুরী



ইন্দিরা রাণু মৈত্রেয়ী কেউ যেন বড় হয়নি তাঁর কাছে।সময় থমকে গেছে।সেই কিশোরী কণ্ঠস্বর এখনও যে ভাস্বর।

 অঙ্গীরার ছবিটা দেখে অবাক হয়ে গেল তীর্থ। কতো বছর পর দেখল সে।এতো বড় হয়ে গেছে।দুধ খেয়ে পেটটা সামান্য ভরে গেলই তাকাত তীর্থের দিকে।এবা সে পিসুর সঙ্গে নিরুদ্দেশে যাবে।অটোতে উঠল সামান্য ঝাঁকুনিতে ঘুমিয়ে পড়ত শিশু।গলাটা জড়িয়ে ধরে রাখত শিশু।বাইরের পৃথিবীতে তীর্থই তো তার পরম বন্ধু।

বউমা প্রতিমাও যেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া কন্যা।কখনও কখনও মনে হয় তিনি যেন বড় হতে চাননি কখনও।ডাকঘরের অমলের মতোন তিনি জানলা দিয়ে আশ্বিনের রোদ৷ দেখছেন।অপেক্ষা করছেন রাজার চিঠির।

 লন্ডনে সতের বছর বয়সে বউঠানের স্নেহাশ্রয়ে সেই যে তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে সরস রসিকতা জীবন জুড়ে রয়ে গেল।

 পশ্চিম জানেনি তাঁকে।তিনি সেখানে এশিয়ান সেইন্ট।বিষাদটা রয়ে গেল।তারপরই ভেবেছেন,নিজেকেই বা জানা হল কোথায়!

একবার কলকাতা বইমেলায় সামান্য একটা বই বেরিয়েছে সেবার তীর্থের।অঙ্গীরা তখন ক্লাস সেভেনে।বইমেলায় তন্ন করে খুঁজেছিল পিসুর বই।তোর পিসু কে- রে।ছোট্ট শিশু বলত- ভূতুম।

জ্যোতিদাদা সেদিন এলেন।বললেন,রবি,তুমি তো এখন বিশ্বখ্যাত।প্রণাম করলেন।চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছিল তাঁর।সস্নেহে আলিঙ্গন করলেন তখন।বললেন,আব্দুল মাঝি এই কিছুদিন আগে মারা গেলেন।তুমি বলতে,আব্দুল মাঝির ছুঁচোলো দাড়ি।

বারবার মনে হয় এ কেমন আত্মখণ্ডন।কি দরকার ছিল খ্যাতির।

রবীন্দ্রনাথ বললেন,আপনি একটা ছবি এঁকেছিলেন।

শুধু যদি যাঁরা ছিলেন দিনের আলোর মতোন ভাস্বর,অমলের কাছে আবার যদি ফিরতো তারা।

দইওয়ালার সেই সুর জানা হল না যে।

তবুও অধ্যাপিকা শাশ্বতী ক্লাসশেষে ছাতিম গাছের তলায় বসে দেখে পূরবী।গানের সুর প্রদোষকালের রাগের সঙ্গে মিশে যায় আর সে বলে, অমল,আমি যে তোমার সুধা।।

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

পূরবী~ ১৭ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী~ ১৭
অভিজিৎ চৌধুরী











বিবেকানন্দ নিবেদিতাকেবলেছিলেন এই মঠে ভারতবর্ষ সীমাবদ্ধ নয়।ভারতবর্ষ অনেক বৃহৎ। সে পথ দেখাতে পারে পাশ্চাত্যকে দর্শন ও ধর্মের সহজাত ব্যাখ্যায়। ঠাকুর বলেছিলেন,নিজেকে যেদিন জানবি নরেন,আর তুই থাকবি না সেদিন।


নিজেকে জানা আমার ফুরালো না।গানে সুরে ঠাকুরবাড়ির রবি কলকাতা শহর মাতাচ্ছেন।আর তাঁর চেয়ে ২ বছরের ছোট নরেন পঞ্চবটীতে শোনাচ্ছেন গান।কে জানত সেই গান একদিন এতোটা মর্যাদা পাবে।তোমারেই করিয়াছি জীবনেরই ধ্রুবতারা।যুক্তিবাদী নরেনের হাজারো সংশয়।কে ইনি! সত্যি কালী মূর্তি হয় কি করে!

তীর্থ ভাবছিল, দিনলিপিতে যখনই রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ এসেছেন তাকে কিছু ভাবতেই হয়নি।ভাল মন্দ যাই হোক দুটো স্রোতস্বিনী নদী বহতা থেকেছে।বিপ্রতীপ দর্শনের সাদৃশ্য কোথায়! তার নাম ভারতবর্ষে।

আবার তিনি যখন হাত দিয়ে খান,ভারতবর্ষের আত্মীকরণ হয়ে যায়।প্লেগে যখন সেবা করেন বস্তির মানুষদের।রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা রাখা ছাড়া আর কিছু করছেন না।

জীবনকে বাইরে থেকে দেখা না অন্তঃস্থলে যাওয়া - কোনটা জরুরি!
যেতে হবে এবার।
 মৃত্যুর দিনও জমিয়ে ইলিশের নানা পদ খেলেন।জমিয়ে আড্ডা দিলেন।পড়াশুনা করলেন।তারপর গেলেন ঠাকুরের কাছে একান্তে।

তীর্থের হাসি পায়,দিব্য খোশগল্প করে বাড়িতে থেকে মানুষ যখন দোষারোপ করে।সময় কোথাও একি!
রইল বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন।

বাড়িতে ব্রাহ্মধর্মের চর্চা হয়।কিন্তু তিনি ব্রাহ্মদের সবটুকু মানেন না।প্রেম আর ঈশ্বর আলাদা কোথায়!
নিবেদিতা কথায় কথায় নম শিবায় বলছেন।ভাল লাগছে না রবির।ভদ্রমহিলা ম্যানিয়াক।

মৃত্যুভয়কে কতোবার বিনির্মাণ করছেন রবীন্দ্রনাথ। শেষের দিনগুলিতে এলে দেখা যায়,জয় তো করেননি!
বাইশে শ্রাবণে রবি রওনা দিয়েছিলেন অচিন দেশে।পাড়ে রইল ভগ্নতরী।

জানে না তীর্থ।

আর বিবেকানন্দ- স্বামীর নিবেদিতা।আর বেলুড় মঠ।সকাতরে কোথাও পিতা কাঁদছেন।ভুলক্রমেও কি আসবেন সেই অমৃতের পুত্ররা।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

পূরবী~ ১৫ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী~ ১৫
অভিজিৎ চৌধুরী

শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ, পথে পথে।
আপন মনে অনেকদিন পর গাইছিল তীর্থ।হচ্ছে না,লীনা বলল।
যদুভট্ট বালকদের কানাড়া রাগ শেখাতে চেয়েছিলেন।কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনও গণ্ডিতে নিজেকে বাঁধতে চাননি।
প্রমথ চোধুরী এসেছেন অনেকদিন পর।সঙ্গে ইন্দিরা।রবীন্দ্রনাথ বললেন,ওস্তাদ সেরারা বলেন,আমার গান কবির গান,তাতে সুরের বৈচিত্র্য নেই।তোমরা কি বলো!
গান যে তাঁর কতো প্রিয় ইন্দিরা জানেন।বললেন,স্বরলিপি সংরক্ষণও তো হচ্ছে।থাকবে তোমার গান।
আজ যেন তাঁর সংশয় কাটছে না।এখনও বিদ্বজনের সভায় তাঁর গান অপাংক্তেয়।ব্রাহ্ম মন্দিরে তিনি গ্রহণীয়।কতো কথা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও বলে গেলেন।ক্ষমা কি তিনি করতে পেরেছেন!
না,না,না।এ যেন তিন সত্যির মতোন বুকে বাজে।
রবীন্দ্রনাথ বললেন,স্বরলিপি দিনুর সৃষ্টি।আমি তো বলিনি স্বরলিপি মেনে গাইতে।আমি বললুম,আমার ধন তোমায় দিলুম,অনাদর করো না।
প্রমথ বললেন,সজনীকান্তবাবুকে আপনার কিছু বলা দরকার।
আমার ভাবনা ওতে ক্লিষ্ট হবে।ব্যথা আমারি বাড়বে।
আসলে যদুভট্ট মস্তো গায়ক ছিলেন।কালোয়াতি কিছু মন দিয়ে যদি নিতুম,ওস্তাদেরা এমন অনাদর করতে না।
 ইন্দিরা বললেন, তোমার কি কোন সংশয় হচ্চে!
 যৌবনে তো আপনি গান গাইতে আসতেন।আমি গেচিলাম দেখতে।
হাসলেন রবীন্দ্রনাথ। বললেন,সে রহস্য আমি জানি।শ্রবণসুখের চেেয়েও আমার সহচরীটি তোমায় টেনেছিল অধিক।
 প্রমথ এবার প্রসঙ্গান্তরে গেলেন।বললেন,জগদানন্দবাবু সত্যি একজন জিনিয়াস।
 প্রমথের মুখ রাঙা হয়েে উঠল।
 রবীন্দ্রনাথ বললেন,অংকের মানুষ।আমার তো মনে হয় অংকের সঙ্গেও কল্পনার যোগ করে নতুন কোন শাস্ত্র এলে মন্দ হয় না।

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

পূরবী~ ১৩ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী~ ১৩
অভিজিৎ চৌধুরী



এমন অনুর্বর হয়নি কখনও তাঁর সৃজনভূমি। গান লেখা যেন শেষ হয়ে এলো।দিনু যতোদিন ছিল সংগীত ভবন মুখরিত থাকত।নাটমঞ্চেও সে ছিল রাজা।গায়ক আগেই গেছিল,এখন যেন গীতিকারও বিদায় নিলো।স্বরলিপি তিনি কখনও লিখতে পারতেন না।শুরুতে লিখতেন জ্যোতিদাদা,ইন্দিরা আর অনেকে।তারপর দিনু এসে একাই সামলে নিলো স্বরলিপির ঝক্কি।স্মৃতিশক্তিও ছিল অসাধারণ। কিছু একবার শুনলে ভুলতো না।


প্রিয়জনের চলে যাওয়াতেও গান কখনও তাঁকে ছেড়ে যায়ইনি। কন্যা মাধুরীলতা দীর্ঘ রোগভোগের পর মারা গেলো।মন বড় পীড়িত।অন্ধকারে চুপচাপ বসে আছেন।তারায় আকাশ ছেয়ে রয়েছে।দিনুর ঘর থেকে ছেলেদের গান শেখার শব্দ পান তিনি।দ্বারিক গৃহে থাকত দিনু।এখন সে ঘর শূন্য দেখে দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে অজান্তেই।দেহলিতে গিয়ে থাকলে দিনুর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হতো।


মাকে দাহ করে তীর্থ বেদনা অনুভব করেছে কিন্তু পারলৌকিক ক্রিয়ার উপাচার,বিধি সেই শোক যেন শিথিল করে দিয়েছিল।

বাবার বেলা অফিসে যেতে হতো।লৌকিক ক্রিয়া আসল বেদনাকে ঢেকে দেয়।

কান্না আসে অবদমিত স্মৃতি থেকে।সে যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই,এতো বড় আত্মখণ্ডন!

ছিল আর ছিল না এই মস্তো ফাঁকের মাঝখানে জীবন তার আপন বেগে চলেছে।যেন মানুষের যাওয়া আসা দিনরাত্রির খেলা।কতো রাতে তীর্থ দেখেছে মৃত মানুষেরা প্রিয়তমরা তার চারপাশে এসে বসেছে।সেই হাসি, সেই কলহাস্য।

কামুর আউটসাইডারে এক নিরপেক্ষ শোকহীনতায় আচ্ছন্ন ছিল নায়ক।তার মধ্যে বেদনা ছিল নিশ্চয় কিন্তু যেন আলাদা আরোপিত কিছু নয়।তাই হয়তো মাধুরীলতার মৃত্যুতেও শান্তিনিকেতনের শারদোৎসব বন্ধ করেননি।যদিও সেবার জমলো না।

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

পূরবী~ ১২ || অভিজিৎ চৌধুরী || ধারাবাহিক উপন্যাস

পূরবী~ ১২
অভিজিৎ চৌধুরী

পুরোনো একজন বন্ধু বলল,তুই যে লিখিস ত- তো জানতাম না।
তীর্থ বলল, দিনলিপি লিখি।
হাসল সে।রবীন্দ্রনাথের বিনির্মাণ!
চমকে উঠল তীর্থ। বলল, একেবারেই না।আমি কখনও কঠিন বই পড়তে পারিনা।।সহজ ভাবেই ভাবি।আর সেখানে রবীন্দ্রনাথ আসেন।অলেখককে লেখক তিনিই নির্মাণ করেন।
সে বলল আবার,তবে রবীন্দ্রনাথ বেশী এলেই ভাল হয়।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পড়ার সময় একজন বন্ধু ছিল।নাম রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। কালো,মুগুভাজা চেহেরা।খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসত।ইংরেজি সাহিত্যে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল কিন্তু রেজাল্টে রবীন্দ্রনাথ তেমন আশানুরূপ কিছু করতে পারত।সে তীর্থকে বলত,তোমার মধ্যে লেখক সত্তা আছে।
চুপ করে রইল তীর্থ।সব অন্তর্লীন ভাবনা মুখে বলা যায় না।যিনি প্রশ্ন করছেন,তিনিও বলতে পারছেন না।
সেই রবীন্দ্রনাথ সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়েছে।খুব দেখতে ইচ্ছে করে।স্বপ্নে সে মাঝেমাঝে উঁকি দেয়।
একদিন রবীন্দ্রনাথ বললেন,তুই নাকি কাজ আর কর্তব্য দুটোকেই রসের ভিয়েনে মজিয়ে রাখিস,সত্যি!
দীনেন্দ্রনাথ বানানটা বদলে করলেন দিনেন্দ্রনাথ।ডাকতেন দিনু বলে।
তখন একজন বললেন,গুরুদেব,আপনার দিনু উৎসব- রাজ।
দিনু মৃদু হাসতে থাকলেন।
হো হো করে হেসে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও উচ্চকিত হাসি তাঁদের ব্রাহ্ম পরিবারের নয়।কবি নবীন সেন এই নিয়ে তাঁকে খোঁচাও দিয়েছেন।তখনও তিনি তরুণ।শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করছেন।
তারপর নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বললেন,অবনের তো স্মৃতিরেখাও ছবিরেখার মতোনই।সে সেদিন বলচিলে,দিনুর বয়স তখন সবে তিন পেরিয়েছে।বাল্মিকী প্রতিভায় সে এলো তার পোষা টাট্টু ঘোড়া নিয়ে।সেই ঘোড়ার পীঠে শিশুর যাবতীয় লুঠের মাল।সংলাপ ছিল না অবিশ্যি।
দিনেন্দ্রনাথ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...