শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

কিছু বই কিছু কথা - ২০৫ || নীলাঞ্জন কুমার শিরোনাম নেই শিরোপাও || সুবোধ সেনগুপ্ত || সাংস্কৃতিক খবর ত্রিশ টাকা ।

 কিছু বই কিছু কথা - ২০৫ ||  নীলাঞ্জন কুমার




শিরোনাম নেই শিরোপাও || সুবোধ সেনগুপ্ত || সাংস্কৃতিক খবর  ত্রিশ টাকা ।



এমন কিছু কবিতার বই প্রকাশ করা হয় যার সব কবিতা মাথার ওপর দিয়ে যায় । অপরিপক্ক ছন্দের যন্ত্রণা বিঁধে থাকে বইটির শরীরে। যা মনে এলো তাই লিখবো এই চিন্তাভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠা বই পড়া যে কি কষ্টের তা কবিতাপ্রেমী বেশ বোঝেন।তবু অভ্যাসবশতঃ
পাঠক পড়েন ' পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন 'চিন্তা ভাবনার কারণে । অবশ্য সুবোধ সেনগুপ্ত তাঁর কাব্য প্রয়াস ' শিরোনাম নেই শিরোপাও ' তে  নিজেই যখন অক্লেশে বলেন : ' আমি যা লিখি তা কেউ বুঝতে পারেন না । এলেবেলে লেখা । অপরিপক্ক ছন্দ ও তার ব্যন্ঞ্জনা । কারো কারো মতে একটু ধ্যান দিলে কবিতা হয়ে যেতে পারতো । যাঁরা বলেন তাঁরা কিন্তু সকলেই কবিতার আসরে নামজাদা । ' তখন এই সত্যকথনকে হাত তুলে সমর্থন জানাতেই হয় । কারণ ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত উক্ত গ্রন্থটির ১৫২ টি কবিতার মাথামুণ্ডু না বুঝলেও তার ভেতর বেজে ওঠার মতো ব্যন্ঞ্জনাটুকু বিন্দুমাত্র নেই ।  ' এতেই কি পাড়ি দেবে অন্যজন কোথায় শ্রবণ/  নীলশূন্যে চেয়ে দেখে নীলের মমতা বন্দি সে ।' ( ' নীলের মমতা বন্দি '),' কেউ এসে গেছে কি লামাকে/  খবর খুঁড়ে তুলে? '( খুঁড়ে)  , ' পাঁচ তারা জ্বলে ওঠে/ অহ্ন ঘেঁটে নিজস্ব ধারায়? ' ( ' ষাট বৎসর পূর্তি উৎসব ')কবিতা পংক্তি পড়লে মাথা আগডুম বাগডুম করে ,তবে পুরো বইটি পড়ার পর পাঠকের কি ঘটতে পারে তা ভেবে আতঙ্কিত হই ।
         সত্তর দশকের একশ্রেণীর কবি বাংলা সাহিত্যে দুর্বোধ্য কবিতার যে চল করেছিল,  বর্তমানে তা প্রায় নিশ্চিহ্ন । কারণ মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া কবিতা মানুষ কিছুতেই পছন্দ করেন না তা আমরা দুর্বোধ্য যুগের মাধ্যমে শিক্ষালাভ করেছি । আবার যাঁরা কবিতা
শীর্ষশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেন এই ' যা খুশি তাই 'কবিতা তাঁদের খুশি করে না । আর ' আমার কবিতা খুব খারাপ ' বলে এই কবির মতো যারা প্রকাশ্যে আহ্লাদ করে নিজেকে নিয়ে,  তাদের কবিতা প্রকাশক বের করতেই পারেন কিন্তু তা পোকায় কাটবে বলা বাহুল্য ।তপন আদিত্য- র প্রচ্ছদটি সামান্য হলেও অন্য ধরনের ।

তিনটি কবিতা || ফটিক চৌধুরী

তিনটি কবিতা

ফটিক চৌধুরী




ভালো-বাসার বারান্দাা


আজ ভালো-বাসার বারান্দাটা খুলে দেখি

চারিদিক শুনশান। নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে

চারিদিকে।দূরে দেখা যায় ধূসর গাছপালা

কতো কিছু বলা হয়েছে এই বারান্দা থেকে।

মানবিক, মানবচেতনার রূপ, আরও কতো...


বলে গেছো লাঞ্ছিত মেয়েদের কথা, তাই

মাঝে মাঝে খুলি এই ভালো-বাসার বারান্দা

স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে...

একটা বছর কীভাবে যে পেরিয়ে এলাম !


তুমি বলে গেছো 'সই' পরিবারের কথা

পরিবারের প্রত্যেকের কথা এক এক করে,

তা এই ভালো-বাসার বারান্দা থেকেই।

তুমি তো এসব নিয়েই বাঁচতে চেয়েছো,

চেয়েছিলে, তাই মাঝে মাঝে খুলি,

ভালো-বাসার বারান্দা

যেখানে নির্মেদ স্মৃতি ভর করে থাকে।

(** ৭ নভেম্বর নবনীতা দেবসেন এর প্রথম প্রয়াণ দিবস)


নবান্ন



বর্ষায় দেখেছ ধানশিশু

শরতে তার যৌবনের দোলা

হিল্লোলে ভরে যায় সবুজের সজীবতা।

ধানের শিষে দেখ কৃষকের হাসিমুখ

দুধে ভরে ওঠে প্রতিটি ধানের গর্ভ।


আদর মাখামাখি হয়ে সোনালি রোদে

শুয়ে থাকে সোনালি ধান, হেমন্তে

ভরে ওঠে কৃষকের নিকানো খামার


ধান্যসুখে এবার নবান্নের সুবাস।



মেঘ পর্ব



দিনগুলোকে এত এলোমেলো করে রেখেছ

তাকে কিভাবে সাজাই ?

কোন দশক দিয়ে সাজাব ?

কখনও যুক্তির দশক কখনও মুক্তির

অথচ মুক্তি তো হলই না

সেই খাঁচায় বন্দি রয়ে গেলে !


যখন ভাবছ এবার বুঝি মুক্তি এলো

আকাশ ডাকছে, বাতাস বইছে দখিনা

মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে, আহা আনন্দ....

তাদেরকে কে আর আটকায় !


জীবনের পর্বকে ভাগ করতে করতে তুমি

যেতে চাও মেঘেদের রাজত্বে ? তাহলে

এলোমেলো দিনগুলো মেঘপর্বে সাজাও।

শব্দব্রাউজ- ২৭ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ- ২৭ । নীলাঞ্জন কুমার



তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন ২৬। ১১।২০২০ সকাল ৮টা ৪৫মিনিট । আজ প্রাত্যহিকতার ভেতর সামান্য বৈচিত্র্য । আজ হরতাল । রাস্তায় গাড়িঘোড়া অনেক কম । স্তব্ধতার ভেতর থেকে আসে কবিতার শব্দসূত্র । তখন আনন্দ বোধ হয় হাজার গুণ ।


শব্দসূত্র  : এইতো আমার অঙ্গভূষণ


এইতো আমাদের জীবন,  অস্থির ও ভাবনাবহুল । কখনো ভেতরে কবিতা, কখনো হরতালের রাস্তাঘাটের ভাবনা । হরতালের কথা এলেই ছুটে আসে রাজনীতি , তারপর দুর্নীতি,  তারপর কুৎসার বক্তৃতা । সুতরাং এইতো আমাদের জীবন মেঘ -রোদের । ঘোড়েল মানুষের থেকে সরে থাকার ভুল সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞতাচ্যুত করে । যত অভিজ্ঞতা তত সতর্ক । আমায় কে যেন টেনে রাখে ।


' আমার জীবন পাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী ' কে দান করবে?
জানি না । তবে ভোটের প্রতিশ্রুতির বাহার কিন্তু মনে তা ধিন ধিন করে নাচবে তা অবশ্যম্ভাবী ।


তাহলে আসুন সব নির্বুদ্ধিতা সব ধাঁধালো ইঙ্গিত আমরা অঙ্গভূষণ করি । আসুন হরতাল করি । ফাঁকা রাস্তায় ফুটবল খেলি ।

একজন বুড়ো মানুষ-৪ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অনুবাদ~বাসুদেব দাস,

একজন বুড়ো মানুষ

নিরুপমা বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~ বাসুদেব দাস,




 (৪)


এতদিন যে মানুষ চাকরি জীবনে তার উপরওয়ালা হয়ে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে এসেছে,তারপর

প্রতি স্নেহ ভালোবাসা জন্মানোয় তাকে নিজের বাড়িতে সাদর আমন্ত্রণ করে এনেছে ,আজ সেই

মানুষটির মেয়ের পাণিপ্রার্থী হয়ে খোলাখুলিভাবে তাকে আবেদন জানাতে হওয়ায় বিজয় যেন লজ্জায়

মরে যাবে,কিন্তু তার বিয়েতে যখন দুর্ভাগ্যক্রমে তাকে নিজেই নিজের অভিভাবকের ভূমিকা পালন

করতে হচ্ছে ,এর বাইরে তার আর কোনো উপায় ছিল না।

সেদিন এসব বলেই কিন্তু বিজয় দ্রুত আরও একটা কথা তার সঙ্গে যোগ করেছিল,কারণ সে

বুঝতে পেরেছিল তার এই উত্তর ইলার পিতাকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে ফেলেছে ;কারণ ইলার পিতার

বক্তব্য সে অমোঘ যুক্তিতে খণ্ডন করার পরে তাঁর মনে তৎক্ষণাৎ আর কোনো কথা না আসাটাই

স্বাভাবিক। তাই বিজয় পুনরায় বলল,এবার তার কণ্ঠস্বর আবেগে,সততা এবং নিষ্ঠার ভারে ভারী হয়ে

প্রকাশ পেল—‘আপনি এখন কী বলবেন জানি না,আপনারা সম্মতি দেবেন কিনা জানি না,কিন্তু একটা

প্রতিশ্রুতি আমি এখনই আপনাদের দিয়ে রাখছি--ইলাকে আমি শ্বশুর বাড়ির স্নেহ ভালোবাসা থেকে

বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হলেও ,তার সেই দুঃখ ভুলিয়ে দেবার জন্য আমি আশ্রাণ চেষ্টা করে যাব। আমার

পরিবারের স্নেহ ভালোবাসা না পেলেও একটা ছোট্ট সুখী গৃহকোণ তাকে আমি এভাবে তৈরি করে দেব যে

ইলা কখনও শ্বশুরবাড়ির স্নেহ ভালোবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত ভাবার অবকাশই পাবে না।’

আজ বিজয় ভরালীর সেদিনের কথা মনে পড়লে তার লজ্জা হয়,কত আবেগ ঢেলেই না সে

কথাগুলো বলেছিল,হয়তো দৃশ্যটা বড় নাটকীয় হয়ে পড়েছিল কিন্তু সত্যিই তো আর সেদিন নাটক করার

জন্য কথাগুলো বলেনি,প্রাণের সমস্ত নিষ্ঠা ঢেলে দিয়ে সে কথাগুলি বলেছিল। আজ সেসব ভেবে ভেবে

বিজয় ভরালীর ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—একদিন যা এত সত্য ছিল আজ যে

কীভাবে সেই সমস্ত কিছু এত অবাস্তব স্মতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

তার কথা শুনে রোহিণী দাসের মুখে হাসির মৃদু রেখা ফুটে উঠেছিল। তিনি খুব স্নেহের চোখে

বিজয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলেন ,অন্তত তখন তার সেরকমই মনে হয়েছিল। সে মাথা নিচু করে

ছিল বলে রোহিণী দাসের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু সে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে যেন অনুভব করছিল

একজোড়া কোমল চোখের গভীর স্লেহপূর্ণ দৃষ্টির প্রলেপ তার উপর রয়েছে। তারপর সে শুনতে পেল

ইলার বাবা বলছে –‘আমি আর কোনো রকম আপত্তি করব না বিজয়। তোমরা দুজনেই সুখী

হও,তোমাদের জীবন মঙ্গলময় হোক,তোমাদের জীবন সৎ হোক । নিষ্ঠা এবং ঐকান্তিকতার সঙ্গে

তোমরা দুজন যেন সবসময় জীবন পথে চলতে পার আমি সেই আশীর্বাদই করছি। আমি মনে মনে ইলার

জন্য তোমার মতো ছেলের খোঁজই করছিলাম । আমার জামাইয়ের টাকা পয়সা থাকুক বা না

থাকুক,চরিত্র বল যেন থাকে,সৎ সাহস,সাধুতা যেন থাকে এটাই আমার প্রতিদিনের প্রার্থনা ছিল।

আজ ঈশ্বর আমার সেই প্রার্থনা সফল করেছে। অবশ্য জীবনে চিরকাল একটা দুঃখ থেকে

যাবে—তোমার মাতা পিতা ,তোমাদের বাড়ির সবাইকে আঘাত দিয়ে একটা নতুন সংসার গড়ে তুলতে

হল।এটা একটা বিরাট দুঃখ বিজয় । আমি জান তোমার মনের ভেতরে কী হচ্ছে। কত কষ্টে,কত আশায়

মা বাবা ছেলেকে বড় করে তোলে তা নিজেও পিতা হয়ে তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। তাদের তুমি

মর্মান্তিক আঘাত দিয়েছ বিজয়। আমি আর কী বলব--আমি কেবল এটাই কামনা করি তুমি যদি জীবনে

সত্যিই মানুষ হয়ে উঠ,বড় হও,তোমার গর্বে গর্বিত হয়ে তারা একদিন কিছুটা হলেও মানসিক আঘাত

মুছে ফেলতে সক্ষম হবে।’


ইলার বাবা আরও অনেক কিছু বলেছিল।বিজয় কেবল মাথা নিচু করে শুনে গিয়েছিল এবং বিভিন্ন

আবেগের চাপে তার অন্তরে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছিল।

তারপর একদিন ইলাকে বিয়ে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।বাড়ি মানে ভাড়া বাড়ি।তিনটি

ঘর,রান্নাঘর আলাদা। খুব একটা খারাপ নয় যদিও খুব ভালোও বলা যাবে না। বাড়িটা নামেই পাকা,এত

পুরোনো যে জায়গায় জায়গায় নিচের ইট বেরিয়ে পড়েছে। একটু স্যাঁতসেতে, আলো নেই,অবশ্য সেই সময়

শুয়াহাটি শহরের খুব কম জায়গাতেই বিদ্যুতের আলো ছিল। এই তিনটে রুম ছাড়াও একটা বাথরুম

ছিল,কিন্তু সেটা ছিল কিছুটা দূরে কুয়োর পাশে। বাথরুমটা ও আধা ভাঙ্গা পাকার,দেওয়ালটা বেড়া দিয়ে

তৈরি। অবস্থা দেখে মনে হয় সেই বাঁশের বেড়ায় কোনোদিনই মাটি-গোবর বা চুণ দিয়ে লেপা হয় নি।

কুয়োটা কিন্তু ভালোই বলতে হবে,পাকা কুয়ো,জলও ভালো।

অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বিজয় এই বাড়িটা ঠিক করেছিল। নতুন কনেকে আদর করে বরণ

করে নেবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিজয়ের--তাই তার ভাবনার আর শেষ ছিল না। তাকে সাহায্য করার জন্য

ছিল ফাইফরমাশ খাটার জন্য থাকা বাদল। সেই বাদলকে সঙ্গে নিয়েই বাড়িটা যতটা সম্ভব সাজিয়ে

গুছিয়ে নতুন কনের উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করেছিল। সাজানো মানে—তার পড়ার অজন্র বইগুলো

এখানে সেখানে পড়ে থাকত--টেবিলে,বাক্সের উপরে,বিছানায় এমনকি বসার চেয়ারে ও। এখন সমস্ত

বইগুলোকে একত্র করে টেবিলের উপরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। বাদলকে বলল ঘরটাকে ভালোভাবে

ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতে । এতদিন বাদল কীভাবে বাড়িঘর পরিষ্কার করত সেই জানে

কিন্তু বিজয়ের বিয়ের সময় ঘরের ভেতর থেকে যত আবর্জনা বের হল তা দিয়ে রাস্তার পাশে রাখা

প্রকাণ্ড আকারের ডাস্টবিনটার প্রায় অর্ধেকটা ভরে গেল।

বিজয় এবং বাদল এভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা ঘরে এসে উঠল ইলা । সঙ্গে নিয়ে এল একটা ঘর

ভরে যাবার মতো যৌতুকের জিনিসপত্র-খাট,পালঙ,আলনা চেয়ার,টেবিল,সোফা,আলমারি,মিটসেফ--

সবকিছু। একটা সংসার পাততে গেলে যে সমস্ত জিনিস পত্রের প্রয়োজন,ইলার সঙ্গে তার মা বাবা তার

প্রায় সমস্ত কিছুই দিয়ে দিয়েছিল।

তারপর বিয়ের তিন চারদিন কেটে যাবার পরেই ইল ঘর সাজানোয় উঠে পড়ে লেগে গেল। শোবার

ঘরে ইলা পালংটা, ড্রেসিং আয়না,আলনা এবং বেতের চেয়ারটা রাখল। এই চেয়ারটা ছিল বিজয়ের নিজের

। তাছাড়া বিজয় ব্যবহার করা খাটটাও ইলা নতুন বিছানার চাদর,বেড কভার দিয়ে ঢেকে পালঙ থেকে

একটু দূরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। বিজয়ের সময়ে বিছানা চাদর দিয়েই তোষকটা ঢাকা থাকত। খুব

বেশি নোঙরা হলে বিজয় কখনও কখনও বাদলকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিত। বালিশের ওয়ারগুলোর

অবস্থাও ছিল সেরকমই। এখন তার শোবার ঘরটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ লাভ করতে দেখে সে চমৎ্কৃত

হল।

‘বাঃ’ --বিজয় চারপাশটা দেখতে দেখতে খুশি হয়ে বলল –‘বাড়ির চেহারা দেখছি একেবারে বদলে

দিয়েছ ইলা । কী বাড়ি আমার কী হয়ে গেল?’

প্রশংসায় ইলা খুশি হয়েছিল। সে তৃপ্তির হাসি নিয়ে উত্তর দিয়েছিল –‘গৃহিনী আসার পরে তো

ঘরের আগের দুর্দশা থাকতে পারে না?’শোবার ঘরের সংলগ্ন দুপাশে দুটো ঘর। পথের পাশের ঘরটিকে

সোফা সেট দিয়ে সাজিয়ে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করে পাশের ঘরটিকে লাইব্রেরি তৈরি করল।বিজয়

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কীভাবে তার অযত্ন রক্ষিত বইগুলি ইলা এক এক করে ধুলো ঝেড়ে টেবিলের


ওপর সাজিয়ে রাখল । সেই টেবিলটাও তারই ছিল। এতদিন পর্যন্ত তাতে বিজয়ের সমস্ত কাজই

চলছিল--সেখানেই ভাত খাওয়া বা চা খাওয়া চলত। বাদল টেবিলটির ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো

পরম অবহেলায় একপাশে ঠেলে দিয়ে সেখানেই ভাতের থাল এবং চায়ের কাপ-প্লেটের জায়গা করে নিত।

চিঠি-পত্র ইত্যাদি যে কোনো লেখালিখির কাজও বিজয় টেবিলের ওপরেই করে,দাড়ি কাটার সাজ

সরঞ্জাম ও সেখানে রেখে তাতে দাড়ি কাটে। বন্ধুবান্ধব কেউ এলে এ টেবিলেই চা,তামোল দেওয়া হয়।

ইলা যখন টেবিলটার দায়িত্ব নিল তখন সেটা বিচিত্র দাগে পরিপূর্ণ—কালির দাগ,কুপি জ্বালিয়ে

বাদলের নোঙরা পরিষ্কীর করার অভ্যাস না থাকায় কেরাসিনের দাগ এবং মোমবাতির দাগ চুণের দাগ

টেবিলটাকে বিচিত্র রূপ দান করেছিল। ইলা এখন ঘষে ঘষে সেই দাগগুলি পরিষ্কার করল,তারপর

টেবিলে সুন্দর একটা টেবিলক্লথ পেতে দিয়ে বিজয়ের লাইব্রেরি রুম তৈরি করে দিল। টেবিলটা তার

জড়-জীবনে সেদিনই প্রথম আচ্ছাদন পেল।

ইলা বাবার কাছ থেকে ছোট একটা আলমারিও পেয়েছিল। ইলার শৈশব থেকে অনেক পুতুল

জমেছিল—সবগুলোই সেই আলমারিতে রাখা ছিল। মা-বাবা মেয়ের সঙ্গে তার শৈশবের খেলার সাথীদের

সঙ্গে আলমারিটাও পাঠিয়ে দিয়েছিল। ইলা কিন্তু বিজয়ের ঘরে পুতুলগুলি আলমারি থেকে বের করে

খালি বাক্স একটাতে ভরে রাখল। আর আলমারিটা বিজয়ের বইপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখল। সেইঘরে এখন

একটা আলমারি,একটি টেবিল,একটি কাঠের চেয়ার এবং একটি বেতের চেয়ার –এইসবই ইলা এমন

পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখল যে বিজয় মন্তব্য করল –‘ইলা,তুমি এত সুন্দর করে সাজিয়ে তোমার

নিজেরই যে ক্ষতি করলে,সেই কথাটা ভেবে দেখেছেন কি?’

‘তার মানে?’ইলা সত্যিই অবাক হল।

‘তার মানে আর কি? পুরুষ মানুষ বই পত্র পড়লে নাকি মেয়েরা খুব রাগ করে --অর্থাৎ তারা

চায় পুরুষ মানুষদের সম্পূর্ণ আনুগত্য কেবল তাদের প্রতিই থাকবে,অন্য কিছুর প্রতি আকর্ষণ

থাকাটা তারা মোটেই পছন্দ করে না। তা সে বইয়ের মতো অচেতন পদার্থ হলেও । তুমিও তো সেই

মেয়েদেরই একজন-এত সুন্দরভাবে ,আরামপ্রদ করে আমার পড়ার রুম সাজিয়ে দিয়েছ, আগে থেকেই

আমি বই পড়তে ভালোবাসি,এখন তো আর লাইব্রেরি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুতে ইচ্ছাই করবে না’

‘ও,এই ব্যপার। আমি আরও ভাবছিলাম না জানি কী।’ ইলা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল-এর

জন্য আমি খুব একটা ভয় করি না--আমি খুব একটা বিদ্বান নই ,শিক্ষা-দীক্ষা তো জানই--কিন্তু

পড়াশোনার প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ রয়েছে, আমি পড়াশোন করতে ভীষণ ভালোবাসি । এখন আপনি

যখন পড়াশোনা করবেন আমিও তখন একটা বই নিয়ে আপনার পাশে বসে থাকব।তবে আপনাকে কিন্তু

বিরক্ত করব,কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করব,বুঝতে পারলে আপনার কাছে আমার বিদ্যা জাহির

করার জন্য আপনাকেই বোঝাতে শুরু করব। কোনো বই পড়ে ভালো লাগলে আপনাকে সেই বিষয়ে বর্ণনা

দিতে শুরু করব,খারাপ মনে হলে লেখককে সমালোচনা করে আপনার সামনে একটা দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে

বসব। বই পড়ে হাসি পেলে আপনাকেও সেই রসের ভাগ দিয়ে আমার সঙ্গে আপনাকেও হাসাব,বই পড়ে

দুঃখ পেলে হাউমাউ করে কাঁদব-

‘অর্থাৎ-, বিজয় ইলার কথার মাঝখানেই বলে উঠেছিল -সেই পড়ার ঘরটা আমার না হয়ে

তোমার হবে এবং তখন তোমার থিয়োরিটাকেই আমাকে উল্টিয়ে বলতে হবে যে বউ বই পড়লে স্বামীরা

খুব খারাপ পায় –’


হো হো করে ইলা হেসে উঠেছিল।

সেই হাসির ধ্বনি যেন আজও দূর অতীত থেকে ভেসে এসে বিজয়ের বুকে ধাক্কা মারল। ইলার

সেই মন ভুলোনো হাসি। মেয়েটি এত প্রাণখুলে হাসতে পারত। মুখে এমনিতেই সব সময় হাসি লেগেই

থাকত,মনে হত যেন ইলার মুখ হাসির খোরাকের জন্য অপেক্ষা করে থাকত। তারপর সুযোগ পেলেই

হাসির উচ্ছ্বাসে মেতে উঠত। মাঝেমধ্যে বিজয় তার জন্য বিরক্ত ও হত। --এত হাসলে আশেপাশের

মানুষ কী ভাববে? ইলা সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে পড়ত--ছিঃ,এই বাজে অভ্যাসটা আর কোনোমতেই

ছাড়তে পারলাম না। মা আমাকে সংশোধন করার কত চেষ্টা করেছে আমি যে ছেলেদের মধ্যে বড় হয়ে

অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েসুলভ নম্রতা ভদ্রতা ভুলে যাই সে কথা মা আমাকে কতদিন বলেছে --ছিঃ কেন

যে বারবার ভুলে যাই-'

কিন্তু তারপর ও ইলা বারবার ভুলে যেত,আবার উচ্ছ্বসিত হাসিতে ভেঙ্গে পড়ত,আর মাঝে

মধ্যে বিজয় বিরক্ত হয়ে উঠত। আজ এত বছর পরে সেই হাসিভরা মুখটিকে স্মরণ করে বিজয় ভরালী

অদৃশ্য চোখের জল মুছে চলেছে।

একটা হাসিভরা মুখ। স্ত্রীর যে ছবিটা বিজয়ের চোখের ওপর সবসময় ভাসতে থাকে ,সেটা হল

হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে থাকা মুখের ছবি। একটা গোলাকার মুখ,খুব বেশি ফর্সা নয়,চোখদুটো

উজ্জ্বল,ছোট কপালটিতে একটু বড় টিপ,সিঁথিতে লম্বা করে সিদুরের রেখা । পাতলা ঠোটদুটিতে লেগে

রয়েছে চিরসঙ্গী হাসি।সেই হাসিকে মানুষটা কোনোদিন মলিন হতে দেয় নি। বিজয়ের মনে একটা বড়

কুষ্ঠাবোধ ছিল যে ভালো বাড়ি ঘরে প্রতিপালিত হওয়া ইলা এই আধা ভাঙ্গা ঘরে একটু হলেও

অসস্তুষ্ট হবেই।

প্রথমে না হলেও পরে নিশ্চয় তাকে বলবে যে বাড়িটা ভালো নয়। অসুবিধের লিস্ট দিন দিন

দীর্ঘ হতে থাকবে,হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা ভালো দেখে ঘর খুঁজে নিতে বলবে। সেজন্যই ইলা যখন

তার সঙ্গে আনা নতুন চকচকে খাট পালঙ ,চেয়ার-টেবিল অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবং খুব পরিপাটি

করে সাজাতে শুরু করল,বিজয় নিজেই কিছুদিন পরে যে প্রসঙ্গ শীঘ্রই অবতারণা করার সম্ভাবনা

রয়েছে তা শুরু করে দিল—

‘এই আধা ভাঙ্গা ঘরগুলো আর নতুন করে কী সাজাবে ইলা?’

আধা ভাঙ্গা হলেও অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বাড়িটা পেয়েছ তাই নয় কি? আগে তো এর

থেকেও একটা খারাপ বাড়িতে ছিলে। আমাকে বিয়ে করার জন্যই তো এই বাড়িটা আগের চেয়ে অনেক

বেশি ভাড়া দিয়ে নিয়েছ। পাওয়া গেলে তো আর ও বেশি ভালো একটি ঘর নিতে--নয় কি ?বিজয়ের মুখের

দিকে তাকিয়ে ইলা হাসল।

কী প্রসঙ্গের অবতারণা করতে গিয়ে কী উঠে এল!

এই সমস্ত তথ্য তৃমি কোথা থেকে পেলে?’

‘কোথা থেকে আর-।বাদল বলেছে।সে আরও বলেছে-আপ্নি নাকি তাকে বলেছেন,আমি বেশিদিন

এই শহরে থাকতে চাইব না।আপনাকে আরও একটা ভালো বাড়ি খুঁজে বের করতে হবে।আপনি তো বেশ


বড়লোকের মনের খবর জেনে বসে আছেন।আমি এই ঘরে বাস করার আজ দুই সপ্তাহ পরেও আপনি

আমার মনের খবরটা জানেন না কিন্তু আমি এখানে আসার অনেকদিন আগে থাকেই আমার মনের সেই

খবর জেনে বসে আছেন।’

‘তারমানে এই বাড়িতে থাকতে তোমার আপত্তি নেই-’-বিজয় দ্রুত জিজ্ঞেস করল। ‘মোটেই না।

বাবা আমাদের শৈশব থেকেই শিখিয়েছেন যে মানুষ যতটুকু পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। যে জিনিস

পাওয়া সম্ভব নয় তার জন্য হা-হুতাশ করে মনকে অসুখী করে তোলা উচিত নয়। সবদিক দিয়ে মনের

মতো হওয়া ভাড়াঘর পাওয়া তো অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া আমরা তো এখানে চিরকাল বাস করব না।

আপনার যখন বদলির চাকরি একদিন না একদিন তো এখান থেকে চলে যেতেই হবে।’ তারপর বিজয়ের

দিকে তাকিয়ে হেসে ইলা বলল –‘আমরা যখন নিজেদের বাড়ি তৈরি করব তখন সেখানে নিজেদের মতো

করে সমস্ত কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে নেব।'

সেদিন বিজয় সত্যিই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। স্বভাবে সে অলস। এই সামান্য

জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি বদল করেই তার কেমন যেন হাফ ধরে গিয়েছিল। ইলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য

কথাটা বললেও ,এখনই এত জিনিসপত্র নিয়ে পুনরায় একটি নতুন বাড়িতে উঠে যাবার সম্ভাবনার কথা

চিন্তা করেই তার কেমন যেন ভীতিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। বদলি হলে তো কোনো উপায় না পেয়ে যেতেই হবে।

ইলার প্রতি মনে মনে বিজয় কৃতজ্ঞ বোধ করল। কিন্তু তবুও তার মনে একটা সন্দেহ থেকেই

গেল যে ইলার মনে একটা ভালো বাড়িতে বসবাস করার আকাঙ্থা রয়েছে। কিন্তু এতদিনের পরিচয়ের

পরেও তার অলস স্বভাবের কথা তো ইলার না জানার কথা নয়। তাই এই বাড়িটিকে সে এক মুহূর্তের

জন্যও ভূলে খারাপ বলে বলে নি। তা নাহলে আর কিছু না হোক অন্তত বাথরুমের ব্যাপারে ইলার

আপত্তি করাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল--বেড়াগুলি থেকেও না থাকার মতোই। স্নান করতে গিয়ে

প্রতিদিনই ইলা চাদরটা দিয়ে ঢেকে দেয়,আর সে ও এতটাই মহামুর্খ -এতদিনে বাড়ির মালিককে বলে

কয়ে বেড়াগুলিতে মাটির প্রলেপ তো দিয়ে নিতে পারত। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পরে ইলা মুখ ফুটে

তাকে বলার পরে সে কাজটা করিয়ে নিয়েছিল।

সেদিন বিজয় বড় লজ্জা পেয়েছিল। নিজেকে বড়,অকর্মণ্য,সংসারী হওয়ার অনুপযুক্ত বলে মনে

হয়েছিল। অবশ্য ইলার কাছ থেকে সে এরকম একটা কাজ পাওয়ার ফলেই তার মনে বেশ একটা পৌরষের

গর্ব জেগে উঠেছিল। আধুনিক যুগে প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতো পুরুষ অবলা নারীকে নানা বিপদ

আপদ,বিভীষিকা ইত্যাদি রক্ষা করার সুবিধা খুব কমই পায়। টাকার জোগাড় দেওয়া,বাজার করে

দেওয়া,মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে ডাক্তার ডেকে আনা --এই সমস্ত কিছুতেই তাঁদের

পুরুষের কর্তব্য শেষ হয়ে যায়। নারীর কাছে আর কোনোভাবে তাদের বীরত্ব দেখানোর সুযোগ পায় না।

কিন্তু বিজয় নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করল--যখন বিয়ের পরের দিন রাতে ইলা তাকে ঘুম থেকে

জাগিয়ে তুলে বলল যে সে বাইরে যেতে চায়,কিন্তু বাথরুমটা অনেকটা দূরে,তার খুব ভয় করছে,বিজয়কে

সঙ্গে যেতে হবে। রাতে ঘুম থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বাইরে যেতে হবে --এটাই কাজ। স্ত্রী তাকে খুব

কুণ্ঠার সঙ্গে জানায় ,এভাবে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ইলার খুব খারাপ লাগে । শীতের রাত হলে তো সে

কুগ্ঠা আরও বাড়ে। কিন্তু কী করবে সে,তার যে প্রতিদিনই রাতে বাইরে যাবার অভ্যাস,অথচ এত ভয়

লাগে। এত ভয় যে তাকে রক্ষক হয়ে সঙ্গে যেতে হবে--নব-বিবাহিত যুবকের কাছে তরুণী স্ত্রীর এই

আবদার যে কতটা মাধুর্য বহন করে এনেছিল ,কী এক গৌরুষের গর্বে তার বুক স্ফীত করে

তুলেছিল,আজও সে অনুভূতি যেন নতুন করে বিজয় ভরালী উপভোগ করে৷


ইলার সেই ভয় নিয়ে দিনের বেলা বিজয় তাকে খুব খ্যাপায়। ‘এত ভয় কীসে?’ সে আরম্ত করে।

‘কীসে আর,ভূতে’-বিনা সঙ্কোচে ইলা উত্তর দেয়।

‘ভূত!এই গুয়াহাটি শহরেও ভূতের ভয় কর। তোমার নিজের চোখে কখনও ভূত দেখেছ যে এত ভয়

কর?’

‘বাঃ দেখিনি বলেই তো এত ভয়। বাঘ-সিংহ এরা সব কী কম ভয়ঙ্কর । কিন্তু ওদের দেখেছি

বলে ওদের কে এত ভয় লাগে না। কিন্তু রাতের বেলা ভূতের কথা মনে পড়লেই আমার শরীরের সমস্ত

লোম খাড়া হয়ে যায়।'

বিজয় হেসে ফেলেছিল। তারপর তার মনে হল ইলাকে কিছু তত্ত্বকথা বলা যেতে পারে।

‘ইলা,ভয় কী প্রমাণ করে জান?’

‘কী?’

‘জীবনের প্রতি মানুষের কতটা মায়া,কত মমতা। মত্যুকে ভয় করার মাধ্যমেই তো মানুষের মনে

সাধারণত সকল রকম ভয় সঞ্চারিত হয়েছে। মানুষ মরতে চায় না,বেঁচে থাকতে চায়--সেইজন্যই

পৃথিবীতে এত ভয়।

‘ইস,এ আর নতুন কথা কী। মানুষ তো মরতে চায়ই না। কেউ চায় না। আমিও চাই না।'

ক্ষণিকের জন্য থেমে গিয়েছিল ইলা-তারপর আস্তে করে বলেছিল –এখন আরও বেশি করে চাই

না।’ বিজয় ভালোবাসার দৃষ্টিতে ইলার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু ইলার কথাটা না বোঝার ভান করে

হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল –কেন?’

‘এমনিতেই-’, কপট ক্রোধের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল ইলা।

‘কিন্তু ইলা,আমি কিন্তু মরতে চাই। আজকেই। এখনই।’

‘কেন?’ প্রায় আর্তনাদের সুরে বলে উঠেছিল ইলা।

‘মরে ভূত হয়ে আমার প্রমাণ দিতে ইচ্ছা করছে-আমার মত্যুর পরে তুমি কতদিন কাঁদ।'

‘আপনি বড় নিষ্ঠুর।’ ইলার চোখ সেদিন ছলছল করে উঠেছিল। হাসি ঠিক যতটা সহজ আর

অনায়াস ছিল ইলার কাছে ,কাঁদাটাও ঠিক সেরকমই ছিল।

ইলার মৃত্যুর পরে বিজয় নিজে কিন্তু কাঁদে নি। কাঁদতে পারে নি। ইলা ভূত হয়ে সে কয়দিন

কেঁদেছে তা দেখতে চুপিচুপি এসেছিল কিনা,সে বলতে পারে না। ইলা তাকে ছেড়ে চলে যাবার পরে

কোনোদিন সে ইলার ছায়াটুকুও দেখতে পেল না।


জীবিতকালে যতই প্রিয়জন হোক না কেন,অনেকেই মৃত্যুর পরে কিন্তু সেই প্রিয়জনের

সাক্ষাৎ আর চায় না,অর্থাৎ ভূতের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে না। কিন্তু বিজয় ভেবেছিল

সে যদি জীবনে কখনও ভূত দেখতে পেত--ইলার ভূত না হলেও অন্য কোনো ভূত দেখতে পেলেও সে

জীবনে হয়তো একটা বিরাট সান্ত্বনা লাভ করত ,কারণ তাহলে একটা বড় সত্যের সন্ধান পেত যে

মৃত্যুর পরে সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যু মানে শূন্য নয়,তার মানে তার নিজের মৃত্যুর পরে সে

একদিন হয়তো ইলার দেখা পেলেও পেতে পারে।



আটপৌরে কবিতা || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৭৬.
আমার পোশাকে নিশীনাথের
বসবাস
দিবারাত্র তাহারই শ্বাস প্রশ্বাস

৭৭.
পৃথিবীর শরীরে জায়মান
নিশীনাথের
উপাস্য কামবৃত্তি আর মনোবিজ্ঞান

৭৮.
কৃষিক্ষেত্রে শঙ্খলাগা সাপ
নিশীনাথ
দিয়েছে যৌনলিপির ব্রহ্মময় ধাপ

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য ২০৭ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় - এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০৭.

 শনিবার দুপুর ৩টের সময় বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে পৌঁছোলেন বাংলাদেশের কবি জাহিদ হাসান মামুদ এবং তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। স্টেশনে উপস্থিত ছিল নাসের স্বপন দত্ত শান্তনু সমরমাস্টার এবং আমি। জাহিদরা পৌঁছে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সন্দীপ বিশ্বাস।  ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল PWD বাংলোয়। ওখানেই ছিল দীপ ও শুভ্রা সাউ।

সন্দীপ বেশ কিছুক্ষণ ওখানে জাহিদ-কে সঙ্গ দিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল জাহিদদের গ্রামের বাড়ির কাছেই সন্দীপদের পৈত্রিক বাড়ি।

উৎসবের দিন সকাল ৬টায় বেরিয়ে পড়েছিলাম অতিথি-আপ্যায়নে। 

PWD বাংলো সার্কিট হাউস PHE বাংলো ঘুরে এলাম । আবার সাড়ে ৬টায় নাসেরের সঙ্গে বহরমপুর ক্লাব। ওখানেই খাবারের ব্যবস্থা , দিনের এবং রাতের। পাশেই ঋত্বিকসদন। ওখানে থার্মোকলের ৩টি হোডিং এসে গেছে। ২টি বাইরে লাগানোর জন্য , একটি সভামঞ্চের। তখন ফ্লেক্স আসেনি। নীল কাপড়ের ওপর থার্মোকলে লেখা কবিতাপাক্ষিক ৩০০। মঞ্চের সামনে ' মানুষ যতদিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখবে ততদিন কবিতাও থাকবে '।

 ওখান থেকে গেস্টহাউস। গেস্টহাউস থেকে ব্যানার

 ও বইপত্রের ব্যাগ গাড়িতে তোলা হল।এমদাদ -উল- হক গাড়ির ব্যবস্থা করেছিল। গেস্টহাউসের কাছেই মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ওখানে কচুরি ডাল ছানাবড়া। গাড়ি নিয়ে বহরমপুর ক্লাব। দেখা গেল বাস থেকে নেমে ঋত্বিকসদনের দিকে হেঁটে আসছেন দীপংকর ঘোষ তাপসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ভগবাহাদুর সিং রুদ্র কিংশুক মলয় ঘোষ। তাদের ডেকে নিলাম। বহরমপুর ক্লাবের গেটে কবিতাপাক্ষিকের ব্যানার টাঙানো হল। ঋত্বিকসদনের সামনে ১২ টি বিভিন্ন রঙের উৎসবের পতাকা ওড়ানো হয়েছিল লোহার স্ট্যান্ডে। এই আইডিয়াটা পেয়েছিলাম পার্টির একটা কর্মসূচি থেকে।ব্রিগেড-এর মিটিং । অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলাম মঞ্চ এবং মাঠ সজ্জায়। সেখানেও ১২টা অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলাম মঞ্চ এবং মাঠ সজ্জায়। সেখানেও ১২টা উৎসবের পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। মঞ্চের ব্যানার দুটিও নিজ নিজ স্থানে বসে পড়ল। শুভাশিসের ওপর দ্যাখাশোনার ভার রইলো।

নাসের এবং আমি গেলাম সন্দীপ বিশ্বাসের বাড়ি। ওখান থেকে  গেস্টহাউস। ওখানের বইপত্র নামিয়ে এনেছিল রুদ্র কিংশুক তাপসকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ভগবাহাদুর সিং। 

ঋত্বিকসদনে বইপত্র নামানোর পর নাসের এবং শান্তনু চলে গেল লোকনাথ মন্দিরে। পায়রা আনার জন্য। অশোক সিনহা একটি নাইলনের  তিনটি মুখবন্ধ ব্যাগে সাদা পায়রা তুলে দিয়েছিলেন নাসেরের হাতে।নাসের এবং শান্তনু হাতে করে পায়রা ধরা শিখে নিয়েছিল। অশোককেও আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। অশোক আসতে পারেনি। তার প্রতিনিধি একটি ছেলে এসেছিল সাইকেলে।


রবিবার ২০ মার্চ ২০০৫ সকাল ১১টায় বহরমপুর ঋত্বিকসদনের সামনে ৩০০ কবিতাউৎসবের উদ্বোধন হল একটু অন্যরকম ভাবে। প্রবেশতোরণের কাপড়ের ওপর আটকে দেওয়া হয়েছিল কপা ২৯৯ সংখ্যায় প্রকাশিত উত্তম চৌধুরী 'প্রস্তাবনা ' কবিতাটি । তার পাশেই কপা ৩০০ সংখ্যা আমার লেখা ভূমিকাটি 'কথার কথা '।

তারপর পায়রা ওড়ানোর কথা ঘোষণা করল নাসের । আমি প্রথম পায়রাটি , দ্বিতীয়টি শক্তিনাথ ঝা , তৃতীয়টি সন্দীপ বিশ্বাস। পায়রা উড়লো। মুহুর্মুহু হাততালি । ঘোষণায় ঠাকুরদাস।রতন দাস তার মোবাইলে হাততালির ধ্বনি সরাসরি শুনিয়েছিল ধীমান চক্রবর্তী-কে। লোকনাথ মন্দিরের ছেলেটির হাতে ফেরত দেওয়া হল পায়রার ব্যাগ। তারপর ভেতরে ঢোকা হল।

ভেতরের খবর আগামীকাল।

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

শিক্ষা-জীবন || চার্লস মিথুন || অন্যান্য কবিতা

শিক্ষা-জীবন

চার্লস মিথুন



জগৎ মাঝে জন্ম নিয়েই,
শিক্ষা জীবন শুরু।
শেখার বয়স শেষ হবে না,
হও না যতই বড়॥

মায়ের কাছে শিখবে প্রথম,
প্রাণের কথা বলা।
ধীরে ধীরে শিখবে তুমি,
সমাজ মাঝে চলা॥

শিখবে তুমি বিদ্যাপিঠে,
পাঠ্যসূচির পড়া।
পাঠ্য সকল দেখবে তুমি,
জ্ঞানের আলোয় ভরা॥

পড়া শেষে হবে তোমার,
কর্ম জীবন শুরু।
সেখানটাতে দেখবে তুমি,
আছেন অনেক গুরু॥

তোমার চেয়ে অনেক লোকে,
অনেক বেশি জানে।
এই বিষয়ে স্মরণ রেখে,
চলবে সকল জনে॥

অনেক জ্ঞানীর দেখা পাবে,
জীবন চলার পথে।
জ্ঞানের সীমা বাড়বে তোমার,
বয়স বাড়ার সাথে॥

তাই তো বলি শুরু সবে,
জন্ম নেয়ার পরে।
শিক্ষা নেয়ার বয়স শেষ,
মৃত্যু হওয়ার পরে॥

আটপৌরে কবিতা || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৭৩.
পূর্ণিমায় একাকার হয়ে
তুমি
নিশীনাথ রাঙিয়েছো মোর যৌনভূমি

৭৪.
মরেও মরিনি আমি
যেহেতু
নিশীনাথে পড়ি অবগাহনের কাহিনি

৭৫.
তুমি এক মেটাফর
প্রাণেশ্বরী
নিশীনাথ করেছে তোমায় অপরাপর

কিছু বই কিছু কথা ২০৪ || নীলাঞ্জন কুমার || আধখানা প্রবাদ || গৌরাঙ্গ মিত্র

 কিছু বই কিছু কথা ২০৪ ।  নীলাঞ্জন কুমার





আধখানা প্রবাদ । গৌরাঙ্গ মিত্র । কবিতা পাক্ষিক । ষাট টাকা ।


' একটা প্রিয়স্বপ্ন একশো আট টুকরোয় ভেঙে/  একশো আটটা সাদা বক হয়ে শেষ পর্যন্ত বলাকা হয়ে যায়- ' এর মতো সুন্দর ' উৎসর্গ ' পত্রের কবিতা  অবলীলায় লিখতে পারেন ২০১০সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ' আধখানা প্রবাদ ' কাব্যগ্রন্থে কবি গৌরাঙ্গ মিত্র , সেখানে বইটির ভেতরে ঢুকতে আলাদা  নির্যাস অনুভব করব তা বলাই বাহুল্য । তাই মিথ্যাচারণকে আশ্চর্যভাবে তাঁকে কবিতায়  আনতে দেখি: ' মিথ্যার অশ্বত্থামা আছে,  আলোকোজ্জ্বল  আলেয়া আছে/  তবে মিথ্যার কোন মিথ্যাচারণ নেই,  মিথ্যাপীরও নেই ।'( ' মিথ্যাচারণ ও মিথ্যাপীর ') তখন গৌরাঙ্গের কবিতাচর্চার ফাঁক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে ।পাশাপাশি ' বিতর্ক সভা ' কবিতায়  : ' একথা ঠিক বিতর্ক সভায় অনেক তর্কাতর্কির পরেও/  কাকেরা সাদা হয়ে উঠবে না,  রাজহাঁস কালো হবে না '-র মতো দৃষ্টিভঙ্গি ও তীব্র শ্লেষ  তিনি আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেন, তখন 'সমালোচনা মানেই কষাঘাত ' এই মনোভাবকে অস্বীকার করে বইটি ভালোবাসতে ইচ্ছে হয় ।
                আগে বলেছি এখনো বলছি পরেও বলবো ,  গৌরাঙ্গ ধীরে ধীরে অনেক পরিশ্রমে কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁর কবিতাজগৎ , তা তাঁর কবিতা পর্যায়ক্রমে পড়লেই বুঝতে পারা যায় । তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে পাই:  ' সারা গায়ে তোমার দরবারি কানাড়া মেখে/  এখান থেকে আমি চলে যাব ।' ( ' কিন্তু কৃষ্ণজিৎ') , ' ভেবেছিলাম গোরুর গাড়িটার পেছনে ছুটব , / কিন্তু ছোটা হয় না, আমাকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে স্থবির সময় । ' ( ' গোরুর গাড়ি ')  চুম্বন করার মতো পংক্তি ।
             বর্তমানে গৌরাঙ্গ মিত্রের কবিতা এমনই  , যাকে পুনঃপাঠ করতে গেলে আবার আঁতিপাতি করে পড়তে হয় । কারণ তাঁর ভেতর সত্য বাসা বেঁধে আছে,  যে
সত্যের সঙ্গে মনে মনে সকলেই বাস করতে চাই মিথ্যে দূরে ঠেলে । শৈবাল নায়েকের প্রচ্ছদ কে বলতে হয় , বাঃ। কালার,  পরিকল্পনা মনকে ধরে রাখে ।

শব্দব্রাউজ ২৬ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ ২৬ । নীলাঞ্জন কুমার



তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন  ২৫।১১।২০২০ সকাল ৮ -  ১৫ মিনিট । অল্প ঠান্ডা বাতাসে । প্রেম প্রকৃতি ইত্যাদির কথা ভাবতে গিয়ে মাথায় এলো  ' নেংটি ইঁদুরে ঢোল কাটে ' । তাই নিয়ে ধীরে ধীরে ঘটে গেল শব্দব্রাউজের চিন্তা ।


শব্দসূত্র   :  নেংটি ইঁদুরে ঢোল কাটে


নেংটি ইঁদুর মানে যদি শুধু টম এন্ড জেরি হত তবে কেউ  তাকে  বিষ দিয়ে পেট ফুলিয়ে  মারতো না । কার্টুন আর বাস্তবের মিল কোথায়? নেই,  নেই হে । জেরি আর টম এত মারামারি করেও যখন বেঁচেবর্তে থাকে,  তখন কার্টুনের অবাস্তবতা হাসির খোরাক হয়ে ওঠে । নেংটির কাছে যখন অনেক কিছুই কুটিকুটি করার ক্ষমতা,  তখন কি করে মানুষেরা বাস্তবে  মজা পাবে বলুন? 


নেংটি ইঁদুরের ঢোল কাটার দৃশ্য  দেখার সময় কার আর 'গতরে পিরিতি ফুল ফুটে ' মেলানোর ইচ্ছে জাগে ।নেংটির গতর বড় ছোট, ঢোলের ওপর চড়ে বসে অবলীলায় যেতে পারে দেশ দেশান্তরে । চুপিসারেগানও শুনতে পারে ' নেংটি ইঁদুরে ঢোল কাটে.... ' । টম এন্ড জেরির স্রষ্টা তা দেখলে নির্ঘাত বানিয়ে নিতেন কমিকস্ ফিল্ম । শেষে সবাই হাততালিতে ভরিয়ে দিতো।

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২০৬ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০৬.

কবিতাপাক্ষিক ৩০০ সংখ্যা প্রকাশ উপলক্ষে কবিতাউৎসব হয়েছিল ২০ মার্চ ২০০৫ , বহরমপুরের ঋত্বিকসদনে। 

আমরা , শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় বিশাল ভদ্র সৌমিত্র রায় এবং আমি , বহরমপুর পৌঁছেছিলাম একদিন আগে। ১৯ মার্চ ।সকালে। ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস ধরেছিলাম।  নাসের হোসেন গিয়েছিল ১৮ মার্চের ভাগীরথীতে। নিয়ে গিয়েছিল কবিতাপাক্ষিক ৩০০ -র ৫০ কপি। আর আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল আরো ৭০ কপি।

সকাল ৮টায় কৃষ্ণনগর পৌঁছে নাসের-কে জানিয়েছিলাম শিলিগুড়ির বাসে যাচ্ছি। বাসস্ট্যান্ডে নাসের আমাদের রিসিভ করেছিল। আমরা প্রথমে গিয়েছিলাম নারানদার চা-দোকানে। পাশেই পরিতোষের রেডিমেড পোশাকের দোকান। ওখানে কবিতাপাক্ষিকও বিক্রি হয়। ওখানেই কবিতাউৎসবের ব্যানার লাগানো হল। শান্তনু মুজিবর রহমান এবং আমি , তিনজনের তৎপরতায়।

বহরমপুরে আমাদের স্থায়ী একটা থাকার ব্যবস্থা আছে, সেটা WBSEB গেস্টহাউসে। এটা সম্ভব হয় সন্দীপ বিশ্বাসের ব্যবস্থাতে। ওখানে আগেই নাসের আগেই রেখে গিয়েছিল আগের দিনে আনা পত্রিকার প্যাকেট।

সবাই মিলে গেস্টহাউসে পৌঁছনোর পর নাসের আর শান্তনু বেরিয়ে পড়ল পায়রার খোঁজে। বেশ কয়েকটি পায়রার দোকানে খোঁজখবর করার পর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল লোকনাথ মন্দির এবং অশোক সিনহার। বহরমপুর বাসস্ট্যান্ডে ট্রেকারগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে , তার পাশেই এই মন্দির। মন্দির সংলগ্ন জায়গাটি অনুচ্চ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভিতরে একটা বড়ো আমগাছ। গাছের ওপাশে একটি বাঁশের তৈরি মাচা।মাচায় দুজন বসে । এপাশে পায়রা থাকার কাঠের বাসা । বছর তিরিশের যুবক অশোক সিনহা। একহাতে চোট লেগেছে। অশোক-কে জানানো হল কাছেই ঋত্বিক সদনে কবিতাপাক্ষিক ৩০০ প্রকাশ উপলক্ষে কবিতাউৎসব আগামীকাল রবিবার।

সেদিন সকাল ১০টায় ঋত্বিকসদনের সামনে থেকে তিনটে সাদা পায়রা ওড়ানো হবে , সেই পায়রাগুলো যদি এখান থেকে পাওয়া যায় , ভালো হয়। 

অশোক সিনহা সব শুনলেন , বললেন : নিয়ে যাবেন তিনটে সাদা পায়রা। উড়িয়ে দেবেন। ওরা মন্দিরেই ফিরে আসবে। কোনো টাকাপয়সা দিতে হবে না। 

নাসের -শান্তনু যখন ফিরেছিল গেস্টহাউসে তখন আমরা খেতে চলে গিয়েছিলাম বহরমপুর লজে।ওরা অপেক্ষা না করে পৌঁছে গিয়েছিল বহরমপুর লজের খাবারঘরে। অতএব একত্রেই মধ্যাহ্নভোজন।

শনিবার সন্ধেতে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকের বহরমপুরে আসার কথা। কাটোয়া থেকে যারা আসবে তাদের খাগরাঘাট স্টেশন থেকে আনতে গেল সমরমাস্টার আর স্বপন দত্ত , মাস্টারের স্কুটারে।নাসের মৃণাল এমদাদউল মুরারি বাসস্ট্যান্ডে গেল শৌভিকদের জন্য। সন্দীপ সৌমিত্র শান্তনু আর আমি গিয়েছিলাম বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে।ট্রেনে আসার কথা : শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় নমিতা চৌধুরী ঠাকুরদাস এবং দেবাশিস দুই চট্টোপাধ্যায়ের , তাছাড়া রতন দাস গৌরাঙ্গ মিত্র ইন্দ্রাণী দত্তপান্না এবং শিখা-র।

জপমালা আর তপন উঠেছে ওদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। মৃণাল নিয়ে গেল সার্কিটহাউস এবং পি এইচ ই বাংলোয় যাঁরা থাকবেন তাঁদের।সার্কিট হাউসে থাকলেন উত্তরবঙ্গের অশেষ দাস শৌভিক সহ  দেবাশিস রতন আর বিশাল। কাছেই পি এইচ ই-তে থাকার ব্যবস্থা হল একতলায় গৌরাঙ্গ ও শিখার। দোতলায় নমিতা চৌধুরীও ইন্দ্রাণী দত্তপান্নার। আর WBSEB -র গেস্টহাউসে শুভাশিস শান্তনু মুরারি সৌমিত্র  ঠাকুরদাস এবং আমি। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেছিল এমদাদউল তার এক বন্ধুর হোটেলে। 

এই যে আমি এত কথা লিখছি , তা কিন্তু স্মৃতি থেকে নয় , সবটাই নাসের-এর লেখা থেকে কপি করছি।

এই কপি চলতে থাকুক।

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

কিছু বই কিছু কথা ২০৩ || নীলাঞ্জন কুমার || পলাশ কাঠের দোতারা || অপূর্ব কর

 কিছু বই কিছু কথা ২০৩ । নীলাঞ্জন কুমার



পলাশ কাঠের দোতারা । অপূর্ব কর । সংবাদ এখনই একাল । ষাট টাকা ।

জীবনের সায়াহ্নকালে এসে যখন কবি তাঁর কবিতার জন্য মনটাকে খোলা খাতা করে রাখেন ও অন্য কিছু নয় কেবল কবিতার ভেতরে অসম্ভব শান্তি অনুভব করেন তখন তিনি লেখেন:  ' প্রতিটি শহরের মাথায় থাকে আকাশ/  গ্রামের ওপর নীলাকাশ আর মানুষের পায়ের নিচে / কোরা কাগজ ' ( ' উৎসব চিঠি ')। অধুনা প্রয়াত কবি অপূর্ব করের ক্ষেত্রে তা দেখতে পাই তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ' পলাশ কাঠের দোতারা ' তে। আবার পাই: ' একটা নূতন পৃথিবী আসছে,  তোমার পায়ে যেটা পরানো হবে/  তুমি সেটার নাম দিতে পারো নূপুর ' (  ' নূপুর ') , ' আমাদের চারপাশে এখন  ভুল তরবারির চাষ - বাস ' ইত্যাদি আকর্ষণীয় কাব্যকণাগুলি । যা দিয়ে এই কবি পূর্ণতার দিকে যাওয়ার পথ যেন খুঁজে পান ।
               কবির কবিতার দীর্ঘ পথের কিছু কিছু নিদর্শন আমার পড়া আছে তাই অক্লেশে বলা যেতে পারে, অন্যান্য কবিতার বইগুলির থেকে এ বইটি অনেক আকর্ষণীয় কারণ তিনি এখন কবিতার বোধে অনেক পরিণত,  তা বুঝি,  ' অবিস্মরণীয়তা এক ক্ষণিক শব্দবন্ধ, /পদ্মপাতায় জল গড়ায়,  চিরকাল গড়িয়েছে / গড়িয়ে যায় ।' ( 'বিস্মৃতি ') , ' হরি হে আমাকে শুদ্ধ মোমবাতি করো না/  পান্তা ভাতও করো না,  ঠান্ডা সরবৎ বা রবীন্দ্রগানেরও ভক্ত/  ঝগড়ুটে করো , গ্যাঁক গ্যাঁক বাইক বা বধির,  বুকে থেকেও না থাকায়  নিরাসক্ত । ' ( ' আমাকে এখন করো ')  এসব পংক্তিতে ।
              অপূর্ব কর সেই জাতের কবি,  যিনি বরাবরই সরল ও তীর্যক দুই ভাবে লিখে গেছেন সাবলীলভাবে । তবে কোন কোন সময় অতিসরলীকরণ অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার প্রবণতা বিরক্ত উৎপাদন করলেও তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণবন্ত ও সুচারু । রিয়ালিস্টিক ঢঙে সাগরিকার প্রচ্ছদ বইটির মেজাজ ও মান বাড়াতে অসমর্থ । বিশাল হরফে বইটির নামাঙ্কন অস্বস্তিকর।


সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২০৫ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০৫.

 আর এসেছিল স্বরূপা দাস এবং তার হুইলচেয়ার।  জন্ম থেকেই তার পা-দুটি শরীরের ভার বহন করতে অক্ষম। তাকে কবিতাপাক্ষিক থেকে উপহার দেওয়া হয় গীতাঞ্জলি। পরের দিন সেও তার নিজের কবিতার বই উপহার দিয়েছিল দীপ , মুরারি এবং আমাকে।সেবার স্টলে বসে অনেকক্ষণ আড্ডা হয়েছিল অজিত হালদারের সঙ্গে। তিনি চিন রাশিয়া সহ ইউরোপের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন নিজ উদ্যোগে। সেসব একটি ছোটো পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল।

আগেই বলেছি মেলার প্রথম দিন ছিলাম উদয়ের বাড়িতে। শেষের চারদিন ছিলাম ল্যান্ড ডেভালেপমেন্ট ব্যাঙ্কের গেস্ট হাউসে । সেখানে ১২ ডিসেম্বর ২০০৪ রবিবার সকালে আমাদের পরিবারের মুরারি নিয়াজুল রসুল করিম তপন দাস এসেছিল। হয়েছে কবিতাপাঠ এবং আলোচনা। নিয়াজুলের ছেলেও এসেছিল তার আঁকা কিছু কার্টুন নিয়ে। কাটোয়া থেকে বাইক চালিয়ে তপন রায় এসে উপস্থিত হয়েছিল। তপনের কাছে জানা গেল ও পুলিশ লাইনে  একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে। পরিকল্পনা হল ওর ফ্ল্যাটে প্রতি মাসে একদিন করে বসা যাবে। সেই পরিকল্পনা কার্যকর করা যায়নি। কিন্তু পরের বছর বর্ধমান বইমেলার দিনগুলোতে আমি ওই পুলিশ আবাসনের ফ্ল্যাটে ছিলাম। সে-গল্প অন্য কোনো দিন। আর এবারের ব্যাঙ্কের গেস্ট হাউসটি পাওয়া গিয়েছিল দীপ সাউ-এর সৌজন্যে বা ব্যবস্থাপনায়।

বর্ধমান বইমেলার অনুষ্ঠান মঞ্চটির নামকরণ হয়েছিল ' কোজাগর '। রবিবার বিকেলে সেখানে বসেছিল সাহিত্য-আড্ডা এবং কবিতাপাঠের আসর। আড্ডায় অংশগ্রহণ করেছিল : দীপ সাউ মুরারি সিংহ মানব চক্রবর্তী তুষার প্রধান প্রকাশ দাস এবং আমি। সঞ্চালক : শ্যামলবরণ সাহা। কবিতাপাঠ করেছিল মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় গৌরাঙ্গ মিত্র সহ আরো বেশ কয়েকজন স্থানীয় কবি।মানব চক্রবর্তী তার গল্পলেখার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিল।

বর্ধমান বইমেলা মানে দীপ সাউ-এর একটা বিগসপার। যেটি দীপ তার বাড়ি থেকে নিয়ে আসতো।এই বিগসপারে আসতো দুটি ফ্লাক্স। চায়ের কিংবা কফির। একটা না-চিনি । যেটা মুরারি এবং আমার জন্য। অন্যটি হ্যাঁ-চিনি। অন্যান্য অভ্যাগতদের জন্য। শেষদিনে মুরারি-র স্ত্রী মঞ্জু গরমগরম সিঙারা এবং নরম নরম চিত্তরঞ্জন নিয়ে এসেছিল। 

দীপ-পুত্র পর্জণ্য নিজের ক্যামেরায় স্টলের ছবি তুলেছে। আর মুরারি কন্যা অনন্যা কবিতাপাক্ষিকের জন্য কবিতা দিয়েছিল আমাকে।

 মেলার মাঠ থেকে সাধনপুর হাউসিং প্রায় তিন কিলোমিটার। তখন রিক্সা ভাড়া ছিল কুড়ি টাকা। রোজ রোজ কেন দেওয়া হবে ! ঠিক হয়েছিল আমাকে গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিয়ে প্রতিদিন দীপ আর মুরারি হেঁটে গেছে সাধনপুর হাউসিং।

শেষ দিন মেলায় উপচে পড়া ভিড় । রাত ৯ টার পর আমার কাজ বা দক্ষতা। বই-এর পেটি বাধা এবং নির্দিষ্ট জায়গায় পেটি রেখে আসা।।দীপ-এর বাড়ি থেকে আসা বসার টুল , কিছু বই সব একটা রিক্সায় তুলে দেওয়া হল। দীপ বেরিয়ে পড়ল সেই রিক্সা নিয়ে। মুরারি ফিরল আমাকে গেস্টহাউসে পৌঁছে  দিয়ে সাধনপুর হাউসিং।

আমার কাছে বইমেলা মানে ছিল নতুন কবিদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং যোগাযোগ বাড়ানো। শুধুমাত্র কবিতাযাপনের একটা পর্ব হল বইমেলা।

শব্দব্রাউজ- ২৫ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ- ২৫ ।  নীলাঞ্জন কুমার



তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন ২৪।১১।২০২০ সকাল - ৭-৫৫ মিনিট । আজও প্রাত্যহিক সাদাসিধে একটি দিন । বৈচিত্রহীন জীবনের মধ্যে মনে মনে কোন পথ উঠে আসে । মনে ভাসে সেই বিখ্যাত গান ' এই পথ যদি না শেষ হয় '।


শব্দসূত্র : এই পথ যদি



'এই জীবন এমনি করে আর তো সয়না ' গাইতে গাইতে যারা হা-হুতাশ করে,তাদের ভেতরের দুঃখকে ঘরে রেখে কান্নাকে সামলে ভালোবাসা মাখিয়ে শান্ত করি । তারপর তাদের পথের স্বপ্ন দেখাতে শেখাই । বোঝাই পথ মানেই এগোনো , পথ মানেই চলাচল আর তার থেকে হতাশার মুক্তি । তখন পোষা দুঃখেরা আমাকে দোয়া দেয় , দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায় আর পথের গান গায় । তখন আমার আমিকে বিচিত্র লাগে , মনে হয় আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোনো পবিত্র সত্ত্বা ।যা আমাকে শেখায় ভালোবাসা বাঁটতে ।




দিক ভুল পথ থেকে ঠিক পথে আসতে কিছু সাধ্যসাধনার দরকার । ঠিক ভুলের সংজ্ঞা তখন আপনি আপনি মনে গাঁথা হয়ে যায় । বোকার হদ্দ শৈশব থেকে ধুরন্ধর পৌঢ়ত্বের যাত্রাপথ শেখায় হাজারো ভুলত্রুটি । হা হা হা এইতো ভবিতব্য সকলের ।পর্যটক হতে তো সবাই চায়,  পরিব্রাজক কতজনা!  আমরা স্বপ্নে সুখ- পথ দেখতে চাই, দিকভুল দেখলে চমকে জেগে উঠি।



যদি হারিয়ে যাবার জন্য পথে নামতাম, তবে কি বাস্তবে গেয়ে উঠতে পারতাম , ' এই পথ যদি না শেষ হয় '।


আটপৌরে কবিতা ৭০-৭২ || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৭০.
নিশীনাথ আজও কিশোর
রাত্রিকে
রূপালী মেধায় করেছে বিভোর

৭১.
আত্মসন্তুষ্টিতে বসে আছে
বাঘ
নিশীনাথ ভুলিয়েছে সব রাগ

৭২.
নিশীনাথ চালাচ্ছে নৌকো
মহালোকে
পৃথিবীকে মনে হচ্ছে মৌখোর

গ্লোবাল পলিটিক্স || দীপক মজুমদার || অন্যান্য কবিতা

 গ্লোবাল পলিটিক্স || দীপক মজুমদার




 বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববাসী ,

                       কোন টু-শব্দ না করে।

ধোঁয়াশার অন্তরালে ষড়যন্ত্রের প্রশ্নচিহ্ন ছিল !

 কোভিড-১৯ কুঁকড়ে খাচ্ছে আমাদের।

অথচ গোটাবিশ্ব সিদ্ধান্তহীনতায় ।

 ফাঁকামাঠে পেশীর আস্ফালন       

দেখাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

                 খেলা জুতসই নয়___     

গ্লোবাল পলিটিক্স-এ 'ড্রাগন' ক্রমশঃ এগিয়ে চলেছে  .....

মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২০৪ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০৪.

কবিতাপাক্ষিক ২৯৫ -এ প্রকাশিত হয়েছিল মুরারি সিংহ লিখিত একটি রিপোর্টাজ : বর্ধমান বইমেলায় কবিতাপাক্ষিক। আজকের নতুন পাঠক এবং নতুন বন্ধুদের জানা দরকার অতীত-কে। এটাও ২০০৪-এর ঘটনা। আমি মুরারি-র ওই রিপোর্টাজটির ওপর নির্ভর করে আমার স্মৃতি-কে পুষ্টিকর করতে চাইছি।

মুরারি লিখেছিল :

কলকাতা বইমেলার বয়স হতে চলেছে ৩০। আর বর্ধমান বইমেলার ২৭ ।

১০ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ২০০৪ ছিল সেবছর মেলার দিন। কাটোয়ায় জপমালা-তপন-এর বাড়িতে সযত্নে ন্যাপথলিন সহ কিছু বই রাখা ছিল।তপনের সঙ্গে আগেই কথা হয়েছিল , সেমতো ছোটো বড়ো ৫টি 

বই -এর পেটি এসে গেল বর্ধমান  তৎকালীন তিনকোণিয়া বাসস্ট্যান্ডে। বাসটির নাম : নন্দেশ্বরী , চালকের নাম আসরফ । তিনি বিনা ভাড়ায় পেটিগুলি নিয়ে এসেছিলেন তাই নয় , নিজেদের লোক দিয়ে পেটিগুলিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্ট্যান্ডের বাইরে।সেখান মুরারি ছিল। আমি গিয়েছিলাম ৭টা১৫ কর্ড লাইন লোকালে। আমিও বাসস্ট্যান্ডে ছিলাম। দুটো রিক্সাতে ভাগাভাগি করে সব পেটি সহ মেলার মাঠ। স্টল নম্বর ৫৭  । সেখানে ইতিমধ্যে কলকাতা থেকে দুষ্টু-র ট্রান্সপোর্টে পৌঁছে গেছে বই-এর ট্রাক।সেখানেও আমাদের পেটি ছিল। ইতিমধ্যে এসে গিয়েছিল দীপ সাউ। তারপর পেটি খুলে বই সাজানোর কাজ করেছিলাম সকলে মিলে। আমি দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম আমার শ্যালক উদয়ের বাড়িতে। মুরারি পাশের হোটেলে। তখন স্টলে দীপ একা।

আমাদের পাশের স্টল বাল্মীকি -আলোবাতাস যৌথভাবে।

সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বইমেলায় লোক জমতে শুরু আর কবিতাপাক্ষিক -এর স্টলে ভিড় জমিয়েছিলেন আগ্রহী এবং উৎসাহী মানুষজন। স্টলের মূল দায়িত্ব দীপ সাউ এবং মুরারি সিংহ-র। প্রথম তিনদিন এবং শেষ দু দিন আমি ছিলাম।একদিন করে গৌরাঙ্গ মিত্র এবং আফজল আলি।মুরারিকে একদিন যেতে হয়েছিল পটলডাঙায়।  সেদিন দীপ-কে সঙ্গ দিয়েছিল জমর সাহানি ও রণজিৎ দাস। এছাড়া বিভিন্নদিনে যাঁরা স্টলে এসেছেন আড্ডা দিয়েছেন তাঁরা হলেন : নিয়াজুল হক প্রশান্তি মুখোপাধ্যায় সজল দে কুমুদবন্ধু নাথ রমেশ তালুকদার শ্যামলবরণ সাহা প্রকাশ দাস মহম্মদ রফিক রূপলেখা মজুমদার সনৎ ভট্টাচার্য শুভ্রা সাউ শতরূপা চক্রবর্তী তপন দাস রসুল করিম রাজা দেবনাথ সংঘমিত্রা চক্রবর্তী নিগমেশ বন্দ্যোপাধ্যায় কুশল দে পম্পা দাসকান্ত অমিত নাথ অমিত বাগল ডা: গৌরাঙ্গ মুখোপাধ্যায় জাহাঙ্গির উৎপল সাহা স্বপ্নকমল সরকার কুনাল চক্রবর্তী কৌশিক নন্দন এবং সুদীপ্তা রায়নন্দন সঙ্গে তাদের শিশুকন্যা রাজেশ দে সন্দীপ লাহা সুব্রত চেল গৌর কারক সস্ত্রীক কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়। কাটোয়া থেকে একদিন এসেছিল তুষার পণ্ডিত অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ এবং রত্না মুখোপাধ্যায় সঙ্গে তাদের শিশুপুত্র যে এসেই সহজ সরল প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল : তোমাদের দোকানে এত বই কেন , খেলনা রাখতে রাখতে পারো না ?

এর কোনো উত্তর আমাদের জানা ছিল না তখন। আজ  জানি। বই-ই ছিল আমাদের খেলনা। আমাদের যাবতীয় খেলা তো বই-এর সঙ্গেই।

বাকিটা আগামীকাল

স্মৃতিগর্ভ || দীপক কর || অন্যান্য কবিতা

 স্মৃতিগর্ভ

দীপক কর



গ্রামীণ রেখাস্পর্শে কবিতার ছবি আঁকা আমার প্রিয় সাধ চিরকালের। সে-কোন ফেলেআসা সুদূরের মায়া। আজও

অন্তরে বৈরাগীর দোতারা বাজায়।


একটা মাছরাঙা-নদী  টলটল বয়ে যাওয়া গ্রামের আঁচল ছুঁয়ে। একটা পুকুরের বিশ্রাম  আম জাম তেঁতুল-ছায়ায়।

আমাদের রাঙা চোখ  জলকল্লোল-অবগাহন।


শালুকের হাস‍্য-লাস‍্যে মধুলোভী ভ্রমরের অশান্ত গুঞ্জন-ডানা

গাঙ চিলের ওড়াউড়ি  পাপিয়ার সূুরেলা বেদনা

এই সব মায়াচিত্র   কবিতার নির্যাস

ওঠে আসে ফেলেআসা কবেকার স্মৃতিগর্ভ থেকে।

কিছু বই কিছু কথা ২০২ || নীলাঞ্জন কুমার || জীবনের কাছে নিরুপায় || শুভ বসু || এখন মুক্তাক্ষর

 কিছু বই কিছু কথা ২০২ ।    নীলাঞ্জন কুমার




জীবনের কাছে নিরুপায় ।  শুভ বসু । এখন মুক্তাক্ষর । চল্লিশ টাকা ।


প্রয়াত কবি শুভ বসু- র কাব্যগ্রন্থ পড়তে পড়তে  একটাই কথা মনে আসে,  কত অপাংক্তেয় ও অগুণসম্পন্ন কবিতা লেখকবর্গ কিভাবে হাঁকডাক করে নিজেদের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মেতে উঠেছেন ও কিছু মানুষ ধরেকরে নিজেদের মূল্যায়নের বই প্রকাশ করেছেন নিজ খরচায় । কিন্তু কত ভালো কবি মূল্যায়নহীন হয়ে থেকে যাচ্ছেন, যেমন কবি শুভ বসু । যিনি লেখেন:  ' বাহান্নখান হতে চলেছেন সতী নন , খোদ ভারতবর্ষ,  '  ' সন্ধ্যাতারা মগ্নতায় বাজায় ভায়োলিন,  স্মার্ট ভঙ্গিতে বলতে গেলাম,  ' নেই সহজাত কবচ কিংবা কুন্ডল,  /  কর্ণ নই যে চাইবামাত্র দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । ' এর মত লাইনগুলো পড়ে  পাঠকবর্গের দিকে তাকিয়ে সপাটে বলতে ইচ্ছে হয় যে তারা এ নিয়ে চর্চা করে না,  অথচ একটু কষ্ট করে খুঁজে পেতে পড়ে ফেলতেই পারেন কবি শুভ বসুর ' জীবনের কাছে নিরুপায় ' , যাতে তারা একঘেয়ে হয়ে ওঠা প্রচুর পরিমানের কবিতা থেকে বেরিয়ে বাড়তি অক্সিজেন পেতে পারেন ।
               কবি প্রধানত জীবনের বিভিন্ন দিক দিয়ে চিন্তা করে গেছেন তাঁর মতো করে । কোন বাহাদুরি, শব্দের ঝনঝনানি , জীবনানন্দীয় ধারার ধার ধারেননি ।  সাদাসিধে আর কবিতা হয়ে ওঠা এই সব সৃষ্টিগুলির কাছে চেয়ে থাকি,  যেমন:  ' আমাদের ঈর্ষা বাড়ে । নিষেধে,  ঘৃণায়,  কাঁটাতারে / জীবন ওখানে যত মূল্যহীন হোক,  তবুও তো/  এখনো মৃত্যুর মানে আছে ' (জীবন্মৃতের দেশ থেকে)  ,'  কানে তালা ধরানো আওয়াজে হাওয়া যে ধ্বনি ছড়ায়/  তাকে মনে হয় যেন আদিগন্ত প্রসারিত মিছিলের -'না '। ( ' একটি মৃত্যুর এত তাপ ')।
            শুভ বসু গাঢ় অথচ প্রান্ঞ্জল  কবিতা কবি লিখেছেন আনন্দে ,  সৃষ্টির যন্ত্রণায় । নভেন্দু সেনের প্রচ্ছদ যথাযথ কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে ।

শব্দব্রাউজ ২৪ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ ২৪  ।  নীলাঞ্জন কুমার




তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন ২৩। ১১। ২০২০  সকাল সাড়ে আটটা । প্রাত্যহিক জীবনযাপনের ভেতর সৃষ্টির উল্লাস থাকলে তা অভ্যাসে পরিণত হতে দেরি হয় না ।
আমি উল্লাস থেকে গভীরে যাওয়ার অভ্যাসে রত ।


শব্দসূত্র   :  উল্লাস এখন গভীরে



দু'কলি লিখলেই যদি প্রকৃত সৃষ্টির উল্লাস থেকে যেত, তবে সব লেখার ভেতরে উন্মাদনা থাকতো । উল্লাস করা যাদের সহজাত তাদের ভেতরের গভীরতা নিয়ে সন্দেহ হয় । তাদের সৃষ্টির শ্রমের বিন্দু বিন্দু ঘামরক্ত কি মাটিতে মিশে মিলিয়ে যায়?  তারা লাইন দেয় সেই অজ্ঞাত সৃষ্টিকর্তা হিসেবে যাদের সৃষ্টি কেউ কোনদিন মলাট খুলে হয়তো দেখবেই না । দু'কলি লেখার উল্লাস  আর ' সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ' র ভেতরে যে হাজারো প্রভেদ তা কোন হরিপদকে বললেও বুঝবে না ।



যারা এখন সব সৃষ্টিই মনে করে গোবর্ধন মার্কা,  তারাই দশ বছর পর তা মাথায় নিয়ে নাচতেই পারে । আজ না হয় গলাধঃকরণ করব গরল । পরে অমৃত স্বাদ পেলে সুখ আসবে ।



যারা গান শোনে ' গভীরে যাও আরো গভীরে যাও' তারা কি কোনওদিন ভাবে গভীরে যেতে যেতে  কতখানি গভীরে যাওয়া যায় ? না কি গভীরের গান শোনার পর তারা ' আমার বাড়ির সামনে দিয়ে মরণযাত্রা ' গানে মিশে যায় । বইপাড়ার হাজার হাজার অগভীর বই কেমন পৃথিবীর বইয়ের  দোকানে সাজানো থাকে!  তাদের নিয়ে মেতে ওঠে অগভীর হাজারো পাঠক ।

আটপৌরে কবিতা || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৬৭.
নিশীনাথ লিখছে পদাবলী
রাজপথে
আঁধারে চলেছে এই বলাবলি

৬৮.
হৃদয় থেকে হৃদয়ে
নিশীনাথের
মূর্ত বিমূর্ত আলোকিত রহে

৬৯.
নিশীনাথের কতো নাম
লিঙ্গের
ভিতরেও আছে তার ধাম

সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০

হার্ট প্ল্যান্ট || পার্থ সারথি চক্রবর্তী || অন্যান্য কবিতা

হার্ট প্ল্যান্ট 

পার্থ সারথি চক্রবর্তী 


আমার কোন সাজানো বাগান নেই।
শুধু আছে হৃদয়ভূমিতে জন্মানো কিছু-
         নামহীন অজানা গাছ।
যেগুলোকে আমি আগাছা বলি না,
বা পরগাছাও বলি না, বরং 
        আগলে রাখি পরম যত্নে।
তুমি আসার সঙ্গে যে ঝোড়ো হাওয়া 
নিয়ে আস সাথে ক'রে, তাতে দুলে উঠলেও 
        উপড়ে যায় না কিছুতেই ।
আমার কাছে ওরাই যে মহার্ঘ্য, দুষ্প্রাপ্য 
কিছুতেই হারিয়ে যেতে দিইনা তাদের
        ভাবছি,হার্ট প্ল্যান্ট নাম দেব ওদের। 

শব্দব্রাউজ ২৩ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ ২৩  ।  নীলাঞ্জন কুমার



তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন ২০।১১।২০২০ সকাল  ৮-১৫ মিনিট । মুখোমুখি দেখার সঙ্গে ভার্চুয়াল দেখার সম্পর্ক পার্থক্য নিয়ে ভাবনা চলছে । আজ নির্মেঘ নির্জন পরিবেশ । গোছাতে পারছি ভাবনাগুলো ।



শব্দসূত্র -  ভার্চুয়াল অবয়বের ভেতর


ভার্চুয়ালি যা আসে তার ভেতর অনন্ত উপলব্ধি আসে না । ভার্চুয়াল পদ্ধতি যা দেখায় তাই দেখি বলে অতৃপ্তি চারায় । যেন অন্যের আনুগত্যে দেখাশোনা । দেখার মুক্তি কেবল বাস্তবে বলে আকুলি বিকুলি করে সব কিছু দেখার তাগিদে । দেখার পর সমস্ত নিউরোন যখন স্পর্শ করতে লালায়িত তখনও  বাস্তব প্রয়োজন । ভেতরে ভেতরে বড় কষ্ট , কাকে বোঝাই ...


যন্ত্র কিভাবে চোকাবে মানুষের সামগ্রিক অবয়ব ? কৃত্রিমতার ভেতর দিয়ে আক্ষেপ ছুটে আসে । যন্ত্র বুঝি সত্যিই যন্ত্রণা বয়ে আনে । সুইচ বন্ধ করলেই একরাশ অন্ধকার চোখের সামনে । অবয়বের স্বাদ মেটাতে মুখোমুখি দেখার আগ্রহ ছুটিয়ে মারে । প্রেমহীন , স্বাদগন্ধহীন এক তুচ্ছ যন্ত্র অবয়ব চেনায়,  কি হাস্যকর!


ভেতরে ভেতরে ভাঙচুর করি ভার্চুয়াল জীবনের বাইরে যেতে । তবু ভার্চুয়াল জড়ায় কি করে! যন্ত্র স্বাদে অভ্যস্ত হই । যন্ত্র সময়ে মিশে যাই ।

আটপৌরে কবিতা ৬৪-৬৬ || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৬৪.
ধুলোর শহরে পূর্ণতর
নিশীনাথ
মৃত্যু হতে জেগেছো খরতর

৬৫.
নিশীনাথ আমার স্বহৃদয়
গভীরতর
অন্ধকারে দূরীভূত করে ভয়

৬৬.
তোমাকেই বলেছি নিশীনাথ
আপেলহীন
সত্ত্ব অবিরাম দেখি কুপোকাত

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২০৩ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০৩.

কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলার দ্বিতীয় দিনে ছিল সেমিনার। বিষয় : বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ।

আলোচক ছিলেন : মুরারি সিংহ উজ্জ্বল সিংহ কমলকুমার দত্ত নিয়াজুল হক প্রমুখ।আলোচনাটি বেশ উপভোগ্য হয়েছিল। মুরারি বলেছিল :

' প্লেটো কবিদের নির্বাসন চাইলেও তা সম্ভব হয়নি কোনোকালে। হকিন্স কিছুদিন আগে বলেছিলেন কবিদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এক মহিলা সে-কথাটি হকিন্সকে ফেরত নিতে বাধ্য করেন। প্রতি যুগেই এই সংকট ছিল , থাকবে।আমাদের মনে রাখতে হবে প্রভাতদার কবিতার এই অবিস্মরণীয় লাইনটি :

মানুষ যতদান পর্যন্ত স্বপ্ন দেখবে ততদিন কবিতাও থাকবে ।'

অন্যান্য বক্তারাও একই রকম বা কবিতার ভবিষ্যৎ-কে উজ্জ্বল বলেছিলেন।

সময়ের স্বল্পতার কারণে প্রায় মাঝপথেই আলোচনাটি বন্ধ করে দিতে হয় , যা উপস্থিত অনেকের মনখারাপের কারণ হয়।

কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলায় সেবার কাটোয়ার স্থানীয় কোনো সমান্তরাল পত্রিকার দ্যাখা পাওয়া যায়নি।  এমনকী ' অজয় ' ও অংশগ্রহণ করেনি।একারণে মতিউল্লাহ্ র মোটরবাইকে চেপে হাজির হয়েছিলাম অজয়- সম্পাদক তারকেশ্বর চট্টরাজের  বাড়িতে। সারা বাংলার সঙ্গে কাটোয়া কেন যুক্ত হতে পারলো না এই  জানার আগ্রহ থেকেই তারকেশ্বরের বাড়ি গিয়েছিলাম। অজয় সম্পাদক তার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছিলেন।

কাটোয়া-র একটা প্রধান দ্যাখার জায়গা হল অজয় নদ যেখানে ভাগীরথী-র সঙ্গে মিশেছে , সেই সংযোগস্থল । এই তীর্থের সন্ধান আমাকে দিয়েছিল মুহম্মদ মতিউল্লাহ্।কাজেই আমি এখন মতি এবং আমার সংযোগের অন্যতম একটি প্রধান সূত্র মনে করি এই শাঁখাইঘাট।

মতি তখন কাটোয়া পৌরসভার অতিথিনিবাস শ্রাবণী-র কাছাকাছি কাটোয়াপড়া এবং মনসাপাড়ার মাঝামাঝি একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতো। প্রথম প্রথম আমি শ্রাবণী-তেই উঠতাম। আর সকালে উঠি হাঁটাটা ছিল আবশ্যিক। মতি-ই প্রথমবার পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ভোর ভোর। আমরা কুয়াশা -পথে পৌঁছেছিলাম সেই তীর্থে। মোটর লাগানো  নৌকায় ওপাড়ে শাঁখাই। একটা  শীর্ণ পিচরাস্তা। দু-কিলোমিটার হাঁটা , ফিরে আসা। এটাই ছিল আমার রুটিং । যতবার কাটোয়া গেছি ততবার এই তীর্থে গেছি আমি। কেবলমাত্র শেষবার পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। সঙ্গে মতি ছিল না বলেই।

আর ফেরার সময় বা হাঁটা শেষ করে একটা দোকানে চিনি ছাড়া চা। সঙ্গে লোকাল বিস্কুট। বাধা দোকান। চিনে গিয়েছিল। কুশল বিনিময় হত।

একবার মতি-র সঙ্গে বাইকে স্টেশনের কাছে চক্রবর্তী টি স্টলেও চা খেয়েছি। আর শাঁখাইঘাটে এক পানদোকানির কাছে গেলেই পেয়ে যেতাম পান ।কারণ চায়ের দোকানে ঢুকতে দেখেই সে পান রেডি করে রাখতো।

তো সেবারও পুরো টিম , নাসের মুরারি অম্বিকা অভিজিৎ সমরমাস্টার স্বপন দত্ত নিখিল সহ মতি এবং আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম শাঁখাইঘাট। আর ২ মাইল হাঁটার পর নির্দিষ্ট চা-দোকান। দোকানির সঙ্গে কুশল বিনিময়। চা-পান। 

এখন একবার গেলে হয়। আমার নতুন নবীন বন্ধুদের সঙ্গে !

কিছু বই কিছু কথা ২০১ || নীলাঞ্জন কুমার || দুই স্রোতের এক মোহনা || পঙ্কজ মন্ডল ও অমলেন্দু বিশ্বাস

 কিছু বই কিছু কথা ২০১। নীলাঞ্জন কুমার




দুই স্রোতের এক মোহনা । পঙ্কজ মন্ডল  ও অমলেন্দু বিশ্বাস । নৌকা । আঠারো টাকা ।



দুই সমসাময়িক কবিকে যখন একই বইতে পাওয়া যায় তখন দুই কবির ভেতর একটা তুলনা আপনা থেকেই চলে আসে । তাকে পরিহার করে যদি আলাদা ভাবে বিশ্লেষণ করি তবে তাদের স্বাতন্ত্রতা বেশি করে ফুটে উঠবে বলে মনে করি । যেমন কবি পঙ্কজ মন্ডলের আজ থেকে এগার বছর আগের কাব্য প্রকৃতি সঙ্গে পরিচিতি ঘটাতে গিয়ে দেখি তিনি আজকের জায়গা থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে ছিলেন , আজকের কবিতায়  তাঁর প্রধান রোগ তৎসম শব্দের আনুগত্য তাঁকে জড়িয়ে ধরলেও তা কিন্তু অচেতন ভাবে হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি এখানে  পরিহার করেছেন,  যেমন:  ' সন্তানও কখনো সখনো পিতা হয়ে যায়/  সিংহটি কখনো রিং মাস্টার হয় না । ' ( ' স্বপ্নকথা ')  যা পাই তাঁর ও অমলেন্দু বিশ্বাসের যুগ্ম গ্রন্থ ' দুই স্রোতের এক মোহনা ' (২০০৯ সালে প্রকাশিত)  কাব্যগ্রন্থের মধ্যে । পঙ্কজ মন্ডলের বাকি কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মনে করি এই সব পংক্তিতে : ' চিকিৎসক নিরুপায় হলে/  রুগীদের মুখগুলি কিভাবে বদলে যায় , জানো?' ( ' আরোগ্য ') ফেটে যাওয়া বেলুনের রঙ পরে থাকো/  ছেঁড়া ঘুম নিয়ে । ' ( ' আকাঙ্ক্ষা '), ' রাত্রি ঘনতর হলে/  সৃষ্টি হয় ভাঙা পাত্রে অলীক আবেগ ।' ( ' অন্যরূপ ')।
            পাশাপাশি অমলেন্দু বিশ্বাসের কবিতা অনেক সুসংবদ্ধ । তাঁর কবিতার গভীরতা তন্নিষ্ঠ করে :  ' ওই দ্যাখো ভোর চোখে দোর খুলে এখনো একাকী/  আমার আত্মজ আঁকে নতুন মাটির পদাবলী .... ' ( ' নতুন মাটির পদাবলী ')। ' সপ্ত ঘোড়া সূর্যাস্তের লাগাম রয়েছে এই দ্যাখো-  / প্রত্যয়প্রবর হাতে ফিরিয়ে দেবেই সূর্যোদয়ে । ' (' শ্রী,  রাত্রিজল ') ,  ' আসলে ভাষার নিচে কবিতা হৃদয়/  মাদুর বিছিয়ে রেখে দু'দন্ড জিরোয় .... ' ( ভাষা,  সীমান্ত মানে না ') -র উৎকৃষ্টতা ।
                 পঙ্কজ মন্ডল ও অমলেন্দু বিশ্বাসের কবিতার ভেতর দিয়ে দুই কবির যে কবিতা চর্চা তাঁদের দুই বিপরীত স্রোতে নিয়ে যায় । কার্যত সেখানে বইটির নামকরণ সুপ্রযুক্ত । হিমদল রায়ের প্রচ্ছদ সেই স্রোত চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন মাত্র ।

রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

কিছু বই কিছু কথা ২০০ || নীলাঞ্জন কুমার || অতিকথনের রাত্রি || সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়

 কিছু বই কিছু কথা ২০০ ।  নীলাঞ্জন কুমার




অতিকথনের রাত্রি । সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়
। কবিকন্ঠ প্রকাশনী । কুড়ি টাকা ।

' পুরোনো চিঠির মতো, বিক্ষত/  প্রাণ এক,  জেগে আছি দূরে/  নির্জনে ' ( ' খড় ') , ' তোমার কথার মাঝে আশ্চর্য পাখি/  চোখের মাঝে কল্পতরু পাপ ' (  মেঘবদল  ') -এর মতো উজ্জ্বল পংক্তি যখন একজন তরুণ কবি লিখে চলেন তাঁর কাব্যগ্রন্থে , তখন তাকে বড় আপন বলে মনে হয় । সেই অবস্থা দাঁড়িয়েছে উক্ত পংক্তিগুলির কবি সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ' অতিকথনের রাত্রি ' নামে কাব্যগ্রন্থটিকে পড়ে , যা প্রকাশ হয়েছিল  বারো বছর আগে । আসল কথা হলো,  কবিতা বুঝতে গেলে যে জাত প্রয়োজন ,  লিখতে গেলে যে অসাধারণত্ব দরকার তা এই কবির ভেতরে বহমান বলতেই হয় । তাই, ' ভেসে যাক প্রেমিকের মতো, সন্তানের মতো/  অনন্তকাল । ' ( কাঠজন্ম ') , ' তোমার আমার মাঝে/  বয়ে চলে মিসিসিপি,  বয়ে চলে মার্চিং সং ' ( 'এষা ') -র প্রেমোচ্চারণ মগ্ন হয়ে পড়লে সচেতন পাঠককে সমৃদ্ধ করবেই ।
                  সবচেয়ে বড় কথা কবির কোন আদিখ্যেতা নেই উচ্চারণে । জাগলারি আর ওপরচালাকিরও দেখা নেই । যেন ভেতরে থেকে অবিরাম গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাসের মতো । তাই কত স্বাভাবিকভাবেই তিনি দুরূহ শব্দ অবলীলায় লেখেন:' বিকেল বেলায় এ তরণী/  ভাসতে পারে দু-চার আনায়/  আগলে রাখা জিন্দেগানি । ' ( ' কৃষ্ণকলি ' ) তন্নিষ্ঠ
করে ।
      সমালোচনা মানে কেবলমাত্র ভুল ধরা ও তিরস্কার করা যারা মনে করেন তা যে ভুল, তা এই কাব্যগ্রন্থের মতো কাব্যগ্রন্থ হলে বুঝিয়ে দিতে অসুবিধে হয় না । কবি প্রশংসাযোগ্য  তখনই হন যদি খুঁজে পাওয়া যায়:
' করুণা ও নিয়তির মাঝে/  একা একা বেঁচে থাকে বৃদ্ধ শামুক ।' ( ' নষ্টচিত্র ' ) , ' দেখো তোমার স্তন খুবলে খাচ্ছে/  হিসাবি সময় ' ( ' নগরিয়া ') র মতো পংক্তি । প্রচ্ছদ তাকিয়ে থাকার মতো । কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ কিরকম করা যেতে পারে তার শিক্ষা এর থেকে নেওয়া যেতে পারে ।

আটপৌরে কবিতা || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস




৬১.
সোনা মুগ খাই
বিরহ
বলে শুধু পালাই পালাই
৬২.
কী দিয়ে খাবো
ভাত
সোনা মুগ দিয়েছে বরাত
৬৩.
মুখে যখন সবকিছুই
তেতো
সোনা মুগে হয়েছি রত

শব্দব্রাউজ ২২ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ ২২ । নীলাঞ্জন কুমার




তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন ২১। ১১।২০২০ ১০টা ১৫মিনিট । কিছু পড়াশোনা,  ফোনালাপ। নিভৃত চর্চার মধ্যে থাকার ইচ্ছে বাসা বাঁধে । হাতে তুলে নিই সস্তা কলম, মেঘলা বিষন্ন আকাশ চোখের সামনে ।



শব্দসূত্র : নিভৃত জীবন সূচি



নিভৃতে নিজেকে ধরে রাখতে চাইলেও যখন রাখা যাচ্ছে না, তখন বড় বেশি পরমানন্দ সরস্বতীরকবিতার তিনটি লাইন মনে হয় : ' এমন কিছু শব্দ দিতে পারো / যাতে কোন শব্দ নেই/  ক্লান্ত আমি শব্দে শব্দে ক্লান্ত ! ' শব্দ কিংবা যোগাযোগের ভেতর থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজি পথ। বড়ো অসোয়াস্তি সারাদিন হাজারো অবাঞ্ছিত উন্মাদনায় । শুধু প্রার্থনা নিভৃত যাপনের......


জীবন কোনদিন তৃপ্ত হবে না,  তবু প্রতিটি শব্দের কোলাহল মানিয়ে নিয়ে যাপন করা পোষায় না । কানের সামনে হাততালি দেওয়ার অসহ্য ক্ষণ  দুঃখের সময় চিনিয়ে দেয় । বাঘের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙা আতঙ্ক কি কোলাহলের থেকে বড় অসহ্য ?  নিভৃতি আমার প্রেম ।তাকে জড়িয়ে চুমু খেতে চাই ....


সূচিই বলে দেয় তার ভেতর নিভৃতি কতখানি । এখন আমায় ধোঁকা দেওয়া যাবে না । বাছি প্রকৃত । বাদবাকি কোলাহলে মিশিয়ে দিই ।


সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য ২০২ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক গদ্য

সৌমিত্র রায়- এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী




২০২.

সে বছর কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলার উদ্বোধন করেছিল আমার বিশেষ সুহৃদ রতন বসুমজুমদার।

এরপর ছিল কবিতাপাক্ষিকের ' অরুণ মিত্র -র সঙ্গে 

৫ নভেম্বর '।

' মানুষ যতদিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখবে ততদিন কবিতাও থাকবে '  ব্যানারটি মঞ্চের একপাশে আটকে দিয়েছিল ভগবাহাদুর সিং। আর মঞ্চের যেখানে চালচিত্র এঁকেছিল শিল্পী তাপস দাস , তার একপাশে  লাগানো হল কবিতাপাক্ষিক আর নীচের দিকে 'অরুণ মিত্র-র সঙ্গে ৫ নভেম্বর ' । 

কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলায় কবিতাপাক্ষিকের এই অনুষ্ঠান শুরু হল জপমালা ঘোষরায় -এর গাওয়া রবীন্দ্রগান দিয়ে । এরপর কবিতাপাক্ষিকের প্রধান সম্পাদক মুরারি সিংহ কিছু বক্তব্য বলেছিল। বিশিষ্ট কবি এবং কথাকার দীপংকর ঘোষ-এর হাতে অরুণ মিত্র স্মারক সম্মান তুলে দিয়েছিলেন কবি এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা : গোবিন্দরাম মান্না। আমাদের অনুরোধে দুজনেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য বলেছিলেন। নতুন পত্রিকা ' পোতাশ্রয় ' - এর প্রথম সংখ্যাটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেছিল তুষার পণ্ডিত। লিটল ম্যাগাজিন কী এবং কেন কেন্দ্রিক কিছুকথা বলেছিলাম আমি। অরুণ মিত্র-র কবিতা পাঠ করেছিলেন মুরারি সিংহ স্বপন দত্ত এবং দীপ সাউ। পড়ার কথা ছিল মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ গৌরাঙ্গ মিত্র আফজল আলি এবং নাসের হোসেনের। সময়াভাবে এদের পড়া হয়নি। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছিল গৌরাঙ্গ মিত্র।

সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা তথা পরিচালনা ছিল নাসের- এর।পরের অনুষ্ঠান মেলা কমিটির আয়োজনে লোকগান।  সব শেষে কবি জয়দেব বসু- র সাক্ষাৎকার। রাজনীতি কবিতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেছিলাম তুষার এবং আমিও।

 পরের দিন শনিবার , ৬ নভেম্বর ২০০৪। বেলা ৯টা নাগাদ কবিতাপাক্ষিক টিম পৌঁছে গিয়েছিল জপমালা-তপনের বাড়ি। সকালের জল ও খাবার = জলখাবার।

গিয়েছিলাম : নাসের অম্বিকা মুরারি গৌরাঙ্গ সমরমাস্টার নিখিল স্বপন দত্ত এবং আমি। আয়োজন : লুচি তরকারি মিষ্টি কফি প্রভৃতির বিশাল সূচি। মধ্যাহ্নভোজনও ওখানেই।

জপমালার শিষ্য গেয়েছিল : একী লাবণ্য / এসো শ্যামল সুন্দর / তোমার খোলা হাওয়ায় / আমি কান পেতে রই ও আমার /একদিন যারা মেরেছিল তারে রাজার দোহাই দিয়ে ।

জপমালা গেয়েছিল :

ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে / এই তো তোমার প্রেম / এই তো তোমার প্রেম/ ধীরে ধীরে প্রাণে আমার এসো হে / উতল হাওয়া লাগলো গানের তরণীতে। 

 এরপর জপমালা এবং মানবেন্দ্র  একত্রে গেয়েছিল 

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে। জপমালা-তপনের মেয়ে শ্রীতমা খুব মুডি ছিল সেসময়। তার মুড ঠিক হবার পর তার নাচ। জপমালা গেয়েছিল নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগলো ,সঙ্গে শ্রীতমার নাচ। বেশ জমে গিয়েছিল।আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম তথা শুনেছিলাম। তবলাবাদক ছিল জপমালাল আরেক শিষ্য ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি। বেলা ১১টা নাগাদ বহরমপুর যাবার ট্রেন ধরেছিল নাসের নিখিল স্বপন আর সমরমাস্টার।

এরপর শুরু হয়েছিল ক্লাসিক্যাল।টপ্পা ঠুংরি গজল এবং খেয়াল , তারানা সহ। গেয়েছিল মানবেন্দ্র এবং জপমালা। সবটাই ছিল আমার অনুরোধ মতো।

নস্টালজিয়া ২৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ২৫

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



আকাশ দেখতে ভালবাসি সেই কবে থেকে তা আমার মনে পড়ে না। ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখার নেশা খুব ছোটবেলা থেকেই। এসব ছিল  আমার একান্তই ব্যক্তিগত ভালো লাগা । আমাদের বাড়ির চারপাশে এত ঘরবাড়ি ছিল যে বিছানায় শুয়ে তেমনভাবে আকাশ দেখতে পেতাম না। কিন্তু আমাদের একটা ঘরের দরজা দিয়ে খাটে শুয়ে  প্রতিবেশী গণেশদাদের একতলা বাড়ির ছাদ টপকে ফটো প্রেমের মতো একফালি  আকাশ তখন  দিব্যি  দেখা যেত। আমি আর বোন সেই খাটে শুয়ে  বর্ষার আকাশে  মেঘে মেঘে  কত ছবি আঁকতাম !  ভাগ্যিস আমরা বড় হবার পরে গণেশদার বাড়িটা দোতলা হয়েছিল না হলে আকাশ উপভোগের  ঐটুকু আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতাম। 

বাবার কথা বলতে গেলেই আমার একজন হাসিখুশি  কর্মী মানুষের মুখ ভেসে আসে। আমার ছোটবেলায় বাবা অফিস , সংসারের বাইরের কাজকর্ম নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকত । তবে  অফিস থেকে ফিরে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াতো আমাদের।  ভাইবোনদের মধ্যে  আমাকে বাবা একটু বেশি ভালোবাসত বলে আমার মনে হতো। ছুটির দিনে বাবা আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ কাটাতো, সময় দিত আমাদের। বিকেলে আমরা বাবার সঙ্গে  গঙ্গার ধারে হাজারদুয়ারির মাঠে  বেড়াতে যেতাম। গঙ্গার পারে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম আর দেখতাম দলে দলে আকাশপথে বাসায় ফিরে চলেছে পাখির ঝাঁক। অনেক দূরে দূরে ভেসে যেত খেয়া পারাপারের নৌকা। 

ছোটবেলায় মনের ভাবনার কোনো পরিধি থাকে না বলে  মন যা ইচ্ছে তাই ভাবতে পারে। তখন আমিও কত কিছু ভাবতাম এই সব পাখিদের সারাদিনের উড়ে চলা নিয়ে।  সম্ভব অসম্ভবের বেড়াজালে মানুষ আটকে যায় বড় হয়ে বুঝতে শেখার পর। আমার ছোটবেলায় কোনো  জিনিসের চাহিদা ছিল না। কখনও কোনো জিনিসের জন্য আবদার করেছি বলে মনে পড়ে না।  আজও সেই অভ্যাস থেকে গেছে। কোন কিছুই আমার বলে জোর করে  চাইতে পারলাম না বলে বঞ্চিত থেকে গেলাম অনেক কিছু থেকেই ।

বন্ধু || জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় || অন্যান্য কবিতা

বন্ধু    

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়



এক একদিন ভাবি তোমার গায়ে একটা

সাপ ছুঁড়ে দেবো।

ব্ল্যাক মাম্বা না পারি নিতান্ত ঢেমনা ছুঁড়বো

তুমি বন্ধু চিনবে না বুবকার পোল ভল্টে

দরজা পার আর কেঁচোদের অট্টহাস নয়তো

দুর্বল কয়েকটি হেলে দুলে দুলে রামায়ণ

তোমার সাঁতালি পর্বত কি এতই দুর্ভেদ্য?

 

এমন নয় তোমার ঘরে কেউ যাবে না

যে কেউ যেতে পারে হাতে ধরা মুঙ্গের বা চীন

ভালোবাসার সাদা হাত কালো বন্দুক......


বিকেলের নিমকাঠ গরম আগুন পাথর পোড়ে

জানি তোমার ডানপায়ে চারটে স্টিলপাতি

আর আটখানা স্ক্রু মেড ফর ইচ আদার

ভালোবাসা তো পুড়বে না লাল বা কালো হবে

কিছুটা বিকৃত হাড় ছাইপাঁশ নিয়ে কালোপাত

ত্রিবেণীতে গেলে আমরা দেহতত্ত্ব ছেনে খাবো

সারাজীবন সততাসহবাসের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির

বন্যায় অপ্রিয় বন্ধু তুমি অমরত্ব নিয়ো।




শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০

পুরনো গরিমা || ফটিক চৌধুরী || অন্যান্য কবিতা

পুরনো গরিমা

ফটিক চৌধুরী



আমরা ভুলে যাই সেই সব

           পুরনো গরিমা

ভুলতে তো কোন বাধা নেই

ধূসর ধুলোর প্রলেপ কে আর

                       সরিয়ে দেখে !


শৈশব কেটেছে ধুলোবালিতে

        সারা গায়ে মেখে

                       কী নির্বিকার !

এখন নেই সেই ধুলোর গরিমা

সযতনে এড়িয়ে চলি, অথচ

মনের ভেতরে জমেছে যে পলি

তার উর্বরতা নিয়ে কত কথা বলি

 অথচ এই পলিই গড়েছে সভ্যতা

  অথচ সেই সভ্যতা আজ সর্বনাশ।


আমরা ভুলে যাই সেই সব

            পুরনো গরিমা

ধূসর ধুলোর কথা কে আর মনে রাখে !

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য ২০১ || প্রভাত চৌধুরী || ধারাবাহিক বিভাগ

সৌমিত্র রায় -এর জন্য গদ্য

প্রভাত চৌধুরী



২০১.

এবার শুরু করছি বেশ কিছু টুকরো খবর পরিবেশন করতে। যেখবর এখনো বৃহৎ সংবাদপত্রের শিরোনাম হবার যোগ্যতা অর্জন করেনি। কিন্তু আমার জীবনে এইসব ঘটনা বা ঘটনার সংবাদ  গুরুত্ব অপরিসীম। তার অনেকগুলি আগে লিখেছি। বাকিগুলির কিছু নির্বাচিত এখন।

২০০৪-এর ৫ থেকে ৭ ছিল কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা। কবিতাপাক্ষিক সেই মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে সকাল সকাল ট্রেন ধরেছিলাম। ওই একই ট্রেনে গিয়েছিল নাসের হোসেন  ও গৌরাঙ্গ মিত্র। ভেটেনারি মেডিকাল কলেজের  শিশির পাল সহ কয়েকজন ছাত্র ' পোতাশ্রয় ' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিল। সেটির প্রথম সংখ্যার প্রকাশও কাটোয়ার ওই লিটল ম্যাগাজিন মেলা-মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। সেই রকম ঠিক হয়েছিল। কবি অরুণ মিত্র-র মৃত্যুর পর ' অরুণ মিত্র  -র সঙ্গে ' এবং অরুণ মিত্র স্মারক সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানও ওই মঞ্চে নির্ধারিত ছিল। পোতাশ্রয় - সম্পাদক শিশির পাল নতুন চাকরিতে জয়েন করার জন্য কাটোয়া যেতে পারেনি। গিয়েছিল অম্বিকাপ্রসাদ মিশ্র বিবেকানন্দ দাস এবং অভিজিৎ সামন্ত।

গৌরাঙ্গ বাড়ি থেকে টিফিন করে নিয়ে গিয়েছিল। সেটি ভাগাভাগি করে খাওয়া হল। তাছাড়া টুকটাক আরো কিছু। ওই ট্রেনেই গিয়েছিল ঘোড়সওয়ার সম্পাদক উজ্জ্বল সিংহ , দাহপত্র সম্পাদক কমলকুমার দত্ত।

লোকাল পৌঁছল ১২টা নাগাদ। স্টেশনে কবিতাপাক্ষিকের আত্মজন তুষার পণ্ডিত মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ প্রমুখ কয়েকজন।

ওখান থেকে লজ অশোক। কবি অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় - এর কর্ণধার। ওখানে প্রথমে দুটি ঘরের ব্যবস্থা হয়েছিল কবিতাপাক্ষিকের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে  বর্ধমান থেকে এসে পড়েছিল দীপ সাউ এবং মুরারি সিংহ। বহরমপুর থেকে নিখিলকুমার সরকার স্বপন দত্ত সমরেন্দ্র রায়। এসেছিল আফজল আলি।জমজমাট টিম কবিতাপাক্ষিক। সঙ্গ দিয়েছিল শিল্পী তাপস দাস।

কাটোয়া বইমেলার অবিক্রিত কিছু বই  ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়নি। ওগুলো ছিল জপমালা-তপনের বাড়িতে। সেসব আনতে গেল মতিউল্লাহ্ ।তাছাড়া ট্রানপোর্টেও বই এসেছিল ।

বই সাজাবার দায়িত্বে ছিল দীপ সাউ আফজল গৌরাঙ্গ মুরারি নাসের পোতাশ্রয়-এর নবীনরা এবং অবশ্যই আমি। স্টলের পেছনে কবিতাপাক্ষিক এবং পোতাশ্রয় -এর ব্যানার ছিল। 

ওইদিন মঞ্চে ছিল অরুণ মিত্র -র সঙ্গে ৫ নভেম্বর। ব্যানারে আগে ছিল ২ নভেম্বর , যা গত বছরের। এবার সেই ২ -কে ৫ করার দায়িত্ব পালন করেছিল তাপস দাস।

মেলার কথা আগামীকাল।

শব্দব্রাউজ ২১ || নীলাঞ্জন কুমার || "আই-যুগ"-এর কবিতা

 শব্দব্রাউজ ২১। নীলাঞ্জন কুমার




তেঘরিয়ার বিপাশা আবাসন সকাল সাড়ে আটটা । ফেসবুকে হরেক কবিতা । পড়লাম । মনে হয় সবই সময়ের বন্দি ।



শব্দসূত্র  :  সময় ঘড়ির সামনে



সময় কোথা থেকে আসে কোথায় মিশে যায় কেউ কি জানো? সময় অতীত হলে তাকে ধরার মতো পাগলামি প্রকৃত পাগলের নেই  , সেও জানে সময় মানে তাৎক্ষনিক । অথচ সেই সময় নিয়েই সবার মাতামাতি ।
মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করে মজা পাই  অথচ সেই সময় মুহূর্ত কোথায়!  শুনি টাইম মেশিনের কথা,  কল্পবিজ্ঞান নিয়ে কি দারুণ মাতামাতি করি । অথচ.....




ঘড়ির কাছে দাঁড়িয়ে সময় গুনি এক...দুই ...তিন , ঘড়ির শব্দে কি নতুন সুর ভেসে আসে? দুর্লভ জীবনের সঙ্গে টিকটিক আর লাবডুব শব্দ যেন এক । লাবডুব একদিন থেমে গেলেও টিকটিক থামে না ।  জানি আমার কোন সময়জ্ঞান নেই,  আছে আকুলতা, সময় জয় করার উদগ্রতা,  সময়হীন কোন জায়গায় চলে যাবার বাসনা । যেখানে প্রতিটি শ্বাসে সুগন্ধ,  প্রতিটি মুহুর্তে সুখ ।




সামনে যারা আসছে যাচ্ছে তাদের কি কোনদিন মনে থাকবে?  জানা যাবে তাদের নামধাম ! কালের স্রোতে হারানোর মতো স্বাভাবিক সব কত অক্লেশে জীবন মেনে নেয় । হাতড়াই চেনা অচেনার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে । যারা চলে যাচ্ছে তাদের কাছে আমিও অচেনা । হা-হা ।

আটপৌরে কবিতা || অলোক বিশ্বাস || "আই-যুগ"-এর কবিতা

আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস



৫৮.
সোনা মুগ ডালের
গন্ধে
শোকাহত পাখিরা ফিরেছে ছন্দে

৫৯.
রাধানগর গেছি বহুকাল
সন্ধান
করিতে সোনা মুগের ডাল

৬০.
কানু বাজায় বাঁশি
আমি
সোনা মুগের অন্তরে ভাসি

কিছু বই কিছু কথা ১৯৯ || নীলাঞ্জন কুমার || বাগান ছড়িয়ে যাক || গোপা আচার্য || সীমান্ত

 কিছু বই কিছু কথা ১৯৯  নীলাঞ্জন কুমার




বাগান ছড়িয়ে যাক । গোপা আচার্য । সীমান্ত । বারো টাকা ।

গত পঁচিশ বছর আগে প্রকাশিত হওয়া কাব্যগ্রন্থ , কোন নারী কবির হত তবে সেখানে নারীবাদিত্বের ঝাঁঝ ব্যাপকভাবে উঠে আসতো। কবিতা সিংহ,  তসলিমা নাসরিন,  কৃষ্ণা বসু  প্রমুখের  নারীবাদের কবিতা তৎকালীন তরুণী নারীবাদীদের  কবিতার ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে । তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাঁরা লিখেছেন,  তারা কিন্তু মৃদুমন্দ ভাবে পুরোনো ' মহিলা কবিদের ' লেখনীর প্রবণতা নিয়ে কবিতা যাপন করার চেষ্টা করেছেন । তার মধ্যে পেয়ে যাই কবি গোপা আচার্যের কবিতা তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ' বাগান ছড়িয়ে যাক ' মাধ্যমে ।
           কবির এই কাব্যগ্রন্থের প্রধান বিষয় হলো প্রেম :
' বৃক্ষ থেকে ফুল হেসে বলেছিল-  / 'মালা গাঁথো ' / সেই থেকে গাঁথা আর গাঁথা । / কাকে যে পরাবো-  এখনো জানি না । ' ( ' সেই থেকে ') পংক্তির ভেতর দিয়ে তাঁর এই সমর্পণ তসলিমাদের কাছ থেকে তাঁকে আলাদা করে । কবি বিভিন্ন ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে প্রেমকে নিয়ে এসেছেন তাঁর মতো করে । তাই:  ' আগাছা উপড়ে ফেলি/  বাগান ছড়িয়ে যাক বুকের ভিতরে ।' ( ' বাগান ছড়িয়ে যাক ') , ' সকাল সন্ধে দুঃখ এখন হাসতে হাসতে/  কেবল এপার -ওপার করছে । ' ( 'দুঃখ এখন '), 'ঢেউয়ের মতো নাচতে নাচতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকের উপর/  বলবে তুমি নিমন্ত্রণ । নিমন্ত্রণ । নিমন্ত্রণ । ' ( ' নিমন্ত্রণ ') পংক্তিগুলি তার উদাহরণ ।
           প্রেম শ্রদ্ধা স্নেহের মেশামিশি করে যে ভালোবাসা  ধ্রুবক হিসেবে থাকে তাকে খুঁজে নেবার চেষ্টা করেছেন কবি । তবে কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে বিরক্তির দিক কবির সরলতা যখন অতিসরলীকরণের রূপ নেয় । তখন কবিতায় ব্যন্ঞ্জনার লেশ থাকে না । কবি রমেন আচার্যের প্রচ্ছদে যত্নের ছাপ স্পষ্ট । প্রতীকী ঢঙে সুন্দর কালার কম্বিনেশনে তুলে ধরেছেন তাঁর সহজ সরল প্রচ্ছদটি । যা চোখ ও মনকে আরাম দেয় ।

কিছু বই কিছু কথা - ২০৫ || নীলাঞ্জন কুমার শিরোনাম নেই শিরোপাও || সুবোধ সেনগুপ্ত || সাংস্কৃতিক খবর ত্রিশ টাকা ।

  কিছু বই কিছু কথা - ২০৫ ||  নীলাঞ্জন কুমার শিরোনাম নেই শিরোপাও || সুবোধ সেনগুপ্ত || সাংস্কৃতিক খবর  ত্রিশ টাকা । এমন কিছু কবিতার বই প্রকাশ...