বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন
হোমেন বরগোহাঞি
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)
বার
(১২)
আমেরিকার স্বাধীনতা
১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার প্রায় একশত আঠাশ বছর পরে একশো দুই জন ইংরেজ পুরুষ এবং মহিলা সেই নতুন মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে ‘মে ফ্লাওয়ার’ নামের একটি জাহাজে উঠে আমেরিকায় যাত্রা করে। ইতিহাসে তাঁরা পিলগ্রিম ফাদারস নামে পরিচিত। ষোলো এবং সতেরো শতিকায় ইংল্যান্ডে একটি ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিছু গোঁড়া খ্রিস্টান ইংল্যান্ডের প্রচলিত ধর্মব্যবস্থা এবং গির্জার বিরোধিতা করে সেগুলির আমূল সংস্কার দাবি করেছিল। গির্জার শুদ্ধিকরণ চাওয়া এই লোকদের পিউরিটান বলা হয়। কিছুদিনের জন্য তাঁরা ইংল্যান্ডের শাসন ক্ষমতাও দখল করেছিল। কিন্তু তুমুল যুদ্ধ– বিগ্রহের শেষে তাঁদের সেই ক্ষমতা হারাতে হয়। তখন ইংল্যান্ডের প্রচলিত ধর্মব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন বলে মনে হওয়ায় একশত দুইজন পিউরিটান নতুন দেশে নতুন জীবন আরম্ভ করার জন্য আমেরিকার উদ্দেশ্যে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তাঁরা গিয়ে আমেরিকার উপকূলে উপনীত হয়। আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত স্থাপন করা প্রথম দলটি ছিল এই ১০২ জন পিলগ্রিম ফাদার্স।
পিলগ্রিম ফাদার্সের অনুকরণ করে তারপরেও ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে মানুষ আমেরিকায় যেতে শুরু করে। কালক্রমে তাঁরা প্রায় এক হাজার মাইল ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে তেরোটি উপনিবেশ স্থাপন করে। বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে একটি অচিন- অজান মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার জন্য এগিয়ে আসা এই মানুষগুলির স্বভাব ছিল অতি দুঃসাহসী এবং কঠোর পরিশ্রমী। একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিকের ভাষায় বলতে গেলে সেই দিনে ভীরু এবং অলস প্রকৃতির মানুষ মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার কথা কল্পনাই করতে পারত না। নতুন মহাদেশের সব সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আত্মরক্ষা করা প্রয়োজন হওয়ার ফলে তাদের পরিশ্রম শক্তি এবং আত্মনির্ভরশীলতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ইংরেজরা আমেরিকায় স্থাপন করা তেরোটি উপনিবেশ প্রথম অবস্থায় ইংল্যান্ডের রাজা এবং সংসদের অধীন ছিল। কিন্তু উপনিবেশকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। স্বাধীনচেতা এবং আত্মবিশ্বাসী উপনিবেশকারীরা চিরকাল অন্যের আজ্ঞাকারী হয়ে থাকার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশে যায়নি। অন্যদিকে আমেরিকা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে থাকা ইংল্যান্ডের শাসক চক্র উপনিবেশকারীদের আবেগ অনুভূতি বুঝতে পারেনি বা বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। ফলে কিছুদিনের মধ্যে উপনিবেশকারীরা এবং তাঁদের পূর্বের স্বদেশ ইংল্যান্ডের মধ্যে মনোমালিন্যের সূত্রপাত হল।
ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট তথা সংসদে উপনিবেশকারীদের একজনও প্রতিনিধি ছিল না।অথচ সংসদ উপনিবেশকারীদের ওপরে একের পর এক করের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের আপত্তি এবং অসন্তোষের এটাই ছিল প্রধান কারণ। তারা এই বলে ধ্বনি তুলেছিল যে ইংল্যান্ডকে যে সংসদে উপনিবেশকারীদের একজনও প্রতিনিধি নেই সেই সংসদের উপনিবেশকারীদের ওপরে কর বসানোর কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
কিন্তু ইংল্যাণ্ডের সংসদে উপনিবেশকারীদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর কোনো প্রয়োজন অনুভব করল না। বরং তারা আমেরিকায় আমদানি করা চায়ের ওপরে কর লাগিয়ে আগুনে ঘি ঢালার ব্যবস্থা করল। উপনিবেশকারীরা অনুভব করলেন যে ইংল্যান্ডের রাজা এবং সংসদের এই কার্য তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে; অর্থাৎ প্রতিবাদ করার সময় উপস্থিত হয়েছে। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কয়েকটি জাহাজ বোস্টন বন্দরে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন উপনিবেশকারী রেড ইন্ডিয়ানের ছদ্মবেশ ধরে জাহাজে উঠল এবং ৩৪০ টি চায়ের বাক্স সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমেরিকার ইতিহাসে বস্টন টি পার্টি নামে অভিহিত এই ঘটনাটি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের বিদ্রোহ সূচনা করল।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উপনিবেশকারীদের আসল যুদ্ধ আরম্ভ হল ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে। এই যুদ্ধ সাত বছর ধরে চলেছিল ।সমস্ত উপনিবেশকারীরাই যুদ্ধ তথা স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিল এরকম নয়। নগরে বাস করা বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ইংল্যান্ডের রাজার প্রতি অনুগত ছিল এবং স্বাধীনতার দাবির বিরোধিতা করেছিল। এমনকি যে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি অতি মহত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনিও বহুদিন পর্যন্ত উপনিবেশকারীদের স্বাধীনতার দাবি সমর্থন করেন নি। তিনি ইংল্যান্ডের সঙ্গে একটা বোঝাবুঝিু এবং আপোষ হওয়াটা চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার দাবির সমর্থকরা ছিল নিজের সংকল্পে অটল। তাঁদের ভাগ্য ভালো যে তাদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন জর্জ ওয়াশিংটনের মতো একজন জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং চরিত্রবান মানুষ। প্রধানত তার বিচক্ষণ নেতৃত্বের ফলেই সামরিকভাবে দুর্বল উপনিবেশকারীদের পক্ষে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করা সম্ভব হল। আমেরিকার স্বাধীন হওয়ার পরে সেই নতুন রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন জর্জ ওয়াশিংটন।
কিন্তু নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করার জন্য যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার উপনিবেশকারীদের ধৈর্য ছিল না। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার এক বছর পূর্ণ না হতেই ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে প্রতিটি উপনিবেশের নেতৃ স্থানীয় লোকরা তাঁদের সামগ্রিক সমস্যা গুলির বিষয়ে আলোচনা করার জন্য বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের শহর ফিলাডেলফিয়ায় সমবেত হলেন। একনাগারে কয়েক সপ্তাহ আলোচনা করে তাঁরা অবশেষে ১৩ টি উপনিবেশ একত্রিত করে একটি স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার জন্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হল। আধুনিক বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করা এই ঘোষণা পত্রটি রচনা করেছিলেন টমাস জেফারসন। তিনি পরবর্তীকালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও হয়েছিলেন। তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতিদের ভেতরে তাকেও একজন বলে ধরা হয়।
আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার সুদূর প্রসারী তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে হেন্ড্রিক উইলিয়াম ভেন লুন তার ‘মানবজাতির কাহিনি’(The Story of Mankind ) নামের বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন–’ বন্দুকের যে গুলি লেক্সিংটনের যুদ্ধ আরম্ভ করেছিল, সেই গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল পৃথিবীর সর্বত্র। কথাটা কিছুটা অতিরঞ্জিত হল। চীন জাপান এবং রাশিয়ার মানুষ এই গুলির শব্দ শুনতে পান নি। কিন্তু এই গুলির শব্দ আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে ইউরোপের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বারুদ স্তূপ স্পর্শ করে সেখানে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। বিশেষ করে ফ্রান্সে যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সেই বিস্ফোরণ পেট্রোগ্রাড থেকে মাদ্রিদ পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ কাঁপিয়ে তুলেছিল। তার ফলস্বরূপ হওয়া বিশাল ধ্বংসস্তূপের নিচে চিরকালের জন্য সমাধিস্থ হয়ে গিয়েছিল পুরোনো রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি এবং পুরোনো কূটনীতি।’
.jpeg)












